সংসদে অনেকেই মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেন | আলাপ | DW | 01.05.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সাক্ষাৎকার

সংসদে অনেকেই মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেন

বিশ্বায়নের এই যুগে কি শ্রমিকরা নায্য মজুরি পাচ্ছেন? কেন এখনো তাঁদের দাবি আদায়ে রাজপথে নামতে হচ্ছে? শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সংকট কোথায়? এসব বিষয়েই এবার ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন শ্রমিক নেত্রী ও সংসদ সদস্য শিরিন আক্তার৷

ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসটা যদি একটু ছোট করে বলেন...৷

শিরিন আক্তার: শ্রমিকদের শোষণ আর বঞ্চনার ইতিহাস অনেক লম্বা৷ বাংলাদেশের জন্মের আগে, ব্রিটিশ আমলে শ্রম আন্দোলন শুরু হয়৷ সেটা ছিল মূলত রেল ও নৌ শ্রমিকদের আন্দোলন৷ এর পাশাপাশি ছিল পাটকল-সূতাকলের শ্রমিকরা৷ বিশেষ করে আদমজী ও বাওয়ানীর শ্রমিকদের আন্দোলনের কথা বলা যেতে পারে৷ তখন আমরা দেখেছি, আদমজী বা বাওয়ানীর টাকা দিয়ে পশ্চিম পকিস্তানের উন্নতি করা হচ্ছিল৷ আমরা তখন স্লোগান দিতাম, ‘‘পূর্ব বাংলা শাসন কেন?'' রেল-নৌ শ্রমিকদের পাশাপাশি পাটকলের শ্রমিকরা আন্দোলন করেছেন সে সময়৷ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিকদের একটা বিশাল ভূমিকা আছে৷ ১৯৬৬ সালে এই শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে আমরা ছ'দফার আন্দোলন শুরু করেছিলাম৷ ফলে বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷

আগের যে শ্রমিক আন্দোলন আর এখনকার শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে তফাৎ কী?

তখনকার কথা বলি, দেশ স্বাধীনের পর আমাদের সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হয়ে যায়৷ ফলে শ্রমিকের অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষা হয়৷

অডিও শুনুন 12:15
এখন লাইভ
12:15 মিনিট

‘আন্দোলন ছাড়া দাবি বাস্তায়নের পরিবেশ কখনোই হয়নি’

তখন আন্দোলন অনেক জোরালো ভূমিকা রাখে৷ ১৯৮০ বা ৮২ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে আমাদের জাতীয়করণ করা শিল্প-কলকারখানা বিরাষ্ট্রীয়করণ হতে থাকে৷ একদিকে সামরিক শাসন আর অন্যদিকে বিরাষ্ট্রীয়করণের ফলে শ্রমিক আন্দোলন দূর্বল হতে থাকে৷ শ্রমিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে থাকে, ক্ষুণ্ণ হতে থাকে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারও৷ আগে কিন্তু অনেক বেশি অধিকার ছিল৷ এই পাটকল বা সূতাকল যখন বন্ধ হতে শুরু করল, তখন বাংলাদেশে আরেকটি শিল্পের বিস্তার শুরু হলো৷ সেটা হলো পোশাক শিল্প৷ এই শিল্পের কারণে শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকদের দৃশ্যমানতা দেখা যায়৷ ২০০৬ সালে গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিকদের আন্দোলন বিশাল ভূমিকা রাখে৷ আর তখন থেকেই এই শিল্পের শ্রমিকরা বড় একটা জায়গা নিয়ে নেয়৷ এই সেক্টরে ৮০ ভাগ শ্রমিকই কিন্তু নারী৷

এখন তো শ্রমিকদের আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে৷ আগেও কি তাই হতো? তাহলে এই দুই আমলের আন্দোলনের মধ্যে তফাৎ কী?

২০০৬ সালে বড় একটা সহিংস আন্দোলন হয়েছিল৷ তবে এরপর আর বড় আন্দোলন হয়নি৷ এর মূল কারণ ট্রেড ইউনিয়নকে স্বীকৃতি না দেয়া, শ্রমিকদের অধিকারকে স্বীকৃতি না দেয়া৷ গার্মেন্ট পুরোপুরি ব্যক্তিখাত ছিল৷ আমরাও তখন চাইনি এখানে কোনো গণ্ডগোল হোক৷ ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে এই সেক্টর বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ুক, আমরা সেটা চাইনি৷ কারণ, এটা একটা বড় কর্মক্ষেত্র তৈরি করেছিল৷ বিশেষ করে এই খাত নারী শ্রমিকদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল৷ অবশ্য ট্রেড ইউনিয়ন করতে না দেয়া, কথা বলতে না দেয়ার কারণেই কিন্তু তখন এই ঘটনা ঘটেছিল৷ পরবর্তীতে, ২০১৩ সালে, শ্রমিক-মালিক-সরকার একসঙ্গে বসে আমরা সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি৷

এখন অনেক প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন হচ্ছে, আবার অনেক জায়গায় এখনো করতে দিচ্ছে না৷ বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নের জায়গা কতটা প্রসারিত হয়েছে?

অনেকটাই প্রসারিত হয়েছে৷ তবে আমি মনে করি, শ্রমিকদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়নের ব্যাপারে সচেতনতা আরো বৃদ্ধি করতে হবে৷ আবার মালিকদের মধ্যে স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়নের ব্যাপারে যে অনিচ্ছা, সেটা বাদ দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দিতে হবে৷ একটা হলো মালিকের ট্রেড ইউনিয়ন গড়া আর আরেকটা হলো শ্রমিকের স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন গড়া৷ এই দু'টোর মধ্যে তফাৎ আছে৷ এখন স্বীকৃতি দেয়ার ফলে অনেকগুলো ট্রেড ইউনিয়ন তৈরি হয়েছে ঠিকই, তবে কারখানার ফ্লোরে শ্রমিক প্রতিনিধিদের স্বাভাবিকভাবে কাজ করা এবং তাঁদের দাবিনামা পেশ করার সুযোগ দেয়ার ব্যাপারে আমাদের এখনো অনেক কাজ করতে হবে৷ ভবিষ্যতে একটি নতুন মজুরি কাঠামো হবে, এ ব্যাপারে কমিটি হয়েছে৷ দু-একটি মিটিংয়ে তারা বসেছে ইতিমধ্যেই৷ তারা ১৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি দাবি করেছে৷ এখন এটা নিয়ে সরকার-মালিক-শ্রমিক সবার মনোনিবেশ করতে হবে, যাতে এগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়৷ এবার আলোচনার মাধ্যমে সুন্দর সুচিন্তিত মজুরিকাঠামো তৈরি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি৷

বাংলাদেশে এখন শ্রমিকরা যে মজুরি পাচ্ছেন, সেটা কি যৌক্তিক?

অবশ্যই যৌক্তিক না৷ অনেক কম মজুরি পান তাঁরা৷ সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে কম মজুরি পায় আমাদের শ্রমিকরা৷ এটা বাড়াতে হবে৷ আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশের দিকে এগোচ্ছি৷ তাই এখন বেশি করে এই বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে৷

শিল্প প্রতিষ্ঠানে তো নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, তাই না?

শুধু শিল্প প্রতিষ্ঠান না, সংগঠিত বা অসংগঠিত ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখন প্রায় সমান সমান৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশিও৷

নারী শ্রমিকদের মজুরি আমরা কতটা নিশ্চিত করতে পারছি?

নির্বাচিত প্রতিবেদন

মজুরি এখনো অনেক কম পাচ্ছেন নারীরা৷ কোথাও অর্ধেক পাচ্ছেন, কোথাও এক তৃতীয়াংশ পাচ্ছেন৷ তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সমান সমান পাচ্ছেন৷ গার্মেন্টসেও ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে সমান পাচ্ছেন৷ যেমন ধরুন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে মেয়েরা মাতৃত্বকালীন ছুটি পাচ্ছেন ছ'মাস৷ কিন্তু শিল্প প্রতিষ্ঠানে পাচ্ছেন চার মাস৷ অনেক প্রতিষ্ঠানে তো মাতৃত্বকালীন কোনো ছুটিই নেই৷ এটা একটা বড় বৈষম্য৷

আন্দোলন ছাড়া কি কখনও শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়ন হয়েছে?

নতুন কোনো দাবি আন্দোলন ছাড়া বাস্তায়নের পরিবেশ কখনোই হয়নি৷ তবে মজুরি বৃদ্ধি বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দরকষাকষির মাধ্যমে সমাধান হয়েছে৷ এক্ষেত্রে আমাদের কৃষি শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে৷ কৃষি শ্রমিকদের কিছুদিন আগে শ্রম আইনে শ্রমিক হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে৷ মজুরি প্রশ্নেও আমরা দেখেছি, যেখানে নারীদের সচেতন করা গেছে সেখানে তাঁরা পুরুষের পাশাপাশি আন্দোলন করে সফল হয়েছেন৷

আপনি তো সংসদ সদস্য ,আবার শ্রমিক নেতাও, আপনারা তো সরকারের সঙ্গে শ্রমিকদের সেতুবন্ধনে ভূমিকা রাখতে পারেন...

আমরা তো সেই কাজটাই করি৷ আমরা চেষ্টা করি সংসদে এই বিষয়গুলো উত্থাপন করতে৷ শ্রম আইন বাস্তবায়নের জন্য সংসদীয় কমিটিতে আমরা আলাপ-আলোচনা করি৷ সংসদে তো শ্রমিক নেতা কম৷ যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন৷ কিন্তু অনেকেই মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কাজ করে থাকেন৷ ফলে সেখানে একটা সংকট আছে৷

শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়নে এখনো কেন রাস্তায় নামতে হয়?

রাস্তায় নামতেই হবে৷ যতক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিকবান্ধব আইন ও প্রশাসন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাস্তায় নামতেই হবে৷ এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নেই৷ জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ন্যূনতম মজুরি রয়েছে৷ ভারতের অনেক রাজ্যেও রয়েছে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি৷ ফলে সেই লড়াইটা হচ্ছে৷ এই যে আমরা আনন্দের সঙ্গে বলি, বছরের শুরুতে ৩৫ কোটি বই আমরা দিচ্ছি, এই বইগুলো যাঁরা বাধাঁই করেন, তাঁদের ন্যূনতম মজুরি আমরা ঠিক করতে পারিনি৷ এমন অনেকগুলো বিষয় আছে৷ আসলে আইন আছে৷ কিন্তু সেই আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যাঁদের কাজ করবার কথা, তাঁরা সঠিকভাবে কাজ করছেন না৷ অন্যদিক শ্রমিকরাও সচেতন না৷ কীভাবে এই আইন বাস্তবায়ন করতে হবে, তাঁরা সেটা জানেন না৷ ফলে সেখানে তাঁদের প্রশিক্ষণ খুব জরুরি৷

শ্রমিকদের  প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

সচেতন হও, সংগঠিত হও, রুখে দাঁড়াও৷ নিজের অধিকার নিজে আদায় করে নাও৷

বাংলাদেশে শ্রমিকবান্ধব আইন ও প্রশাসন কি আছে? মতামত লিখুন নীচের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন