শব্দদূষণ? খায়, না মাথায় দেয়? | আলাপ | DW | 12.02.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

শব্দদূষণ? খায়, না মাথায় দেয়?

দৈত্য বললে ভারতীয় বোঝে হিংসুটে দৈত্যের কাহিনি৷ শব্দও যে দৈত্য হতে পারে, হৃদয়বিদারক শব্দে যে শরীর মন অচল হয়ে পড়তে পারে, আম ভারতীয়দের এখনো সেই ধারণা তৈরিই হয়নি৷ তাই শব্দদূষণ নিয়ে কারও কোনো মাথা ব্যথা নেই৷

ঘটনা এক
‘আজানের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় প্রতিদিন৷ এটা মেনে নেওয়া যায় না৷’
কয়েকমাস আগে এই মর্মেই টুইট করেছিলেন ভারতের এক বিখ্যাত গায়ক সনু নিগম৷ যা নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল দেশ জুড়ে৷ অনেকেই সনুকে সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যা দিয়েছিলেন৷ নিজের সপক্ষে অবশ্য যুক্তিও তৈরি করেছিলেন সনু৷ তাঁর বক্তব্য ছিল, আজান নিয়ে তাঁর কোনো সমস্যা নেই৷ বস্তুত, আজানের সুর তিনি পছন্দ করেন৷ কিন্তু যেভাবে প্রতিদিন ভোরে তাঁর বাড়ির পাশে ফাটা টোঙে আজান বেজে ওঠে, তার সঙ্গে সুরের কোনো সম্পর্ক নেই৷ এটা একপ্রকার শব্দদূষণই বটে৷ বিতর্ক অবশ্য থেমে থাকেনি৷ চলেছে নিজের তালে৷ থেমেও গিয়েছে সময়ের দাবিতে৷

ঘটনা দুই
বিহারের গয়ার অনতি দূরে বুদ্ধগয়া৷ কেউ কেউ যাকে বোধগয়াও বলে থাকেন৷ মূলত বৌদ্ধদের জায়গা৷ এখানেই বোধীবৃক্ষের তলায় বসে গৌতম বুদ্ধ বোধী লাভ করেছিলেন বলে কথিত৷ এখন সেখানে বিশালাকার বুদ্ধমন্দির এবং মঠ৷ সারা পৃথিবীর বৌদ্ধেরা বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে নানা অনুষ্ঠান উদযাপন করেন এই মঠে৷ বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন দু’দিন ধরে বিপুল অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়৷ সকালে শান্তি প্রার্থনার পর বিকেলে আয়োজন হয় বিশাল প্রদীপ মিছিলের৷ হাজার হাজার বৌদ্ধ নিঃশব্দে যোগ দেন সেই মিছিলে৷ মঠ পরিক্রমা হয়৷ পিনপতনের নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে ভঙ্গ হয় ‘ওম মনি পদ্মে হুম’ শ্লোক উচ্চারণে৷ অথচ সামান্য এই নিরবতাও পছন্দ নয় অনেকের৷ পার্শ্ববর্তী শংকরাচার্যের আশ্রমে ঠিক সেই সময়েই শুরু হয় অষ্টপ্রহর নামসংকীর্তন৷ ফাটা চোঙে তীব্র শব্দে যা বাজে, তাকে ‘ব্যঙ্গকীর্তন’ বলাই অনেক বেশি শ্রেয়৷ নামকীর্তনের মধুরতার ‘ম’টুকুও থাকে না সেখানে৷ অনেকেই বলেন, বৌদ্ধ মঠের উৎসবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্যই নাকি সেখানে তারস্বরে মাইক বাজিয়ে দেওয়া হয়৷

ব্লো হর্ন প্লিজ
পাল্লা৷ ভারতের শব্দদূষণের গোড়ার কথাই সম্ভবত পাল্লা দেওয়া৷ রাস্তায় একটি গাড়ি একবার হর্ন বাজালে, দ্বিতীয় গাড়িটিকে পাল্লা দিতেই দু’বার হর্ন বাজাতে হয়৷ যা শুনে তৃতীয় গাড়ি চক্রবৃদ্ধিহারে হর্ন বাজাতে শুনে করে৷ শেষপর্যন্ত যার পরিনামে রাস্তায় যা ঘটে, তাকে এককথায় ক্যাকোফোনি বলা যায়৷ কোনো একটি শহরে নয়, ভারতের সর্বত্র একই ছবি৷ হর্ন বাজানো যে অন্যায়, শব্দদূষণ যে একটা সমস্যা, এর ফলে মানুষের যে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, এই সাধারণ ধারণাটাই নেই অধিকাংশ মানুষের৷ বরং শব্দ করাই যেন একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ তা সে বাজিই হোক অথবা মাইক, হর্ন হোক অথবা উচ্চৈস্বরে চিৎকার৷ গাড়ির পিছনে ‘ব্লো হর্ন’ লেখাই তাই ভারতের স্বাভাবিক প্রবণতা৷

দিল্লি কা লাড্ডু
২০১১ সালে সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সংক্ষেপে সিএসই একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিল৷ বিশ্বের ৫০টি শহরের ২০ হাজার মানুষের থেকে স্যাম্পল জোগাড় করে তারা একটি সার্ভে করে৷ যেখানে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শব্দ দূষণে আক্রান্ত শহরগুলির মধ্যে দিল্লি অন্যতম৷ খুব পিছনে নেই মুম্বইয়েও৷ তাদের রিপোর্ট বলছে, শ্রবণসমস্যায় আক্রান্ত দিল্লির ৬৪ শতাংশ মানুষই আসলে শব্দদূষণের শিকার৷ শুধু তাই নয়, তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, দিল্লির অধিকাংশ জায়গায় শব্দমাত্রা ১০৫ ডেসিবল৷ অথচ, সাইলেন্স জোনে ডেসিবলের মাত্রা হওয়ার কথা ৫০, এবং রেসিডেন্সিয়াল অঞ্চলে শব্দমাত্রা ৫৫ ডেসিবল হওয়ার কথা৷ অর্থাৎ, স্বাভাবিকের চেয়ে শব্দমাত্রার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ৷ অথচ কারও সে বিষয়ে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই৷ এর বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেই মানসিকতাটিই প্রশাসনের গড়ে ওঠেনি৷ শুধু সিএসই নয়, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বা হু’র রিপোর্টেও সম্প্রতি বলা হয়েছে, ভারতের প্রায় ছ’শতাংশ মানুষ শ্রবণসমস্যায় আক্রান্ত৷ এবং যার পুরোটাই শব্দদূষণের কারণে৷ ৩৩০ কোটি মানুষের দেশে ছ’শতাংশ কিন্তু নেহাত কম সংখ্যা নয়৷ এবং এ হারে শব্দদূষণ চলতে থাকলে সখ্যাটা অচিরেই দুই অঙ্কে গিয়ে পৌঁছবে৷ অন্তত তেমনই আশঙ্কা হু’য়ের৷

পিছিয়ে নেই কলকাতা, চেন্নাই
২০১৭ সালের মে মাসে সংসদের রাজ্যসভায় পরিবেশ মন্ত্রক একটি রিপোর্ট পেশ করে৷ তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী অনিল মাধব ডেভ রিপোর্টটি পড়েও শোনান৷ যেখানে বলা হয়েছে, ভারতের সাতটি মেট্রোপলিটান শহরে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল সরকারের তরফ থেকে৷ যার মধ্যে ছিল, মুম্বই, দিল্লি, কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ এবং লখনউ৷ কেন্দ্র এবং রাজ্যের পরিবেশ মন্ত্রক এবং দফতর একত্রে সেই সমীক্ষা চালায়৷ প্রতিটি শহরে শব্দমাত্রা মাপার জন্য ৭০টি করে যন্ত্র বসানো হয়েছিল৷ দেখা গেছে, প্রতিটি শহরেই শব্দমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি৷ যার কারণ হিসেবে পরিবেশ মন্ত্রক জানিয়েছিল, অত্যধিক গাড়ির হর্ন, মাইকের ব্যবহার এবং বাজি শব্দদূষণের অন্যতম কারণ৷ অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না৷ ভারতীয় আইনে স্পষ্ট করেই শব্দের মাত্রা উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে৷ সেখানে গাড়ির হর্ন থেকে শুরু করে বাজির ব্যবহার কিংবা এয়ারকন্ডিশনারের আওয়াজ, সবকিছুরই উল্লেখ আছে৷ 

একনজরে আইন
১৯৮৬ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, গাড়ির হর্ন, জেনারেটর সেট, এয়ারকন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর এবং বেশকিছু কনস্ট্রাকশন যন্ত্র নির্দিষ্ট শব্দমাত্রার বেশি হতে পারবে না৷ শব্দ বেশি হলে সেগুলি বাজারে বিক্রি হওয়ার ছাড়পত্র পাবে না৷ কেউ তা ব্যবহার করলেও জরিমানা দিতে হবে৷

১৯৮৯ সালের কেন্দ্রীয় মোটরভেহিক্যাল আইনেও স্পষ্ট বলা হয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার ব্রিগেড এবং পুলিশের গাড়ি ছাড়া প্রেশার হর্ন বা এয়ার হর্ন ব্যবহার করা যাবে না৷ করলে বিপুল পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে৷ বাজি ফাটানোর ক্ষেত্রেও ১৯৮৬ সালের আইনে পরিষ্কার বলা হয়েছে, বাজি ফাটানো এবং মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ডেসিবল রক্ষা করতে হবে৷ রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে কোনো কিছুই ব্যবহার করা যাবে না৷ আইনভঙ্গ করলে জরিমানা তো হবেই, জেলও হতে পারে৷ এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, কলকাতা হাইকোর্ট বহুকাল আগে পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ ডেসিবল বেঁধে দিয়েছিল৷ ভারত সরকারের সর্বোচ্চ ডেসিবল থেকেও যা সামান্য কম৷

কে শোনে কার কথা
আইন আছে আইনের মতো৷ তিনদশক আগের আইন এখনো পর্যন্ত পালিত হয়েছে, এমন অভিযোগ নেই৷ আই আছে আইনের মতো৷ প্রতি বছর গ্রিন ট্রাইবুনালে বিষয়গুলি নিয়ে মামলা হয়৷ কিন্তু কাজের কাজ হয় না৷ কারণ, আইন মান্য করার মানসিকতাই গড়ে ওঠেনি সাধারণ ভারতীয়দের মধ্যে৷ ফলে আইনের ফাঁক গলে লাগাতার শব্দদূষণের উৎসব আগেও চলেছে, এখনো চলছে৷ প্রশাসন কার্যত নীরব দর্শক৷

কান তো গেছেই, ফুসফুসও
শব্দ দেখা যায় না, চাক্ষুস করা যায় না তার ক্ষতি, তাই এযাবৎ শব্দদূষণ নিয়ে পরোয়া করেনি আম ভারতীয়৷ সমস্যা হল, বাতাস দূষিত হলে তা দেখা যায়৷ ইদানীং সেই দূষণে প্রাণ ওষ্ঠাগত দিল্লিবাসীর৷ শীতের শুরুতে ধোঁয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে দিল্লির বায়ুমণ্ডল৷ যার জেরে স্কুল কলেজ ছুটি দিয়ে দিতে হচ্ছে৷ বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে যাচ্ছে৷ মাস্ক পরে ঘুরতে হচ্ছে সকলকে৷ তাই ঠেকে শিখে আইন মানতে হচ্ছে দিল্লিবাসীকে৷ সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে, দেওয়ালির সময় বাজি ফাটানো যাবে না৷ যদিও এর সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্পর্ক খুঁজে বার করে প্রতিবাদও করেছে কোনো কোনো গোষ্ঠী৷ রাজনৈতিক দলগুলিও কার্যত নিশ্চুপ থেকেছে৷ তবে ঠ্যাকায় পড়েই এবার দেওয়ালিতে আগের চেয়ে খানিক কম বাজি ফেটেছে দিল্লিতে৷ কলকাতাও খুব পিছিয়ে নেই৷ দিল্লির মতো অবস্থা না হলেও শীতের মুখে কলকাতাও ঢেকে যাচ্ছে ধোঁয়াশায়৷ পরিবেশকর্মীরা দাবি তুলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় কলকাতাতেও পালন করা হোক৷ কিন্তু কালীপুজোর সময় তার ছিটেফোটাও চোখে পড়েনি৷ পড়বে কী করে? সেখানকার মানুষদের যে এখনো দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না!

মূলত বায়ু দূষণ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় হলেও তার জেরে বাজির শব্দতাণ্ডব খানিক কমেছে রাজধানী এবং সংলগ্ন অঞ্চলে৷ কয়েকটি এনজিও সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে, গত পাঁচবছরের তুলনায় এবার দিওয়ালির সময় দিল্লির শব্দদূষণের পরিমাণ খানিকটা হলেও কমেছে৷ কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা নেহাতই কম৷ পরিবেশকর্মী এবং এনজিও গুলির বক্তব্য, কড়া আইনের অনুশাসনে না আনলে শব্দদৈত্যের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা যাবে না৷ ফলে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিক কেন্দ্র এবং রাজ্যসরকারগুলি৷ পশ্চিম যদি শব্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, পূব পারবে না কেন? এমনই স্লোগান তাদের৷

স্লোগান ফিকে হয়৷ পরিস্থিতির গোত্যন্তর হয় না৷ দূষণের ক্ষেত্রে ভারত প্রতিদিন তা প্রমাণ করে চলেছে৷

আপনার কোন মতামত থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন