শুধু মুসলিম নয়, এনআরসি নিয়ে ভয়ে ভারতের হিন্দুরাও | বিশ্ব | DW | 20.02.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

শুধু মুসলিম নয়, এনআরসি নিয়ে ভয়ে ভারতের হিন্দুরাও

বিজেপি বলছে এনআরসি-সিএএ নিয়ে শুধু মুসলিমরাই আন্দোলনে। বাস্তব অন্য রকম। হিন্দুরাও একই রকম ভয়ে আছেন। আন্দোলনেও।

২০১৯ সালের লোকসভা ভোট। পেশার সূত্রে পশ্চিমবঙ্গের আনাচকানাচ ঘুরতে হয়েছিল মূলত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্বাচনী প্রচার দেখতে। প্রায় প্রতিটি সভায় গিয়েই একটি বিষয় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতেন শাহ। ক্ষমতায় এলে প্রথমে তাঁরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন করবেন এবং তার পরেই পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হবে। অর্থাৎ, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি। এই দু'টি বাক্য বলেই গলার স্বর অনেকটা চড়িয়ে শাহ বলতেন, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে খুঁজে চিহ্নিত করে দেশের বাইরে বার করে দেওয়া হবে। এটাই তাঁর সরকারের সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সীমান্ত লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গ ৭০ বছর ধরে দেখেছে এবং দেখছে দেশ ভাগের বাস্তবতা। হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে গিয়ে মোদী-শাহদের এ ধরনের প্রচারে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল। অনুপ্রবেশকারী হিসেবে তাঁরা কেবলমাত্র মুসলিমদেরই চিহ্নিত করছেন এবং ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করে ভোট বৈতরণি পার করতে চাইছেন। বস্তুত, দীর্ঘ দিন ধরে এটাই বিজেপি এবং আরএসএস এর রাজনীতির পরিচিত ছক। মোদী-শাহের আমলে যা চূড়ান্ত চেহারা পেয়েছে বলে রাজনীতির কারবারিদের একাংশের বক্তব্য।

লোকসভা নির্বাচন পর্বে আসামে এনআরসি বা নাগরিক পঞ্জির কাজ শুরু হয়ে গেলেও চূড়ান্ত তালিকা তখনও তৈরি হয়নি। ফলে বিজেপি খুব সহজেই ধর্মীয় মেরুকরণের তাস ব্যবহার করে এক শ্রেণির হিন্দু নাগরিকের মন জয় করতে পেরেছিল। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফলাফলেই তা বোঝা গিয়েছে। যে বিজেপি এ যাবৎ পশ্চিমবঙ্গে ১৯ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি, লোকসভা নির্বাচনে সেখানে ৪০ শতাংশের আশেপাশে ভোট পেয়েছে। জিতে নিয়েছে ১৮টি আসন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আলোচনায় ধর্মীয় মেরুকরণ অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, বিজেপি যেমন ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেই একই কাজ করেছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু ভোট পুরোটাই নিজের দিকে রাখতে তিনি কংগ্রেস এবং বাম দলগুলিকে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক করে বিজেপিকে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে এনেছেন। ভেবেছেন, ধর্মীয় মেরুকরণ হলে বাম এবং কংগ্রেসের মুসলিম ভোটও তাঁর ঝুলিতে ঢুকবে। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। ভোটের অঙ্কে ধর্মীয় ভোট বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের একটা বড় অংশ ভেবেছিল, সিএএ এবং এনআরসি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে মুসলিমদের উপর। হিন্দুদের উপর নয়। কিন্তু আসামের তালিকা সব বদলে দিয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের পর পরই আসামে এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়। তালিকায় মোট ১৯ লক্ষ লোকের নাম আছে। যার মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ বঙ্গভাষী হিন্দু এবং ৭ লক্ষ মুসলিম। বাকি ৭ লক্ষ মানুষের একটা বড় অংশ আসামের আদি বাসিন্দা এবং অন্য অংশ উত্তর ভারতীয়। অর্থাৎ, সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কোনও এক পক্ষ নয়।

কী হবে এই ১৯ লক্ষ মানুষের? সত্যি সত্যি কি তাঁরা ভারতীয় নন? কোথা থেকে তাঁরা এসেছেন? এর পরে তাঁরা যাবেন কোথায়? প্রশ্ন অনেক। উত্তর নেই। পুরোটাই ধোঁয়াশা। দেশ থেকে তাঁদের তাড়াতে হলে অন্য দেশে পাঠাতে হবে। কিন্তু অন্য দেশ তাঁদের নেবে কেন? শেষ পর্যন্ত এই মানুষদের একটা বড় অংশর গন্তব্য হবে ডিটেনশন ক্যাম্প। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে। গোটা আসামজুড়ে তৈরি হয়েছে এমন অনেক ক্যাম্প। সেখানেই কি তাঁদের বাকি জীবন কাটাতে হবে? সে উত্তরও স্পষ্ট নয়। এমনও ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একই পরিবারের একজন বা দু'জন সদস্যকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ডিটেনশন সেন্টারে। বাকিরা উদভ্রান্তের মতো বিচারের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে আসাম জুড়ে।

আসামের এই অনিশ্চয়তার পিছনে একটা লম্বা ইতিহাস আছে। যার শুরু সেই ১৯৫০ এর দশকে। অত পিছনে না গিয়েও বলা যায়, স্থানীয় অহমিয়াদের সঙ্গে আসামে বসবাসকারী বাঙালিদের বচসা বহু দিনের। যার জেরে ১৯৭০ এর দশকে হয়েছিল 'বাঙালি খেদাও' আন্দোলন। আসামের ছাত্র সংগঠন আসুর সেই জঙ্গি আন্দোলনের প্রভাবে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল আসাম। কেন্দ্রীয় সরকারকেও সেখানে হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং এনআরসি-র দাবি মেনে নিতে হয়।

মনে রাখা দরকার, দেশ ভাগের পর আসামে বসবাসকারী বাঙালিদের একটা অংশ এসেছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে। সিলেট থেকে আসামের বরাক উপত্যকায় এসে নতুন করে থাকতে শুরু করেন তাঁরা। কেউ কেউ চলে যান শিলংয়ে। আর বাঙালিদের আর একটি অংশ কাজের সূত্রে আসামে পৌঁছে গিয়েছিলেন সেই ব্রিটিশ আমলে। স্থানীয় অহমিয়াদের দাবি. আসাম কেবল অহমিয়াদের জায়গা। বাঙালিদের সেখানে থাকতে দেওয়া হবে না। হিন্দু-মুসলিমের ধর্মীয় মেরুকরণের প্রশ্ন সেখানে ছিল না। কিন্তু বিজেপি আসামের সেই আগুন-রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণের স্ফূলিঙ্গ দেখতে পায়। বিজেপি ভেবেছিল, মুসলিম অনুপ্রবেশের বিষয়টির আধারে আসামের এনআরসি মডেল দেশ জুড়ে ছড়িয়ে দেবে তারা। কিন্তু বাস্তবে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের অঙ্ক খাটেনি। এনআরসিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সব পক্ষই। তার উপর সিএএ আশায় আগুন আরও তীব্র ভাবে জ্বলে উঠেছে।

পশ্চিমবঙ্গে যে হিন্দুরা বিজেপির এনআরসিপ্রচারে আশার আলো দেখেছিলেন, আজ তাঁরাও ভয় পাচ্ছেন। তাঁদের প্রশ্ন, আসামের মতো যদি পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি হয়, তাহলে শুধু মুসলিম নয়, হিন্দুরাও ছাড় পাবেন না। সকলকেই যেতে হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। কারণ, নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যে কাগজগুলি দেখানোর কথা বলা হচ্ছে, যে নথি জমা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, দেশ ভাগের সময় ভারতে চলে আসা বহু হিন্দু পরিবারের কাছেও সে সব নথি নেই। থাকা সম্ভবও নয়। এনআরসি হলে আসামের হিন্দুদের মতো তাঁরাও ফ্যাসাদে পড়বেন। ফলে গোটা দেশের মুসলিমদের মতো, হিন্দুরাও বিজেপির রাজনীতিকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে।

আসামের এনআরসি তালিকা যে তাঁদের বিপাকে ফেলেছে, বিজেপিও সে কথা বুঝতে পেরেছে। ফলে সিএএ নিয়ে প্রচার চালালেও আপাতত এনআরসি নিয়ে প্রচার করছে না বিজেপি। বরং বলা হচ্ছে, সিএএ কিংবা এনআরসি-তে হিন্দুদের কোনও সমস্যা হবে না। কারণ, সিএএ তে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের শরণার্থীর স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা আছে। শুধু তাই নয়, এই শরণার্থীরা ৫ বছর এ দেশে থাকলেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। কিন্তু তাতেও চিঁড়ে ভিজছে না।

Syamantak Ghosh

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

প্রশ্ন উঠছে, যে হিন্দু উদ্বাস্তুরা ৭০ বছর আগে কিংবা ৫০ বছর আগে কিংবা ৩০ বা ২০ বছর আগে এ দেশে চলে এসেছেন, এ দেশে ভোট দিয়েছেন, নাগরিকত্ব পেয়েছেন, চাকরি করছেন, বাড়ি কিনেছেন, ব্যবসা করছেন, আজ এনআরসিতে তাঁদের নাম উঠলে কী অবস্থা হবে? তা হলে কী তখন ৫ বছর ডিটেনশন সেন্টারে কাটিয়ে ফের তাঁদের নতুন করে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হবে? কী হবে তাঁদের সম্পত্তির? আসলে আসামের এনআরসি দু'টি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। এক, সমস্যাটা কোনও এক পক্ষের নয়, সকলের। বহু মুসলিম বরাবর এ দেশে থেকেও এনআরসি-র শিকার হয়েছেন। সম্প্রতি জুবেদা বিবির কাহিনি আবার সে বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। আর দুই, এ ভাবে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা যায় না।

আগামী বছরের গোড়ায় পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামে বিধানসভা ভোট। মোদী-শাহ যে তাস খেলে সেই নির্বাচনে নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক পোক্ত করতে চেয়েছিলেন, আপাতত সে গুড়ে বালি। তবে বিরোধীদেরও মনে রাখা দরকার, ভোটে ধর্মীয় মেরুকরণের অঙ্ক কষে আখেড়ে কারও সুবিধা হয় না। লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখেও তৃণমূল যদি তা বুঝতে না পারে, তা হলে বিপদ আসন্ন। রাজনৈতিক অঙ্ক সাধারণ মানুষকে কোন দুর্বিপাকে ফেলতে পারে, আসামে তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। বাকি দেশ এর থেকে শিক্ষা নিয়েছে। দেশ জুড়ে যে এনআরসি সিএএ বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে, বিজেপি তাকে যতই মুসলিমদের আন্দোলন বলে চালানোর চেষ্টা করুক, আসলে তা একত্র আন্দোলনেরই নজির তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন