‘লকড ডাউন’ শিক্ষার্থীর জবানবন্দি | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 07.11.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সমাজ সংস্কৃতি

‘লকড ডাউন’ শিক্ষার্থীর জবানবন্দি

প্রথমে কড়া আর তারপর লকডাউন ‘লাইট'৷ সমাজের নানা অংশের মতো নানা ভালোয় মন্দয় রয়েছেন ইউরোপে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীরাও৷

সেই ছোটবেলা থেকেই যখনই কোনো কাজ করতে কেউ বারণ করে, তখনই কেন জানি না আরো বেশি করে সেই কাজের প্রতি একটা আগ্রহ অনুভব করি৷ লকডাউনের ক্ষেত্রেও হলো তাই৷ বলা হলো, বাইরে বেরনো যাবে না, ইউরোপের রৌদ্রজ্জ্বল আবহাওয়া উপভোগ করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া যাবে না, মন চাইলেই টুক করে টিকিট কেটে বাড়ি যাওয়া যাবে না৷ কিন্তু যত বারণ শুনি, তত মনে হয় আহা, কতদিন বাড়ি যাই না, আহা কতদিন রাইনের পাড়ে বার্বিকিউ করিনা৷

অথচ এই বারণ করা আর মন বারণ মানতে না চাওয়ার দোটানায় শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছিল আইনের৷ লকডাউন, সে ‘লাইট' হোক বা কড়া, মানতে হয়েছেই আমার মতো আরো হাজারো শিক্ষার্থীদের৷ মাঝে লকডাউন ওঠার সুযোগ নিয়ে টুক করে দেশ ঘুরে এসেছি ঠিকই, তবে সেই সফর মোটেও ১০০ শতাংশ মসৃণ হয়নি৷ তবে সব শিক্ষার্থী বা গবেষকদের এক রকম অভিজ্ঞতা হয়নি৷ এক একজন শিক্ষার্থীর জন্য একেক রকমের বাস্তবতা নিয়ে এসেছে লকডাউন৷

শিক্ষার্থীদের জীবনের রকমফের

যেসব শিক্ষার্থীদের কাজ মূলত গবেষণাধর্মী, সে ল্যাবে হোক বা ফিল্ডওয়ার্কের মাধ্যমে, করোনার ঠেলায় এই দুই পক্ষই ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ ল্যাবে যেতে না পারা যেভাবে আমার বন্ধু অনিরুদ্ধের গবেষণা থমকে দিয়েছে, ঠিক একই ভাবে ভারতে যেতে না পারা থামিয়ে দিয়েছে আমার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ লিখার কাজ৷ কথা ছিল, আগস্ট মাসে দেশে গিয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের সাক্ষাৎকার নেব৷ তা হলো না৷ ফলস্বরূপ প্রায় এক বছর পিছিয়ে গেলো আমার গবেষণা৷ তবে লকডাউন সব গবেষণার জন্য সমান ছিল না৷

আমারই এক বন্ধু দীপ পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি গবেষক, শখের গিটারশিল্পী৷ তার কাছে লকডাউনের খারাপ দিক স্বাভাবিকভাবে ব্যান্ডের বন্ধুদের সাথে চুটিয়ে গানবাজনা না করতে পারা বা দল বেঁধে আড্ডা দিতে না পারা৷ তবে তার কাছে লকডাউন মানেই সব খারাপ নয়৷ দীপের মতো যারা ইনট্রোভার্ট বা একা থাকতে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তাদের অনেকের কাছেই লকডাউনে কোনো বাড়তি সামাজিক চাপ ছিল না৷ নিজের মতো করে গুছিয়ে একান্তে কাজ করতে পেরেছেন তারা৷

অবশ্য যেসব শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে ছোট বাচ্চা, রয়েছে, তাদের জন্য এই বাস্তবতা ছিল একদমই ভিন্ন৷ আমার আরেক বন্ধুর উদাহরণ দিই৷ সেই বন্ধুটির একটি তিন বছর বয়েসি কন্যাসন্তান রয়েছে৷ রয়েছে শিক্ষার্থী স্ত্রীও৷ স্বাভাবিক সময়ে, দুজনই নিজের ক্লাসে চলে যেতেন কন্যাকে ‘টাগেসমুটার' বা ডে-কেয়ারে রেখে৷ ফিরতি পথে কোনো পার্কে একসাথে সময় কাটিয়ে ঘরে ফেরা৷ করোনার প্রকোপ আমার বন্ধুর পরিবারের সবাইকে ঘরবন্দি করেছে৷ মা-বাবা দুজনেরই পড়াশোনা চলছে বাসা থেকেই৷ লকডাউন লাইটে যদিও বা শিশুদের জন্য উন্মুক্ত আছে উদ্যানগুলি, উল্টোদিকে কমানো হয়েছে ডে-কেয়ারে থাকার সময়সীমা৷ ফলে, বাবা-মাকে বেশি করে সময় দিতে হচ্ছে সন্তানকে, যা আদতে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও কমাচ্ছে মা-বাবার নিজস্ব কাজের সময়৷

শুধু তাই নয়, বিদেশি শিক্ষার্থীদের পরিবারে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে চট করে দেশে যাবার সুযোগও রাতারাতি বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ আমার বন্ধু অনিরুদ্ধের বাবা মারা যান প্রথম ধাপের লকডাউনের সময়৷ কোনো বিমান চলাচল না করায় বাবাকে শেষ দেখাও দেখতে পারেনি সে৷ কাছের মানুষদের সাথে শোক ভাগ করে নেবার বদলে তার সম্বল ছিল শুধুই ভিনদেশে এসে দানা বাঁধা প্রবাসী বন্ধুত্ব৷ সেই উষ্ণতা কি আর বাকি সব পুষিয়ে দিতে পারে?

তবে এবার জার্মানি লকডাউন লাইটে প্রবেশ করলেও বিশ্বের বেশ কিছু দেশের সাথে বিমানসংযোগ পুরোপুরি বন্ধ করেনি৷ জরুরি ভিত্তিতে ভারত বা বাংলাদেশে যাওয়া এখন সম্ভব৷ কিন্তু স্টুডেন্ট লোন নিয়ে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন এই ধরনের বিমানের টিকিট কাটবার সামর্থ্য রাখেন, তাও ভাববার বিষয়৷

প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থাকা না থাকা

করোনাকালীন সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে জার্মান সরকার বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা দিয়েছে৷ চুক্তিবদ্ধ গবেষকদের চাকরির মেয়াদ ছয় মাস থেকে এক বছর বাড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে৷ কিন্তু একই সাথে পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে ভবিষ্যতে পড়তে আসতে চাওয়া নতুন গবেষক বা শিক্ষার্থীদের৷ বা অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান শিক্ষার্থীদেরও৷ কারণ, সব সমস্যার সমাধান আর্থিক সহায়তা করতে পারে না৷

একটা উদাহরণ দিচ্ছি৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় বৃত্তিপ্রকল্প ‘ইরাসমাস মুন্ডুস'৷ এই প্রকল্পের আওতায় ইউরোপের বাইরে থেকে শয়ে শয়ে শিক্ষার্থী বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপে পড়তে আসেন৷ এই ধরনের প্রকল্পের উদ্দেশ্যই থাকে ইউরোপের একাধিক দেশ ঘুরিয়ে হাতে কলমে কাজ শেখানো৷ এমনই একটি প্রকল্পে পড়তে কলকাতা থেকে এসেছেন প্রৈতি৷ করোনা সংকটের মাঝামাঝি তিনি জানতে পারেন যে নতুন দেশে নতুন শিক্ষা পাওয়ার বদলে তার আগামী সেমেস্টারের গোটাটাই হবে অনলাইনে৷ পাশাপাশি, নতুন দেশে ভিসা পাওয়াও দুষ্কর৷ ফলে, দেশে ফিরে গিয়ে বাসা থেকে ‘ভার্চুয়াল' ক্লাসই তার সামনে একমাত্র পথ৷ কিন্তু এমন শিক্ষাই কি প্রৈতি চেয়েছিল? অনলাইনে পর্দার ওপারে থাকা কতগুলি চতুষ্কোণ আর পোল্যান্ডের ইতিহাসমাখা আকাশ-বাতাস থেকে জীবনের পাঠ নেওয়া কি আসলেই তুলনীয়?

ইউরোপে বাইরে থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এবারের শীত বড় বেশি হতাশার৷ বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসের নতুন সেমেস্টারে যোগ দিতে যারা নানা কাঠখড় পুড়িয়ে সফলভাবে ভিসা জোগাড় করে এসেছেন, তাদের জন্য এই শীতের দেশে উষ্ণতার জোগান এবার অনেকটাই কম৷ অন্যবারের মতো এবার নেই ক্রিসমাস মার্কেটে দল বেঁধে হইহই, নেই অক্টোবরফেস্টের হুল্লোড়৷ বন্ধুবান্ধবদের সাথে মিলে নতুন বছরে পদার্পণের উদযাপনও যে এবার আগের মতো হবে না, তা স্পষ্ট৷

ঠাণ্ডার দেশে, পরিচিত পরিসর থেকে দূরে একা ঘরবন্দি হয়ে থাকা বয়ে আনতে পারে নানা ধরনের অবসাদ৷ যেমনটা ইতিমধ্যেই বেশ কিছু শিক্ষার্থীর সাথে হচ্ছেও৷ পাশাপাশি, থাকতে পারে অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তাও৷ স্বল্পখরচে উন্নতমানের শিক্ষার জন্য বিখ্যাত ইউরোপের সামনে এখন তাই বড় চ্যালেঞ্জ দেশবিদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভালো রাখা৷ তাদের সুস্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারা, কারণ আমার মতো বেশিরভাগ শিক্ষার্থী-গবেষক কিন্তু শেষ পর্যন্ত এখানকারই ‘ট্যাক্সপেয়ার' বা করদাতা৷ মনে রাখতে হবে, যে পক্ষ লকডাউন ঘোষণা করে, সেই লকডাউনের ফলাফল সামলানোর দায়ও কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পক্ষেরই৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন