লাল-সবুজ এক শাড়ির প্রতিক্ষা | আলাপ | DW | 12.12.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

লাল-সবুজ এক শাড়ির প্রতিক্ষা

দাওয়ায় বসে রাজু বালার স্বামী, সাথে তিন বছরের মেয়ে৷ উঠানের চুলায় ভাত ফুটছে৷ হঠাৎই শোনা গেল বুটের শব্দ৷ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ক’জন সেনা৷ এভাবেই ৩ লাখ নারীকে ধর্ষণ করে ওরা, লেখা হয় অন্ধকারের ইতিহাস৷

রাজু বালার কথা

স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে যেতেই রাজু বালার কোলের শিশুটিকে ছুড়ে ফেলে দিলো এক পাকসেনা৷ মাটিতে আছড়ে পড়া সেই শিশুকে বুট দিয়ে পিষে ফেললো একজন, যেমন পিষে ফেলে কেউ পোকামাকড়৷ এই দৃশ্য হতভম্ব হয়ে দেখতে দেখতে রাজু বালা টের পেলেন, কয়েকজন মিলে টেনে হিচড়ে তাঁকে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে৷ বাড়ির সামনেই জঙ্গল৷ সেখানে নিয়ে শুরু হলো পাশবিক অত্যাচার৷ ক'জন মিলে সেদিন তাঁকে ধর্ষণ করেছিল, সেটা রাজু বালাকে আর মনে করতে পারেন না৷ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি৷ তবে সেদিন গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ঘটনাটা দেখেছে যে, সে জানালো ১০ জনের বেশি ছিল তাদের সংখ্যা, সাথে রাজাকারও ছিল সেদিনের সেই পৈশাচিকতায়৷ পাকিস্তানিরা রাজু বালাকে ধর্ষণ করে বিভৎসভাবে৷ কামড়ে তাঁর শরীরের নানা অংশের মাংস তুলে নেয়া হয়৷ সেই দাগ ৪০ বছর পরও আছে রাজু বালার৷ সেই কষ্ট, সেই দুর্বিসহ যাতনা তাঁর কাছে আজও তেমনই তাজা৷ 

হামিদা বেগমের কথা

সে সময় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন হামিদা বেগম৷ মাগরিবের আযান যখন পড়ছে, রান্নাঘরে তখন চার পাকস্তানি সেনা! সাথে এক রাজাকার! স্বামীকে বাইরে গাছের সাথে বেঁধে রেখে তাঁর সামনেই চারজন মিলে ধর্ষম করে তাঁকে! পেটের যে সন্তান তার বয়স তখন সাত মাস৷ যে গর্ভ সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, সেই গর্ভকেই সবচেয়ে কষ্টের বানিয়েছিল পশুরা!! সাত মাসের ছোট্ট মানুষটিকে সেদিন জগতের নির্মমতার কথা বলতে পারেননি, কিন্তু শারীরিক সেই কষ্টের কথা মনে হলে আজও শিউরে উঠেন হামিদা৷ না, বাচ্চাটা মরেনি, বেঁচে ছিল৷ কিন্তু সেই ঘটনার পর স্বামীর পরিবার তাঁকে ত্যাজ্য করেছিল৷ ঘর হারা হামিদা বেগম হয়েছিল সমাজহারাও৷

হালিমার বিবির কথা

হামিদা বেগমের সন্তানটি তবুও তো বেঁচে ছিল৷ কিন্তু হালিমা বিবির সেই সৌভাগ্যও হয়নি৷ ধর্ষণের সময় তাঁর পেটের সন্তানের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ মাস৷ ধর্ষণের সেই প্রবল কষ্ট নিতে পারেনি তাঁর শরীর৷ শিশুটি মারা গিয়েছিল গর্ভেই৷ কিন্তু মৃত সেই সন্তানকে পেট থেকে বের করার সুযোগ ছিল না তখন৷ তাই বছরের পর বছর ঋতুস্রাবের সাথে বের হয়েছে সন্তানের টুকুরো টুকরো পঁচে যাওয়া অংশ৷

এমন আরো বহু ঘটেছিল, যার বিভৎসতা হার মানাবে যে কোনো গল্পকে৷ আড়াই থেকে ৩ লাখ নারীকে সে সময় ধর্ষণ করেছিল পাকিস্তানি পশুরা৷ বাবার সামনে, স্বামীর সামনে, এমনকি সন্তানের সামনে লাখো মা-বোনকে সইতে হয়েছে জীবনের সবচাইতে বড় কষ্ট আর অপমান৷ 

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ঘর হারা, আপনজন হারা, সমাজে অচ্ছুত এইসব মা-বোনের মাথায় হাত রাখলেন৷ বীরাঙ্গনা উপাধী দিয়ে বললেন, তিনিই তাঁদের পিতা৷ তিন বছরের জন্য তাঁদের খাওয়া, বাসস্থান আর লালন-পালনের দায়িত্ব নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু৷ এঁদের স্বাবলম্বী করতে চেয়েছিলেন তিনি৷ কিন্তু অভাগারা আবারো ছায়াহীন হলেন যখন ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিয়েছিল তাঁদের পিতা, জাতীর পিতার প্রাণ৷ এরপর কেউ আর তাঁদের খবর রাখেনি তেমন করে৷

অবশেষে বিজয়ের ৪০ বছর পর এইসব বীরাঙ্গনাকে জাতীর পিতার কন্যা স্বীকৃতি দিলেন৷ বলা হলো যে তাঁরা বীরাঙ্গনা নন, তাঁরাও মুক্তিযোদ্ধা৷ স্বীকৃত এইসব বীরাঙ্গনার কথা জানতে সপ্তাহখানেক ঘুরেছি তাঁদের সাথে, সিরাজগঞ্জে৷ ভয়াবহ সব কাহিনি৷ এখনও অনেকের শরীরে রয়েছে সেই বিভৎসতার দাগ৷ মনে আছে সেই ঘটনার ভয়াবহতা৷ চার যুগ পর এই স্বীকৃতিতে অবশ্য দারুণ খুশি তাঁরা৷ সারাজীবনের অপবাদ-অপমান-ধিক্কারের যেন শেষ হয়েছে৷ জীবনের শেষ প্রান্তে এমন এক আনন্দ, এমন এক স্বীকৃতি দিয়েছেন যিনি, সেই শেখের বেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখতে চান তাঁরা৷ হাত ছুয়ে বলতে চান কিছু, জানাতে চান তাঁদের কৃতজ্ঞতা৷

সেই বার্তা আর মনভর্তি অসীম কষ্ট নিয়ে তাঁদের পেছনে ফেলে আসতে হয়েছে আমাকে৷ তবে কথা দিয়েছি, আমার ক্ষুদ্র সমর্থের সবটুক দিয়ে চেষ্টা করবো যাতে তাঁরা একটিবারের জন্য হলেও দেখতে পান তাঁদের শেখের বেটিকে৷ ইতিমধ্যেই দু'বছর হয়ে গেছে সেই প্রতিজ্ঞার৷ আমার সামর্থের গণ্ডির ভেতরই মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর প্রেস উইং৷ সেই পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছি তাঁদের বার্তা৷ কিন্তু কবুতরের পায়ে বাঁধা বার্তার মতোই যেন তা হারিয়ে গেছে কোনো আকাশে৷ এখনও ডাক আসেনি প্রধানমন্ত্রীর৷ এখনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি তাঁদের শেষ ইচ্ছার কথা৷ ওদিকে এরই মধ্যে মারা গেছেন দু'জন৷ একটু স্বীকৃতি পেতে লেগেছে ৪০ বছর৷ শেষ ইচ্ছাটা পূরণ হতে কি তাহলে পার হয়ে যাবে গোটা জীবন?

নাজনীন মুন্নী

নাজনীন মুন্নী, সাংবাদিক, ৭১ টেলিভিশন

প্রতিদিন কত মানুষই তো প্রধানমন্ত্রীর দেখা পান৷ যাঁরা এই দেশ দিয়েছেন, তাঁদের কি তবে এটুকু অধিকারও নেই? তাঁরা চান শেখ হাসিনা তাঁদের একটিবার বুকে তুলে নিক আর আমি চাই বড় একটি সম্বর্ধনা করে তাঁদের আমাদের কৃতজ্ঞতার কথা জানাতে৷ নিজের সম্মান আর গোটা জীবন দেয়ার কৃতজ্ঞতা, আমাদের স্বাধীন দেশ দেয়ার কৃতজ্ঞতা৷ চাই লাল-সবুজ এক শাড়ি জড়িয়ে দিতে সেই সব শরীরে, যার বিনিময়ে এই পতাকা পেয়েছি আমরা৷ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চারিদিকের সুকঠিন দেয়াল ভেঙে তাঁদের সেই আকুতি কি কেউ পৌঁছে দেবে?কোনোদিন?

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন