সংশোধিত শ্রম আইন কতটা শ্রমিকবান্ধব হবে? | বিশ্ব | DW | 03.09.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

সংশোধিত শ্রম আইন কতটা শ্রমিকবান্ধব হবে?

বাংলাদেশে প্রচলিত শ্রম আইনের ৪১টি ধারা সংশোধন করে নতুন শ্রম আইনের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা৷ আইএলও এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপের মুখে এই সংশোধনী আনা হচ্ছে৷

এই আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷ কিন্তু আইনে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী অনেক ধারা আছে বলে দাবি শ্রমিক নেতাদের৷ তাঁরা বলছেন, ক্ষতিপূরণ বাড়ানো হয়েছে বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে যে ক্ষতিপুরণ শ্রমিকদের দেয়া উচিত, আইএলও'র বিধান মেনে তা করা হয়নি৷ আর এখন মামলা করতে শ্রমমন্ত্রনালয়ের অনুমোদন দরকার হবে, যা আরেকটি বড় ক্ষতির দিক৷

মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম দাবি করেছেন, আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী বর্তমান বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-কে আরো যুগোপযোগী ও শ্রমিকবান্ধব করা হয়েছে৷ নতুন আইনের নাম  দেয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন ২০১৮'৷

শ্রম আইন ২০০৬-কে  ২০১৩ সালে  একবার সংশোধন করা হয়েছিল৷ তখন এই আইনের ৯০টি ধারা সংশোধন করা হয়েছিল৷

শফিউল আলম জানান, ‘‘শ্রম আইনে ধারা ৩৫৪টি৷ এই সংশোধনী প্রস্তাবে দু'টি ধারা, চারটি উপধারা, আটটি দফা সংযোজন করা হয়েছে৷ ৬টি উপধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে৷ ৪১টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে৷''

৪১টি সংশোধনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের ২০ শতাংশের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে৷ এর আগে ৩০ শতাংশ লাগতো৷

৫১ শতাংশ শ্রমিকের অনুমতি সাপেক্ষে ধর্মঘট করা যাবে৷ আগে দুই তৃতীয়াংশ শ্রমিকের সম্মতি লাগতো৷

অডিও শুনুন 03:21

‘প্রস্তাবিত সংধোনী শুনলে মনে হয় অনেক ভালো, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন’

কর্মক্ষেত্রে কর্মরত অবস্থায় কোনো শ্রমিক মারা গেলে দুই লাখ টাকা এবং দুর্ঘটনায় স্থায়ীভাবে পঙ্গু হলে আড়াই লাখ টাকা শ্রমিককে দিতে হবে৷ আগে এই ক্ষতিপূরণ ছিল এক লাখ ২৫ হাজার টাকা৷ এখন সেটা বাড়িয়ে করা হয়েছে আড়াই লাখ টাকা৷ এছাড়া উৎসব-ভাতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে৷

১৪ বছরের কম বয়সি কোনো শিশুকে কোনো কারখানায় নিয়োগ দেওয়া যাবে না৷ ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোরদের কারখানায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে হালকা কাজে৷ আগে ১২ বছরের শিশুরা হালকা কাজের সুযোগ পেতো৷ ১৪ বছরের নীচে কাউকে নিয়োগ দিলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে৷

নারী শ্রমিকরা ৮ সপ্তাহের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন৷ এর ব্যাত্যয় হলে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে৷

কোনো নারী শ্রমিক সন্তানসম্ভবা হলে তার প্রমাণ পেশ করার ৩ দিনের মধ্যে ছুটি দিতে হবে৷

শ্রমিকদের মামলা শ্রম আদালতে ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে৷ নাহলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অবশ্যই করতে হবে৷ যদি এই ১৮০ দিনের মধ্যেও যদি নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে বাকি পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবে৷

অসদাচরণের জন্য মালিক ও শ্রমিকের কারাদণ্ড দুই বছর থেকে কমিয়ে এক বছরের প্রস্তাব করা হয়েছে৷

বেআইনি ধর্মঘটের শাস্তিও কমানোর প্রস্তাব হয়েছে৷  এখনকার আইনে এই সাজা এক বছর৷ সেটা ছয় মাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে৷ তবে জরিমানা আগের মতোই পাঁচ হাজার টাকা থাকছে৷

শ্রমিক সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন ৬০ দিনের পরিবর্তে ৫৫ দিনের মধ্যে করতে হবে৷কোনো শ্রমিক সংগঠন বিদেশ থেকে চাঁদা আনলে তা সরকারকে অবহিত করতে হবে৷

অডিও শুনুন 06:23

‘অনুমোদন নিতেই তো বহুদিন কেটে যাবে, শ্রমিকরা হয়রানির শিকার হবেন, মামলা তো পরের কথা’

শ্রমিকদের কল্যাণে যে-কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সরকার, মালিক ও শ্রমিক এই ত্রিপক্ষীয় পরিষদ করার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে৷

শ্রম প্রতিমন্ত্রী মো.মজিবুল হক চুন্নু সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রস্তাবিত আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে৷ সংসদের আগামী অধিবেশনে এ আইনটি পাস হবে৷''

ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার ডয়চে ভেলেক বলেন, ‘‘এই আইন সংশোধন নিয়ে আইএলও-কে সঙ্গে নিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেছি বার বার৷ তারপর সরকার নতুন করে সংশোধনের এই প্রস্তাব করেছে৷ তবে নীতিগতভাবে অনুমোদন হওয়া এই খসড়া আইনে অনেক কিছু আছে, যা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে যাবে৷''

তিনি বলেন, ‘‘মামলা নিস্পত্তির সময় বেঁধে দিলেও এখন আর শ্রমিকরা সরাসরি শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবেন না৷ কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া শ্রমিকরা মামলা করতে পারবেন না৷ এই অনুমোদন নিতেই তো মাসের পর মাস কেটে যাবে৷ শ্রমিকরা হয়রানির শিকার হবেন৷ মামলা তো পরের কথা৷''

ক্ষতিপূরণ বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আইএলও'র নীতি অনুযায়ী একজন শ্রমিক যখন নিহত বা পঙ্গু হবেন, সেই সময় থেকে গড় আয়ু হিসাব করে তিনি যতদিন কর্মক্ষম থাকতেন এবং সেই সময়ে যে আয় করতেন তার হিসাব করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে হয়৷ আমাদের এটাই দাবি ছিল৷ এক লাখ টাকা বাড়িয়ে বাহবা নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে৷ আমরা প্রকৃত ক্ষতিপূরণের বিধান চাই৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘ধর্মঘট করা, ট্রেড ইউনিয়ন করা, এসব নিয়ে যে সংখ্যাতাত্বিক পরিবর্তন আনা হযেছে, তাতে আসলে কোনো ফল আসবে না৷ কারণ, নানা কৌশলে ট্রেড ইউনিয়নের অনুমোদন আটকে দেয়া হচ্ছে৷ আর ধর্মঘট করার জন্য কোনো লিখিত সমর্থনের বিধান থাকা উচিত নয়, কারণ, যা অবস্থা তাতে কেউ সই করতে সাহস পাবে না৷''

জলি তালুকদার আরো বলেন, ‘‘এখন আউটসোর্সিয়ের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করা যাবে৷ ফলে মালিকরা কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ দেবে৷ মূল শ্রমিকদের চাকরিই হুমকির মুখে পড়বে৷''

তিনি জানান, ‘‘নতুন প্রস্তাবিত আইনে শ্রমিকদের ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে বদলির বিধান করা হচ্ছে৷ আগে ছিল আট কিলোমিটার৷ কিন্তু এজন্য কোনো প্রণোদনা বা ক্ষতিপূরণ নেই৷ ফলে শ্রমিকরা নতুন করে হয়রানির শিকার হবেন৷''

সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রস্তাবিত সংশোধনী শুনলে মনে হয় অনেক ভালো৷ কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন৷ আগে শ্রমিকদের ক্ষতিপুরণ ছিল লজ্জাকর, এখন হয়েছে হাস্যকর৷ মানুষের জীবনের দাম দুই-আড়াই লাখ টাকা! আর আইএলও কনভেনশনে বলা আছে, ১০ জন শ্রমিকও যদি শ্রমিক ইউনয়ন করতে চায়, তাঁদের অনুমতি দিতে হবে৷ কিন্তু সংশোধন প্রস্তাবেও ২০ শতাংশ বলা হয়েছে৷ আর শ্রমিকদের ধর্মঘটের ২১ দিন আগে নোটিশ দিতে হবে৷ এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া৷ এমনিতেই ৬০০ ট্রেড ইউনিয়নের মাত্র ৫০টি কাজ করতে পারে৷ বাকিরা পারে না৷ নতুন আইন আরো কঠিন হবে৷''

তবে তিনি শিশুশ্রম বন্ধের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘‘শিশুদের বাবা-মায়ের আয় না বাড়লে বাস্তবে শিশুশ্রম বন্ধ করা কঠিন হবে৷''

আইএলও'র কান্ট্রি ডিরেক্টর টুয়োমো পোটিয়ানিনেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা চাই এমন একটি শ্রম আইন হোক, যা সবার জন্য কল্যাণকর৷ কেবিনেটে সংশোধনীর খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে৷ এটি সংসদে পাশ হবে৷ তারপর আইন হবে৷ সংসদে পাশ হওয়ার আগে এই আইন নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারি না৷ তবে আশা করি, নতুন আইনে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন