সতেরোর বিজয় দিবসে দাঁড়িয়ে | আলাপ | DW | 11.12.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

সতেরোর বিজয় দিবসে দাঁড়িয়ে

তরুণদের কোনো সমাবেশে গেলে একটা কথা প্রায়ই বলি, ‘‘দেশের কাছ থেকে কী পেলাম, সে প্রশ্ন কোরো না৷ নিজের কাছে জানতে চাও, এই দেশকে আমি কী দিলাম৷’’

কথাটা সবাই বুঝতে পারে, এমন নয়৷ চারদিকে ‘আমি আমি আমি' চিৎকারের দাপটে একটু সংহত হয়ে ভাববার সময় কই? প্রতিযোগিতার অমোঘ গতির কাছে দিশেহারা মানুষ মৌলিক প্রশ্নগুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমাগত৷ বাইরের রং ঢং যতটা চিত্ত দুলিয়ে দেয়, ভিতরের আহ্বান ততটা মন কাড়ে না৷ ভিতরটা এখন যেন ‘গরিব ঘরের মেয়ে'৷

এ কথা তো বুঝতে পারি, একটা সংকটে পড়েছি আমরা৷ আর সে কারণেই ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল অবধি যা ঘটিয়েছে বাঙালি, তা এখন প্রায় অবিশ্বাস্য লাগে৷ আজকের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে সেই গণজাগরণের কথাকে রূপকথা বলে মনে হয়৷

প্রথম আঘাত: জাতীয়তাবাদ

বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর আস্থা রেখে যে সংগ্রাম চালিয়েছিল বাঙালি, সেই সংগ্রাম কিছুটা শক্তিহীন হয়ে পড়েছে৷ উগ্র ধর্মীয় মতবাদ ধীরে ধীরে গ্রাস করতে চাইছে মূল্যবোধের জায়গাটা৷ মাঠপর্যায়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের গোড়ায় জলসিঞ্চনের কাজ যারা করতে পারতেন, তারা অনেকটাই নিষ্ক্রিয়, কখনো কখনো মৌলবাদের সহায়ক৷ গ্রামপর্যায় থেকে যদি দেখি, তাহলে এটা বোঝা কঠিন নয় যে, জাতীয় চেতনার জায়গাটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি৷ ধর্মনিরপেক্ষতা যে ধর্মহীনতা নয়, এ কথাই দেশের মানুষকে বোঝানো যায়নি৷ ‘শিক্ষিত' মানুষের মধ্যেও ভয়াবহ কূপমণ্ডুকতা, যুক্তিহীনতা এবং পারম্পর্য্যহীন আচরণ দেখা যায়৷ অর্থাৎ ‘প্রজ্ঞায় সংহত' মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে৷ বাড়ছে অন্ধতার প্রতি অনুরাগী মানুষের দল৷

প্রশ্ন ওঠে, এই সংকটে বাঙালি পড়ল কী করে?

একটু ইতিহাস ঘাটতে হবে, তাতেও যে সংকটের সুরাহা হবে এমন নয়৷ ভাবনার একটা দিক খুঁজে পাওয়া যাবে মাত্র৷ এ কথা ভুললে চলবে না, ভাষা আন্দোলন শুরুতে ছিল মূলত শিক্ষিত মানুষের আন্দোলন৷ অধ্যাপক আর ছাত্রদের আন্দোলন৷ এর সঙ্গে সাধারণ গ্রামের বা মফঃস্বলের মানুষের আত্মীয়তা গড়ে ওঠার কোনো কারণ নেই৷ তাঁরা বোধ ও ভৌগোলিকভাবে দূরে ছিলেন আন্দোলনরত এই মানুষদের কাছ থেকে৷ রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গটি তাঁদের কাছে এত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল কেন? 

ঐতিহাসিকভাবে সত্য, বাংলা একসময় পুরো ভারতের নেতৃত্ব দিয়েছে৷ আবার এ-ও সত্য যে, ভারতের স্বাধীনতা অস্তাচলে গিয়েছিল বাংলা থেকেই৷ এ দেশটা ইংরেজদের উপনিবেশ হয়েছিল, যার সূচনা ছিল বাংলায়৷ ফলে বাঙালির জীবনে ঘটে যাওয়া নানা কাহিনির বীররস ও করুণরসের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল অদ্ভুত এক মানসিকতা৷ এই মানসিকতাই তাকে '৫২ ও '৭১-এর মতো বড় ঘটনা ঘটাতে সাহায্য করেছে৷

সে সময় বামপন্থি নেতাদের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল বাংলাজুড়েই৷ মূল লড়াইয়ে সংগ্রামী ভূমিকা ছিল বামদেরই৷ মূলত গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকটা বিশ্বজুড়েই  ছিল বামপন্থিদের উত্থানের সময়৷ চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রোর নাম তখন ছড়িয়ে গেছে সবখানে৷ ১৯১৭ সালে সংঘটিত রুশবিপ্লব ও পরবর্তীতে ৫০-এর চীনা বিপ্লব মানুষের মনে সাম্যবাদের প্রতি আস্থা জাগিয়েছে৷ এর রেশ এসে পড়েছে ঢাকা শহরেও৷  ১০৪৭-এর দেশভাগের পর বাঙালি মুসলমান ভেবেছিল, নিজেদের দেশটা পাওয়া গেল নিজেদের মতো করেই৷ অর্থাৎ, ইংরেজের কাছে হারানো প্রতিপত্তি বুঝি ফিরে আসবে আবার৷ কিন্তু তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতি বুঝিয়ে দিল, এই দেশ থেকে বাঙালির আসলে কিছুই পাওনা নেই৷ এরকম একটি অবস্থায় ভাষা-প্রশ্নেই এলো প্রথম বিরোধ৷ এরপর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধরা পড়তে লাগল বৈষম্য৷ এ বৈষম্য এতটাই প্রকট যে, কোনো  প্রবোধেই কাজ হয় না৷ এই বৈপরীত্য, এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে বামপন্থিরা শুরু থেকেই ছিল সোচ্চার৷ কিন্তু কী এক অদ্ভুত মানসিকতার কারণে দু'দশক ঘুরতেই বাঙালি আস্থা রেখেছে মধ্যপন্থি দল আওয়ামী লীগের ওপর, বামপন্থিদের ওপর নয়৷ এ বিষয়টি নিয়ে কোনো গবেষক গবেষণা করলে ভালো করবেন৷

আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান মূলত গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা৷ ১৯৬৯ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি পেয়েছেন৷ কিন্তু ৪০-এর দশক থেকেই রাজনীতিতে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়৷ কমিউনিস্টরা সবচেয়ে বেশি জনগণের পাশে থাকার পরও শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে উঠলেন সারা বাংলার নয়নের মণি৷ এখন অবিশ্বাস্য মনে হলেও ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময় ছিল বঙ্গবন্ধুর৷ তখন বঙ্গবন্ধু যেদিকে তাকিয়েছেন, সেদিকেই ছিল বাঙালির দৃষ্টি৷

তারও আগে...

১৭৫৭ সাল থেকে অভিজাত মুসলমানেরা ইংরেজ শাসন মেনে নিতে পারেনি৷ স্বধর্মের শাসকদের উৎখাত করা হয়েছিল বলে এই অভিজাতেরা ইংরেজদের উচ্ছেদ করার দীক্ষা নিয়েছিলেন৷ ফলে শাসনব্যবস্থা থেকে তাদের অবস্থান হলো অনেক দূরের৷ অন্যদিকে অভিজাত হিন্দুরা এ সময়টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-দীক্ষা, সরকারি চাকরিতে নিজেদের অধিকার আদায় করে ছাড়লেন৷ ইংরেজরা হিন্দু সম্প্রদায়ের আনুগত্যটা বুঝতে পারল৷ ফলে চাকরি-বাকরিতে তখন থেকেই একটা ধর্মভিত্তিক ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছিল৷ পিছিয়ে পড়া মুসলমানেরা হিন্দুদেরকেই ভেবে বসল তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু৷ মুঘল আমলে নানা বৈপরীত্যের মধ্যেও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে এক ধরনের বন্ধন ছিল৷ তাছাড়া, বাংলার কৃষক সমাজের জীবনে রাজনৈতিক আলোড়ন খুব একটা স্থান পেতো না৷ ফলে, শাসক কে, তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কৃষক সমাজ খুব একটা মাথা ঘামিয়েছে বলে মনে হয়নি৷ রাজা ও প্রজার সম্পর্কটা প্রায় সব শাসনামলেই একই রকম থেকেছে৷ উৎপীড়ক রাজাকেই বেশিরভাগ সময় দেখেছে বাংলা৷ 

এই পটভূমি মনে রাখলে ৫২-র পর বাঙালি মুসলমানের চলার পথ এবং একাত্তরের পর তার চলার পথের বাঁকগুলো বুঝতে সুবিধা হয়৷

বাঙালি মুসলিম মানসে পলাশীর যুদ্ধ আর কারবালার ট্র্যাজেডির ছাপ পড়েছিল প্রবলভাবে৷ পলাশী আর কারবালা পুঁথিসাহিত্যের মাধ্যমে লোকজ মনকে আবৃত করে রেখেছিল৷ মানুষের ট্র্যাজেডি হিসেবে তা যেমন মনে প্রোথিত হয়েছে, তেমনি মুসলমানের বিয়োগান্তক মহাকাব্য হিসেবেও তাঁরা তা দেখেছেন৷ ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তদান বাঙালি মুসলমানের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পিছনে এই কারণটিও ফ্যালনা নয়৷ ভাষা আন্দোলনের ফলে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি পুরো বাংলার আগ্রহ বেড়ে যায়৷ শোষণ-বঞ্চনার প্রতিবাদের পাশাপাশি নিজের শিকড় খোঁজার কাজটিও তাঁরা শুরু করেন৷ বদরুদ্দীন উমর যথার্থই বলেছেন, ভাষা আন্দোলন ছিল ‘বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন৷'

আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়া এই মুসলমানেরা নিজেদের আরব বংশোদ্ভূত ভেবে তৃপ্তিলাভ করতো৷ বাংলার মুসলমানদের একটা বড় অংশই যে স্থানীয় নিম্নবর্গের হিন্দু থেকে এসেছে, সে কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল তাঁরা৷ ফলে যা হয়, নিজের সংস্কৃতির প্রতি বিশ্বস্ত না থাকার কারণে নিজদেশে পরবাসী হয়েই কাটিয়ে দিচ্ছিল জীবন৷ '৫২ তাদের ঘুম ভাঙাল৷ সে ঘুম থেকে জেগে উঠে এমনই এক ইতিহাসের জন্ম দিল এই মানুষেরা যে, আস্ত একটা দেশ অর্জন করার আগে ক্লান্তই হলো না৷

সংকটের জায়গা হলো — যখন ক্লান্ত হলো, তখন সে প্রায় ভুলে গেল কী অসাধারণ অর্জন তার৷ বরং সে কথা ভুলে গিয়ে সে আবার ফিরে গেল রক্ষণশীলতার কূপমণ্ডুকতায়৷ ২০১৭ সালের বাংলাদেশে কট্টর মোল্লাবাদের পদধ্বনি শোনা যায়৷ কিন্তু এই হতাশার বিপরীতে আমাদের অর্জনও তো কম নয়৷ সে কথা কিছুটা আলোচনা করা দরকার৷

গণজাগরণ

অনেকের কাছেই ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ খুব একটা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা নয়৷ অনেকেই এই আন্দোলনের নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতিই চোখ রাখেন৷ আমার বিবেচনায়, ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে জন্ম নেওয়া গণজাগরণ মঞ্চ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বাঁক৷ এ রকম অল্প কয়েকটি ইতিবাচক বাঁকই আমরা স্বাধীনতার পর পেয়েছি৷ হাতে গোনা এই বাঁকগুলোর অন্যতম হলো এরশাদ পতনে গণজাগরণ, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন আন্দোলন এবং গণজাগরণ মঞ্চ৷ এই চারটি ঘটনা দেখিয়েছে, বাঙালি আসলে আবার ঝিমিয়ে পড়েনি৷ তারুণ্যের উচ্ছাস ও দুর্দমণীয় অটল বিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল এই আন্দোলনগুলোয়৷

গণজাগরণ মঞ্চ আমাদের ইতিবাচক কী দিয়েছিল, সে কথা আলোচনা করে নেওয়া ভালো৷ প্রথমত, অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, এ প্রজন্ম বখে গেছে: নিজ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের ধারণার গভীরতা নেই, স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রচারণা — ‘একাত্তর অনেক আগের ঘটনা৷ এখন সবকিছু ভুলে মিলমিশ করে সবার থাকা উচিত' — তরুণেরা ক্রমেই এই মতের সঙ্গে আঁতাত করছে৷ কাদের মোল্লা মামলার রায়ের পরপরই ফেসবুকের মাধ্যমে কয়েক তরুণ যে আহ্বান রেখেছিল, তারই ফলে দেখা গেল এক গণবিস্ফোরণ৷ কেউ ভাবতেই পারেনি, কয়েক তরুণের ডাকে সমবেত হবে অসংখ্য মানুষ৷ দু'দিনের মধ্যেই তা পরিণত হবে মানব-প্লাবনে৷ কেন গণজাগরণ মঞ্চ স্তিমিত হয়ে এলো, জাগরণের মধ্যে কোনো কোনো উপাদান ঢুকে আন্দোলনটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করল, সরকারের সংশ্লিষ্টতা ভালো কি মন্দ হলো — এসব নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা হবে, সমালোচনা হবে৷ কিন্তু দেশের মানুষের মুক্তিযুদ্ধ-সংলগ্নতার প্রমাণ এই গণজাগরণ মঞ্চ, এ কথা হাজার যুক্তি দিয়েও অপ্রমাণ করা যাবে না৷

এরই বিপরীতে হেফাজতে ইসলামী নামে একটি ইসলামি সংগঠনের তৎপরতা আমরা দেখেছিলাম সে সময়তেই৷ শাপলা চত্বরে হাজারে হাজারে ইসলামপন্থি মানুষ এক হয়েছিল৷ মিছিল নিয়ে আসার পথে এদের কারো কারো জঙ্গি রূপ বেরিয়ে পড়েছিল প্রকাশ্যে৷ এরা হাউজ বিল্ডিংয়ের সামনে বিক্রির জন্য থাকা বইপত্র পুড়িয়ে ফেলেছে, যার মধ্যে ছিল কোরআন শরিফও৷ ওই সমাবেশের দিন সত্যিই একটা দ্বিধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ৷ বাংলাদেশের গন্তব্য কোনদিকে — মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি সংহত থাকা, নাকি এই ইসলামি বক্তৃতা-বিবৃতির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা৷ সেদিন তাদের মঞ্চ থেকে যে ভাষণগুলো দেওয়া হয়, তার অনেককিছুই ছিল আমাদের রাষ্ট্রের মূলনীতিকে কটাক্ষ করে৷ সে সমাবেশ থেকে সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়৷ সে সময় শেখ হাসিনা সরকার খুবই বলিষ্ঠতার সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এবং রাতে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায় শাপলা চত্বরের এই ঔদ্ধত্যকে দমন করা হয়েছিল৷ কিন্তু হেফাজত যে বড় কৌশল নিয়ে নেমেছে, সেটাও মনে রাখতে হবে৷ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি যেন তাদের আস্থা নেই৷ ৩০ লাখ শহিদ রক্ত দিয়েছে, একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ে তোলার জন্য৷ কিন্তু প্রতিদিনই আমরা সে লক্ষ্য থেকে একটু একটু করে সরে যাচ্ছি৷ এই ভয়াবহ অবস্থা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়৷

মানবতাবিরোধীদের ফাঁসি

স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছর না ঘুরতেই উলটো পথে চলা শুরু করল দেশ৷ জিয়াউর রহমান অত্যন্ত সচেতনভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন করেছিলেন৷ শাহ আজিজুর রহমান, মশিউর রহমান যাদু মিয়াসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের তিনি ঠাঁই দিয়েছিলেন মন্ত্রীসভায়৷ শিশুদের পাঠ্যবইয়ে বদলে ফেললেন ইতিহাস৷ চারদিকে এমন এক আবহের সৃষ্টি করা হলো, যেন মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও তার নায়কদের আর স্মরণে আনতে না পারে৷

জিয়াউর রহমানের পথ ধরে হোসাইন মুহম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া দেশটাকে একটি মিনি পাকিস্তানে পরিণত করতে চাইলেন৷ খালেদা জিয়া তো যুদ্ধাপরাধীদের ঠাঁই দিলেন তাঁর মন্ত্রীসভায়৷ ইসলামী ছাত্র সংঘের ডাকসাঁইটে নেতা মতিউর রহমান নিজামী আর আলী আহসান মুজাহিদ বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল বাংলার রাজপথে৷

এর আগের কথাও বলে নিতে হয়৷ ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন আমাদের জন্য ছিল এক বড় বিজয়৷ সে সময়ও গণজাগরণ দেখেছে বাংলাদেশ৷ কিন্তু সে আন্দোলন এমন কোনো ইঙ্গিত দেয়নি যে, মুক্তিযুদ্ধের পথে চলবে এই দেশ৷ স্থবির মননে তখনও মুক্তির বান ডাকেনি৷ মুক্তিযুদ্ধের সংহত শক্তির পরিচয় আমরা পেয়েছিলাম গণ আদালতের মাধ্যমে৷ 

মনে করিয়ে দিই, খালেদা জিয়ার শাসনামলে ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর একাত্তরের ঘাতকদের শিরোমনি গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ঘোষণা করা হয়৷ একাত্তর সালে পাকিস্তানের পক্ষে প্রকাশ্যে দালালি করা এই জামায়াতে ইসলামী নেতা স্বাধীনতার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জনমত গঠনেরও চেষ্টা করেন৷ ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ঘাতকের পুনর্বাসন মেনে নেয়নি বাঙালি

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়৷ এর আহ্বায়ক ছিলেন শহিদ জননী জাহানারা ইমাম৷ গণ আদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করা হয়৷ সে বছরের স্বাধীনতা দিবসে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান হয়৷ ১২ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন৷

এই ঘটনা ছিল আমাদের ইতিহাসের একটি বড় বাঁকবদল৷ যেন আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ালো দেশের ইতিহাস৷ যে ইতিহাসকে স্থবির করে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল, তা যেন বাঁধভাঙা নদীর স্রোতের মতো ঢেউ তুলল বাঙালি মানসে৷

এরপরের ইতিহাসও ছিল কালিমালিপ্ত৷ আগেই বলেছি, দ্বিতীয় দফায় পূর্ণকালীন দায়িত্বপালনকালে খালেদা জিয়া দুই আল-বদর নেতাকে মন্ত্রী বানালেন৷ অনেকেই ভেবেছিল, ইতিহাস বুঝি ভুল পাতাই খুলে দিল৷ কিন্তু সত্যিই আমরা ঘাতকদের বিচার দেখে যেতে পারলাম৷ আমি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে বলতে পারি, আমার মা নূরজাহান সিরাজী বার বার এই নরঘাতকদের বিচারের দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছেন৷ ৩২ বছর বয়সে বিধবা হওয়া এই নারী ২০১২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এদের বিচার দাবি করে গেছেন৷ কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, এই বিচার আর হবে না৷

এ সময় সুকৌশলে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়– একাত্তর অনেক দূরের একটা সময়৷ এখন ওই অতীত ঘেঁটে আর দরকার নেই৷ যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, এখন সবাই মিলেমিশে একটা দেশ গড়ে তোলা জরুরি৷ কে কবে কোথায় কী করেছে, তা নিয়ে মাথাব্যথা হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়৷ এই প্রচারণায় সুর মিলিয়েছিল অনেকেই৷

কিন্তু আমরা আমাদের জীবদ্দশায় দেখলাম যুদ্ধাপরাধের বিচার৷ সত্যি বলতে কি, এতদিন পর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের নানা ষড়যন্ত্রের জাল কেটে এই বিচার যে হতে পারবে, এ রকম বিশ্বাস খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী মানুষও করতে পারেননি৷ কিন্তু সেটা ঘটল৷ কয়েক বছরের মধ্যেই মানবাধিকারবিরোধী ঘাতকদের মূল চাইঁয়েরা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য হলো এবং তাদের বিচার হলো৷ বাংলাদেশ তাঁর কলঙ্কের একটি বিশাল আঁচড় থেকে মুক্ত করতে পারল নিজেকে৷

প্রশ্নবিদ্ধ ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান খাটো করার জন্য আটঘাট বেঁধেই নেমেছিল স্বাধীনতার বিপক্ষশক্তি৷ এ এক দারুণ অনাকাঙ্খিত সত্য — একটি স্বাধীন দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অস্তিত্ব থাকা৷ স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে জল ঘোলা করা হয়েছে৷ জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অশুভ প্রবণতাও আমরা দেখেছি৷ জিয়াউর রহমান এ নিয়ে নিজে মুখ না খুললেও তাঁর অনুসারীরা এ প্রচারণা এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন৷ বঙ্গবন্ধুর ওয়্যারলেস বার্তাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হান্নানের ঘোষণাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে৷ এরপর ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমানের ঘোষণাকে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে৷ যে দেশের জন্ম ২৬ মার্চ, সে দেশ কী করে ২৭ মার্চের ঘোষণায় স্বাধীন হয় — এ সমীকরণ কে মেলাবে?

বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের ঘটনাকেও বলা হয়েছে, তিনি পালিয়ে না গিয়ে কেন ধরা দিলেন? এই ইতিহাসবিদদের জানা নেই যে, বঙ্গবন্ধু সেদিন গ্রেপ্তার না হলে নির্বিচার বাঙালি নিধন পেতো আরো ভয়াবহ মাত্রা৷ বঙ্গবন্ধুকে জেলখানায় রেখেছিল ওরা৷ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিতরাই সেদিন যুদ্ধ করেছিল নানা ফ্রন্টে৷

মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদ হওয়ার বেদনাদায়ক ঘটনাকেও অনেকে ভুল বা মিথ্যে বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন৷ পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে নতুন দিল্লি হয়ে ঢাকায় ফেরার সময় নাকি ৩ লাখকে ৩ মিলিয়ন শুনে এই ভুলের শুরু করেছিলেন৷ তরুণ গবেষক আরিফ রহমান প্রমাণ করে দিয়েছেন, ৩০ লাখ বা তারও বেশি শহিদের রক্তে লাল হয়েছে বাংলার মাটি৷ এছাড়াও প্রশ্ন করা যায়, ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি সোভিয়েত পত্রিকা প্রাভদায় ছাপা হওয়া সংবাদে ৩০ লাখ শহিদের কথা কি এমনিতেই এসেছে?

এমনিভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি অর্জনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে একটি মহল৷ ইতিহাস-সংলগ্ন না হলে এই অপপ্রচারের জবাব দেওয়া কষ্টকরই বটে৷ আশার কথা, আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অপতৎপরতার বিষয়ে ওয়াকিবহাল৷ তারা এর জবাবও তৈরি করে রাখছে৷

কয়েকটি সূক্ষ্ম বিষয়

ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রবণতাগুলো দেখা দরকার৷ আমাদের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও হাসপাতাল গড়ার ক্ষেত্রে এই দেশবিরোধীদের একটা বড় বিনিয়োগ আছে৷ এরা এই সেক্টরগুলোতে রীতিমতো জাঁকিয়ে বসেছে৷ সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশার জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে বড় মাধ্যম৷ ফলে কোথায় কোথায় জাল ফেললে বেশি মাছ উঠবে এবং সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাই করা সহজ হবে, সেটা তারা বুঝে নিয়েছে সহজেই৷ সৌদি আরবসহ কট্টর সালাফি মতবাদের দেশগুলো দেদারসে এদের জন্য টাকা ঢেলেছে এবং এরই মাধ্যমে এই সালাফি মতবাদীরা এই দেশের মাটিতে পেয়েছে শিকড়৷

অন্যদিকে বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধা গড়ে তুলেছেন তেমন সংগঠন, যা থেকে শুধু তিনিই লাভবান হন৷ মুনাফার পাহাড় গড়েছেন তাঁরা, কিন্তু তা সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে লাগেনি৷ এমনকি স্থানীয় রাজনীতিতে স্থান করে নেওয়ার জন্য তাঁরা স্কুল গড়ে তুলছেন না, গড়ছেন মসজিদ বা মাদ্রাসা৷

জঙ্গিবাদের সঙ্গে লড়াই

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা' শব্দবন্ধের যত্রতত্র ব্যবহার বিষয়টিকে ক্লিশে করে তুলেছে৷ ফলে দেশপ্রেমের বদলে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে৷ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন অনেকভাবেই দুর্বল দেশগুলোকে আরো দুর্বল করে দিয়েছে৷ এরমধ্যে আফগানিস্তান, ইরাকে অ্যামেরিকার চালানো ভুল যুদ্ধ সাধারণ মুসলিমদেরও কট্টর মুসলিমে পরিণত করেছে৷ ওয়াহাবি বা সালাফি মতবাদের প্রতি আস্থা এসেছে মুসলমানদের৷ এই বাংলায় ইসলামের সুফি মতবাদই ছিল শিকড়ের সুর৷ সে জায়গায় এখন কট্টর ওয়াহাবি মতবাদ এসেছে৷ এক শ্রেণির ধর্মীয় উগ্রবাদী সেই মতবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে৷ সরকার এদের ব্যাপারে কঠোর৷ কিন্তু শুধু কঠোরতাই এই প্রবণতা থামাতে পারবে না৷ শিক্ষায় সচেতনতা আনতে না পারলে, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে একসঙ্গে পরিচালিত করতে না পারলে এই অশুভ প্রবণতা থেকে বের হওয়া সত্যিই কঠিন৷ জঙ্গিরা কোনো নিয়ম মানে না৷

দাঁড়াবার জায়গা

আগারগাঁওয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হতে পারে দাঁড়াবার মূল জায়গা৷ আমি সেখানে গিয়ে একাত্তরের উদ্বাস্তুদের ছবি দেখে আবার বুঝেছি, কী কারণে পাকিস্তান ও তাদের দোসরদের আমি কোনোভাবেই ক্ষমা করতে পারি না৷

আমাদের স্কুলের বইগুলোয় নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ আছে৷ কিন্তু সাদা পৃষ্ঠায় কালো কালিতে লেখা এই ঘটনাগুলো শিশুমনের অংশ করে নেওয়ার জন্য সে রকম শিক্ষক চাই৷ আমরা অবহেলা করি, কিন্তু একটি শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো তার ভাষা ও ইতিহাস জানা৷ এই দুই বিষয়কে ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে বৈচিত্র্যময় জীবন আখ্যান৷ কিন্তু এখানেই আমরা সবচেয়ে বেশি ফাঁকি দিই৷

আমাদের প্রচারমাধ্যমে একাত্তরকে নানাভাবে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা আছে৷ যে কোনো ফাঁকিবাজ বা মাসলম্যানের কণ্ঠে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা' শব্দবন্ধটি শুনে অনেকেই বিরক্ত হন৷ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা' বিষয়টি না বুঝেই ব্যবহারের ফল এখন ফলছে৷ এ ফল মোটেই ভালো কিছু নয়৷ এই অসৎ প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে একটা উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যবিহীন তরুণ সমাজ উপহার দেবো আমরা৷ আর সেই লক্ষ্যবিহীন তরুণেরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিকে না ঝুঁকে ঝুঁকবে প্রচলিত রক্ষণশীলতার দিকে৷ টেলিভিশন, রেডিও, পত্র-পত্রিকার ভূমিকা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷

Zahid Reza Noor

জাহীদ রেজা নূর, শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান

তবুও আশা

মনে হতে পারে, এই আলোচনার পর মুক্তভাবে নিশ্বাস নেওয়ার পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে৷ বাজার অর্থনীতি তো সেদিকেই নিয়ে যায় আমাদের৷ কর্পোরেট সংস্কৃতি মানুষের ভিতরের মানুষটাকে হত্যা করে নিজের ছাঁচে ঢেলে সাজায় মানুষকে৷ ফলে জীবনের গভীরতার কাছাকাছি হওয়ার চেয়ে বসের কাছাকাছি হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে সবাই৷

কিন্তু এর বাইরেও একটা জগৎ আছে৷ সেটা হলো প্রশ্ন করা৷ মানবশিশু কথা বলা শেখার পর থেকেই প্রশ্ন করতে শেখে৷ অভিভাবকরা যদি সে প্রশ্নের ঠিক উত্তরটি দিতে পারেন, তাহলে সে শিশুর মানসগঠনে অবশ্যই শিল্পিত জীবনের পরশ খুঁজে পাওয়া যাবে৷ আর হ্যাঁ, সংস্কৃতির এখন অনেক বড় দায়৷ রাজনীতি-সংস্কৃতি মিলেই তৈরি করতে পারে এগিয়ে যাওয়ার পথ৷

সে চেষ্টা যে একেবারেই চলছে না, তা সত্য নয়৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন