শুধু শখে নয়, পরিবেশ রক্ষায় ছাদবাগান প্রয়োজন | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 16.10.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

শুধু শখে নয়, পরিবেশ রক্ষায় ছাদবাগান প্রয়োজন

ছাদবাগান৷ এটা নতুন কোনো ধারণা নয়৷ যিশু খ্রিষ্টের জন্মের পূর্বেও ছাদবাগান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়৷ ব্যাবিলনের সেই ঝুলন্ত উদ্যানের কথা তো আমরা সবাই জানি৷ এ যুগে ছাদবাগানের প্রয়োজন আরো বেড়েছে৷

ঐতিহাসিকভাবে ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের অস্তিত্ব না মিললেও ধারণা করা হয়, বিভিন্ন ছাদ ও বারান্দার সমন্বয়ে তৈরি ছিল সেটি৷ তবে ইতিহাসে ইরাকের মোসুল শহরের কাছেই আরেক ঝুলন্ত উদ্যানের নিদর্শন পাওয়া যায়৷

ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা৷ ঢাকামুখী মানুষের স্রোত প্রতিদিন বাড়ছে৷ নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ৷ ফলে দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে শহরটি৷ থাকার জায়গা সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে৷ বাড়ির ছাদের চিলেকোঠাও বসবাসের জায়গা হয়ে উঠেছে৷ বসতি বাড়ার সাথে সাথে এখানকার পরিবেশ দিন দিন প্রতিকূলে যাচ্ছে মানুষের৷ প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে নগরবাসীর জীবন৷ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাপমাত্রা৷ শহরের প্রায় ৬০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে ফাঁকা ছাদ, যা তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বেশ সহায়ক৷ এমন পরিস্থিতিতে ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী করতে হলে গাছ লাগানোর কোনো বিকল্প নেই৷ যেহেতু সমতলে গাছ লাগানোর জায়গা তেমন নেই, সেহেতু বাড়ির ছাদে কিংবা ব্যালকনিতে সুষ্ঠুভাবে বাগান করা হলে তাপমাত্রা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা৷

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি শহরের সব ছাদে পরিকল্পিতভাবে বাগান করা হয়, তাহলে তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমানো সম্ভব৷ ঢাকা শহরের প্রায় ৭০ শতাংশ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, যা এই নগরীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অনেকাংশে দায়ী৷

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের প্রায় ৬০ শতাংশ জায়গায় কংক্রিটের কাঠামো আছে, যা মূলত শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে৷ অধিক জনসংখ্যা, অতিরিক্ত নগরায়ন, যানবাহন, জলাধার ও গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে ঢাকার পরিবেশ দূষণ বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেক বেশি৷ ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের গাছপালার পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যা ধীরে ধীরে কমে ১৯৯৯ ও ২০০৯ সালে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে৷ অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের বাৎসরিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০০৯ সালে বেড়ে হয়েছে ২৪ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷

ঢাকায় মাটির অস্তিত্ব দিন দিন কমে আসছে৷ হারিয়ে যাচ্ছে খোলামেলা জায়গা৷ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে ছেয়ে গেছে শহর৷ ইট-কাঠের বদলে দ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ইস্পাতের কাঠামো ও কাচে মোড়ানো বহুতল ভবন৷ কাচে মোড়ানো দরজা-জানালায় ও বাণিজ্যিক ভবনের টেকসই স্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে হালকা, কিন্তু শক্তিশালী ধাতব পাত, ফাইবার ও গ্লাস৷ এতে তাপমাত্রা আরো বাড়ছে, কারণ, সূর্য থেকে তাপ ও আলো ধাতব ও কাচের কাঠামোর একটিতে পড়ে অপরটিতে প্রতিফলিত হয়৷ বারংবার প্রতিফলনের কারণে কিছু নির্দিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় সামান্য বেড়ে যায় এবং শহরজুড়ে তৈরি হয় অসংখ্য হিট আইল্যান্ড বা তাপ দ্বীপ৷ 

তবে এসব ভবনের ছাদে কিংবা এর কাঠামোতে বাগান করা গেলে বাগানের গাছ এ তাপ শুষে নেয় এবং গাছের দেহ থেকে যে পানি জলীয়বাষ্প আকারে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায়, তা সেই স্থানের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে আনে৷ অসংখ্য ছাদবাগান বা শহুরে গাছপালা এ প্রক্রিয়ায় শহরের উচ্চ তাপমাত্রাকে কমিয়ে আনে৷

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এ এফ এম জামাল উদ্দিন মনে করেন, ঢাকা শহরের চেয়ে গাজীপুরের তাপমাত্রা স্থানভেদে প্রায় ২ থেকে ৪ ডিগ্রি কম৷ রাস্তার পাশে বা ছাদের বাগানে বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদের সংখ্যা পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়ানো হলে তাপমাত্রা প্রায় দুই ডিগ্রি কমানো সম্ভব, যা বিশ্বের তাপমাত্রা কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবদান রাখবে৷

ঢাকায় গাছপালা কম থাকায় অক্সিজেনের উৎপাদন কম এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে৷ এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছ লাগানোর কোনো বিকল্প নেই৷

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ বলছিলেন, শহর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছাদবাগান প্রকল্প সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে তা কার্বন-ডাই-অক্সাইডসহ বেশকিছু ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা কমিয়ে দূষণ কমাবে এবং পরিবেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবে৷

অন্যদিকে গাছপালা গ্রীষ্মকালে তাপ গ্রহণ করে এবং শীতকালে তাপ বর্জন করে পরিবেশের তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা পালন করে৷ বেশি বেশি গাছ রোপণ করলে তা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ায়৷ তাই সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ছাদবাগান শুধু শখ থেকে নয়, পরিবেশের প্রয়োজনে বাগান করতে হবে৷ বিশেষ করে ঢাকা শহরের জন্য৷ এতে একদিকে যেমন পরিবেশ নির্মল থাকবে, অন্যদিকে পারিবারিক ফুল, ফল ও শাকসবজির চাহিদা মিটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখারও সুযোগ রয়েছে৷

ঢাকায় আগে ছাদবাগানের গুরুত্ব কম ছিল৷ তবে এখন প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ ছাদবাগানের দিকে ঝুঁকছে৷ একটা সময় বাড়ির ছাদে কিংবা ব্যালকনিতে গাছ লাগানো শখ মনে করতেন অনেকে৷ শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে বাড়ির ছাদে, বাসার ব্যালকনিতে ফুল, ফলের গাছ দেখা যেতো৷ তবে খুশির খবর হলো, এখন ঢাকার আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে গাছ দেখা যাচ্ছে৷ দিন দিন এর পরিমাণ বাড়ছে৷ ছাদবাগান করতে উৎসাহিত করছে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান৷ বাড়ির মালিকদের ছাদবাগানে উৎসাহিত করতে ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স ছাড় দিচ্ছে সরকার৷ যেসব বাড়ির মালিক ছাদে, বারান্দায়, বাসার সামনে বাগান করবেন তাঁরাই এ সুযোগ পাবেন৷ আর এ সুযোগ পেতে অনেকেই এখন ছাদে বাগান করছেন৷ 

অন্যদিকে প্রতিবছর ঢাকায় বৃক্ষ মেলার আয়োজন করা হয়৷ বৃক্ষপ্রেমীরা মেলায় আসেন, পছন্দের গাছ কেনেন৷ কয়েক লাখ চারা গাছ বেচাকেনা হয় এখানে৷ এর বেশিরভাগই স্থান পায় রাজধানীর বিভিন্ন বাড়ির ছাদ, ব্যালকনি কিংবা বাসার সামনের খোলা জায়গায়৷ এসব চিত্রই বলে দেয়, রাজধানীতে মানুষের মধ্যে গাছ লাগানোর আগ্রহ বেড়েছে৷ প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ বলছিলেন, ঢাকায় এখন ৬০ ভাগ বাড়ির ছাদে বাগান করা হয়েছে৷ আশার কথা হচ্ছে, রাজধানীর শতভাগ মানুষ এখন ছাদবাগানের বিষয়ে অবহিত৷

যাঁদের ছাদ নেই, ভাড়া বাসায় থাকেন, তাঁরাও কিন্তু বসে নেই৷ বাসার ভিতরে, দরজার সামনে, সিঁড়ির গোড়ায় কিংবা ব্যালকনি থাকলে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগাচ্ছেন তাঁরা৷ ফুলের গাছের পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রজাতির শাকসবজির চারা লাগানোর প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি৷ কারণ, মানুষ মনে করে, তাজা শাকসবজি খেতে চাইলে এর কোনো বিকল্প নেই৷ বাজারের শাকসবজি, ফলের প্রতি তাঁদের আস্থা কম৷

Parvin Akter Bithi Bangladesch

পারভিন আক্তার বিথী, গবেষক, শেরেবাংলা এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি রিসার্স সিস্টেম

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাথের পাশে বেসরকারি নার্সারি রয়েছে৷ কর্মব্যস্ত মানুষ কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে এসব নার্সারি থেকে গাছ কিনছেন৷ সঠিক পরিচর্যার অভাবে অনেক সময় গাছ মরে যায়৷ তবে এখন এর পরিমাণ কমে গেছে৷ আগে মানুষ গাছ পরিচর্যার নিয়ম-কানুন জানতেন না৷ নার্সারিগুলোতে গাছের পাশাপাশি গাছ পরিচর্যার নানা উপকরণ, সার-কীটনাশক, বিভিন্ন নির্দেশনার বইও পাওয়া যায়৷

ছাদবাগানের সুনির্দিষ্ট মডেল এদেশে এখনও পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি৷ পাকা বাড়ির খালি ছাদে অথবা ব্যালকনিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ফুল, ফল, শাকসবজির বাগান গড়ে তোলাকে ছাদবাগান মনে করছেন সবাই৷ বাড়ির মালিক তাঁর পছন্দমতো আপন ভঙ্গিমায় সাজিয়ে তোলেন তাঁদের ছাদকে৷ তবে এলোমেলো ও অপরিকল্পিত ছাদবাগান কেবল সময়, অর্থ অপচয়ই করায় না, সেই সাথে ভবনেরও নানা ক্ষতি করে৷ তাই কিছু মৌলিক বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে ছাদবাগান গড়ে তোলা প্রয়োজন৷ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের ছাদে বাগানের একটি নতুন মডেল তৈরি করা হয়েছে, যার নাম ‘নিবিড় ছাদবাগান'৷ সেখানে বাগানের মোট ক্ষেত্রফলের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ রাস্তা, ১০ শতাংশ বসার জায়গা, ৪০ শতাংশ শাক-সবজি, ১০ শতাংশ ফুল ও শোভাবর্ধক গাছ, ২০ শতাংশ ফল, মসলা ও ওষুধি এবং ৫ শতাংশ অন্যান্য গাছের জন্য বিবেচনায় রেখে বাগানের মডেল প্রস্তুত করা হয়েছে৷ এ মডেলের বৈশিষ্ট্য অধিক জীববৈচিত্র্য, দৃশ্যত খুবই আকর্ষণীয়, বিনোদন ও খাদ্য উৎপাদনের জায়গা হিসেবে ব্যবহারযোগ্য৷

বাগানটি সম্পর্কে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব ইসলাম বলেন, ‘‘বহির্বিশ্বের মানুষ অনেক আগে থেকেই ছাদে বাগান করে আসছে৷ বর্তমানে বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায় অপরিকল্পিতভাবে অল্পসংখ্যক ছাদবাগান করা হলেও তা ব্যাপকতা লাভ করতে পারেনি৷ এজন্য আমাদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে৷ ছাদে বাগান করে শহরে গাছপালা বর্ধনের মাধ্যমে জীবের জন্য নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব৷''

 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন