শিক্ষা ও ক্রীড়া বাজেটে পর্যাপ্ত ‘উন্নয়ন’ প্রত্যাশা | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 30.05.2021

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

শিক্ষা ও ক্রীড়া বাজেটে পর্যাপ্ত ‘উন্নয়ন’ প্রত্যাশা

একটি জাতির যথাযথ বিকাশের জন্য শিক্ষা ও ক্রীড়ার গুরুত্বটা নীতিনির্ধারকদের অজানা নয়৷ কিন্তু সে গুরুত্বের প্রতিফলন কি বাজেটে থাকে? শিক্ষাবিদ ও ক্রীড়াবিদরা বলছেন, অন্যতম গুরুত্বের দাবিদার হলেও এই খাতটি অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে৷

জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বরাবরই ১১ শতাংশের আশেপাশে৷ যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন খাতে দশমিক তিন-শূন্য শতাংশের মতো৷ এসবই মুখস্ত, গৎবাঁধা৷ একটু এদিক-সেদিক করে আসন্ন বাজেটেও কি অমনই থাকবে? অবহেলিতই থেকে যাবে প্রজন্মের স্ফূরণের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এ দুটো জায়গা?

২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ছয়-নয় শতাংশ৷ এর আগেরবার ৬১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা; মানে ১১ দশমিক ছয়-আট শতাংশ৷ যুব ও ক্রীড়া উন্নয়নে বরাদ্দ যথাক্রমে ১ হাজার ৪৭৪ কোটি এবং ১ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা৷ শতাংশের হিসেবে যা দশমিক তিন এরও কম৷ এ কি যথেষ্ট?

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বাজেটে শিক্ষাখাতের বরাদ্দকে মোটেই যথেষ্ট বলে মনে করেন না, ‘‘এটা কখনোই যথেষ্ট ছিল না৷ শুধুমাত্র ২০০০ সালে আমরা শিক্ষায় ১৪ শতাংশ বাজেট পেয়েছিলাম৷ এরপর ১১, বড়জোর ১২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে৷ আরেকটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে এই শিক্ষাবাজেটে৷ আমাদের কখনো জুড়ে দেয়া হয়েছে তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে, কখনো জুড়ে দেয়া হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে৷ অন্যগুলোতে জুড়ে দেবার কারণে টাকার অঙ্কে শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ হিসেবে দেখানো হয়৷ কিন্তু জিডিপির দুই থেকে আড়াই শতাংশের মধ্যেই শিক্ষাখাতের বরাদ্দ সীমাবদ্ধ থাকে৷’’

এই যে শুভঙ্করের ফাঁকির কথা বলছেন, সেটি কার সঙ্গে? হতাশামাখা কণ্ঠেই জবাব দেন রাশেদা কে চৌধুরী, ‘‘ফাঁকিটা নিজেরাই নিজেদের দেই বলবো৷ শিক্ষা এত বড় একটা খাত৷ প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী আছে, আমাদের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত৷ প্রায় পাঁচ লক্ষ শিক্ষক৷ চার কোটি শিক্ষার্থীর সঙ্গে মা-বাবা দুজন করে ধরলেও আরো আট কোটি মানুষ৷ আট ও চার মিলিয়ে ১২ কোটি হলো৷ জাতির তিন-চতূর্থাংশের ভবিষ্যৎ এই শিক্ষায়৷ সে অনুপাতে কি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে দেখি? এখানেই শুভঙ্করের ফাঁকি৷ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বিবেচনা করলে তা নগণ্য৷ জিডিপির খাতে বিবেচনা করেন, সেটি দক্ষিণ এশিয়ায় নিম্নতম৷ এজন্যই শুভঙ্করের ফাঁকি বলছি৷’’

অডিও শুনুন 08:38

‘শিক্ষা খাতে বরাদ্দে শুভঙ্করের ফাঁকি’

উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে সত্যি৷ কিন্তু সে অনুপাতে কর্মসংস্থান হয়নি৷ ঠিক এই কারণেই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরিতে সরকারের অনীহা রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন৷ অমনটা হলে তা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া বলেই রাশেদা কে চৌধুরীর মত, ‘‘এই অনীহা থাকাটা মানবাধিকারকে ছোট করা৷ আমাদের সংবিধানকে ছোট করা৷ সংবিধানে সকল নাগরিকের জন্য মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব৷ তাহলে এই অনীহা থাকলে বলতে হবে সংবিধানকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না৷ অন্য কেউ সংবিধান লংঘন করলে তাকে শাস্তি পেতে হয়৷ এখানে সংবিধান লংঘন বলবো না, কিন্তু এ জায়গায় তো রাষ্ট্র ক্রমাগত সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে৷’’

বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দে নিজের দাবিটাও জানিয়ে রেখেছেন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী, ‘‘আমি সরকারের প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকেই বলবো, মোট বাজেটের ২০ শতাংশ, জিডিপির চার শতাংশ হওয়া উচিত শিক্ষার বরাদ্দ৷ তারপরও সরকারের সীমাবদ্ধতা চিন্তা করে বলেছি, এটা এ বছর জিডিপির তিন শতাংশ, আগামী বছরের মধ্যে চার শতাংশ করা উচিত৷’’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান শেখ আদনান ফাহাদের মতও তেমনটা, ‘‘জিডিপের চার শতাংশ বরাদ্দ শিক্ষায় থাকা উচিত৷ এখন যে বরাদ্দ তা মোটেই যথেষ্ট না৷’’ কয়েক দিন আগে প্রকাশিত দুর্নীতির দিকে ইঙ্গিত করে নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তিনি, ‘৯টি গভীর নলকূল স্থাপনেই ১২০ কোটি? এক কোটি টাকা পেলে বিভাগ পুরো চেইঞ্জ করে ফেলতাম’৷ অমন বরাদ্দ পেলে কী পরিবর্তন করতেন? ‘‘আমাদের শিক্ষার্থীদের তৈরির জন্য আধুনিক ল্যাব প্রয়োজন৷ ক্যামেরা প্রয়োজন৷ স্টুডিও প্রয়োজন৷ আরো অনেক প্রাযুক্তিক সুবিধা দরকার৷ শুধু অর্থের অভাবে তা করতে পারছি না৷ আর এ অবস্থা শুধু আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে না, সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায়ই সত্য৷ শিক্ষায় যথেষ্ট বরাদ্দ না বাড়লে আমরা জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারবো না,’’ বলেন শেখ আদনান ফাহাদ৷

আবার শুধু শিক্ষাই কি যথেষ্ট? মানসিক বিকাশের জন্য ক্রীড়াচর্চার গুরুত্বও তো অসীম৷ জাতীয় বাজেটে ওই খাতের অবস্থা আরো শোচনীয়৷ ক্রীড়া সেখানে জুড়ে যুব উন্নয়নের সঙ্গে৷ খেলাধুলার ক্ষেত্রে বরাদ্দ বড্ড অপ্রতুল৷ কিন্তু সমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধের জন্য তৃণমূলের ক্রীড়াচর্চা বাড়ানোর বিকল্প দেখেন না বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা নাজমুল আবেদীন ফাহিম, ‘‘তরুণ প্রজন্মের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যে কথা বলি, তার মূল কারণ খেলাধূলার চর্চা না থাকা৷ তৃণমূল পর্যায় থেকে কিভাবে আমরা এ চর্চা শুরু করতে পারি, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে৷ আর তা শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে না, বরং ভালো মানুষ তৈরির জন্য যে প্রভাব, সেটি নিশ্চিত করার জন্য৷ এজন্য একটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান দরকার৷ এবং তা বাস্তবায়নের জন্য ওই রকম বাজেট থাকা উচিত৷ শুধু সাধারণ শিক্ষা যে যথেষ্ট না, সে উপলব্ধি বোধহয় আমাদের এসেছে৷ এর পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং খেলাধুলা, এসব চর্চা খুব জরুরি তরুণ প্রজন্মকে ঠিক পথে নেবার জন্য৷ এটার কোনো বিকল্প নেই৷’’

অডিও শুনুন 03:13

‘শুধু সাধারণ শিক্ষা যে যথেষ্ট না, সে উপলব্ধি বোধহয় আমাদের এসেছে’

৩০-৩৫ বছর আগে বাংলাদেশে ক্রীড়াচর্চা হতো অনেক বেশি স্থানীয় সংগঠনের মাধ্যমে৷ সরকারের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত৷ গত ১৫-২০ বছরে স্থানীয় সাংগঠনিক পর্যায়ে তা কমে যাওয়ায় সরকারের দায়িত্ব কি আরো বেড়ে যাচ্ছে না? ‘‘অবশ্যই৷ যেহেতু আমাদের জাতীয় আয় আগের তুলনায় অনেক বেশি, খাদ্য-বাসস্থান-স্বাস্থ্য এর বাইরেও চিন্তা করতে পারি৷ এখন সময় এসেছে ওখানে বিনিয়োগ করার৷ যেটি দিয়ে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো৷ এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ পাশাপাশি তখন ক্রীড়া সাফল্যও আমাদের অনেক বেশি আসবে৷ এখানে যদি বিনিয়োগ করতে পারি, তাহলে আমাদের বহুমুখী লাভ হবে,’’ বলেছেন ফাহিম৷

এই ক্রীড়াসাফল্য বলতে তো মোটা দাগে বাংলাদেশের ক্রিকেটের কথাই চলে আসে৷ কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জাতীয় বাজেটে বরাদ্দের মুখাপেক্ষী না৷ তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ৷ কিন্তু অন্য বেশিরভাগ ক্রীড়া ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশন তেমন নয়৷ তারা চেয়ে থাকে বাজেটের দিকেই৷ আর অন্যান্য খেলাতেও যে বাংলাদেশে প্রতিভা রয়েছে, কিছুদিন আগে বিশ্বকাপ আর্চারি রিকার্ভ মিশ্র ইভেন্টের ফাইনালে উঠে প্রমাণ দিয়েছেন রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দকী জুটি৷

আর্চারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপলও ক্রীড়া ক্ষেত্রে বাজেটের বাড়তি বরাদ্দ চান৷ এক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় খেলাগুলোকে যেন সরকার অগ্রাধিকার দেয়, সে দাবি করেছেন তিনি, ‘‘সরকার যদি ১০ বছরের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে, সেক্ষেত্রে অমন বাজেট প্রয়োজন৷ আমাদের যে অর্থ দেওয়া হচ্ছে না, তা নয়৷ তবে আর্চারি, শ্যুটিং, ভারোত্তলন, কুস্তি, সাঁতার এমন সম্ভাবনাময় একক ডিসিপ্লিনকে যদি অগ্রাধিকার দেয়া হয়, বাজেটের বন্টন যদি সেভাবে হয়, তাহলে আমরা আরো ভালো ফল নিয়ে আসতে পারবো৷''

মাঠের ভালো ফল তো অবশ্যই বড় প্রণোদনা৷ তবে শিক্ষা ও ক্রীড়ায় অগ্রাধিকার দিলে সবচেয়ে ‘ভালো ফল' হবে নতুন প্রজন্মের সামগ্রিক মেধা-মননের যথাযথ বিকাশ৷ জাতির জন্য তখন সত্যিকার অর্থেই শিক্ষা হবে শক্তি, ক্রীড়ায় মিলবে যাবতীয় সামাজিক অনাচার থেকে মুক্তি৷

জাতীয় বাজেটে এই দুই খাতের বরাদ্দে এবার কি থাকবে তার প্রতিফলন?

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়