লকডাউনের সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিল? | বিশ্ব | DW | 01.04.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

লকডাউনের সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিল?

ভারতে তড়িঘড়ি করে লকডাউন ঘোষণা করার আগে ও পরে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন। সেই পদক্ষেপ গুলি নিলে লকডাউন অনেক বেশি কার্যকর হতো। প্রতিদিন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে প্রশ্ন ওঠা সঙ্গত।

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, করোনা রুখতে ভারতে লকডাউনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি ছিল। লকডাউন করে রোগীদের পরীক্ষা ও চিকিৎসা করেই একমাত্র করোনা রুখতে পেরেছে চীন। তাই ভারতও সেই পথ নিয়েছে। ১৩০ কোটির দেশে করোনা একবার ছড়িয়ে গেলে তখন তা সামাল দেওয়া যেত না। কারণ, সেই পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাকর্মী ভারতে নেই। মাথায় রাখতে হবে, করোনার ওষুধ বা প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কার হয়নি। অ্যামেরিকার মতো উন্নত দেশ প্রথমে করোনাকে সহজভাবে নিয়ে এখন হিমশিম খাচ্ছে এবং সেখানে এক থেকে দুই লাখ লোকের মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পশ্চিমের উন্নত দেশের হাল একই। সেখানে ভারত যদি লকডাউন না করতো, তা হলে সংক্রমণ অনেকটাই ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকতো। ভারতে এই রোগ বহন করে এনেছেন মূলত বিত্তবানরা, যাঁরা বিদেশে ঘুরতে গিয়ে এই রোগ নিয়ে ফিরেছেন। অথবা বিদেশিরা, যাঁরা এই রোগ নিয়ে ভারতে ঢুকেছেন। তাই লকডউন করে গোষ্ঠী সংক্রমণ রোধ করে করোনার মোকাবিলা করতে চেয়েছে ভারত এবং তাতে কোনও ভুল নেই।

ভুল যদি থেকে থাকে, তা হল লকডাউনের প্রক্রিয়ায়। অগ্রপশ্চাত না ভেবে হঠাতই একদিন ঘুম থেকে উঠে লকডাউন ঘোষণা করে দেওয়া প্রশ্নের অবকাশ রাখে। সরকারের গাফিলতি বলুন, অদূরদর্শিতা বলুন, ঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নেওয়ার উদাহরণ বলুন, সেটা হয়েছে ফেব্রুয়ারিতেই। অন্য দেশ থেকে যে সব বিদেশি ও স্বদেশি দেশে ঢুকেছেন, তাঁদের যদি সেই সময় থেকেই ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হতো, তা হলে এতদিনে হয়তো করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। অন্তত ১ মার্চ থেকে এই ব্যবস্থা নিলেও এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।  চীনে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই করোনার প্রকোপ শুরু হয়েছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে তা রীতিমতো বড় আকার নিয়েছে। ৩০ জানুয়ারি ভারতে প্রথম একজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। চীনের মতো দেশ করোনা সামলাতে কী রকম নাজেহাল হচ্ছে, উহান লকডাউন করে দিতে হচ্ছে, মাস্ক, স্যানিটাইজার উধাও হয়ে যাচ্ছে, চিকিৎসকরা আক্রান্ত হচ্ছেন, পরিকাঠামোর অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে-- সে সবই ততদিনে জানা হয়ে গিয়েছে। এটাও বোঝা গিয়েছে, করোনা চীনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গোটা বিশ্বে ছড়াবে।

নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে একটা খুবই চালু কথা আছে-- তিনি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করেন এবং সেই মতো সব ব্যবস্থার কথা আগে থেকে ভেবে রাখেন। রাজনীতির মতো প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই নীতি নিয়ে চলেন মোদী। রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি বরাবর এর সুফল পেয়েছেন। সেই মোদীর কাছে প্রত্যাশিত ছিল, চীনের করোনা পরিস্থিতি দেখে এবং সেই রোগ বিশ্বের অন্যত্র ছড়াচ্ছে দেখে তিনি দ্রুত স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী ব্যবস্থা নেবেন। সেই ধরনের ব্যবস্থা অন্তত করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। বরং এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা অবাক করার মতো।

আরও একবার আইসোলেশনের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। উহান থেকে ভারতীয় ছাত্রদের যে ভাবে মানেসর ও ছাওলাতে সেনা ও ইন্দো টিবেটান বর্ডার ফোর্সের ছাউনিতে রাখা হয়েছিল, সেভাবেই বিদেশ থেকে আসা নাগরিকদের ১৪ দিন আলাদা করে রাখা যেত। অথবা অন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যেত। অন্ততপক্ষে হাতে ছাপ দিয়ে তাঁদের নিজেদের বাড়িতেই কোয়ারান্টিনে রাখা যেত এবং তাঁদের প্রত্যেকের করোনা পরীক্ষা করা উচিত ছিল। এই কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদী তো সবসময়ই চ্যালেঞ্জ নিতে, বড় আকারে সব কাজ করতে পছন্দ করেন। তিনি কেন এটা করলেন না?

বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্রিনিং এর ব্যবস্থা ছিল। সেটা জ্বর মাপার জন্য। লোকেদের অভিজ্ঞতা বলছে, সবাইকে ওই স্ক্রিনিং এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি। এমনও অভিযোগ উঠছে, নামার আগে অনেক যাত্রী প্যারাসিটামল খেয়ে নিয়েছিলেন, যাতে পরীক্ষা করেও জ্বর পাওয়া না যায়। আর বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারান্টিনে পাঠানো হয়নি বলে গায়িকা কণিকা কাপুরের মতো অনেকেই পার্টি করেছেন, অনুষ্ঠান করেছেন, লোকের সঙ্গে ঢালাও দেখা করেছেন। কলকাতায় যুগ্ম সচিব পর্যায়ের অফিসারের ছেলে হাসপাতালে না গিয়ে সারাদিন শপিং মলে ঘুরেছেন। এ রকম দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকেরা কতজনের মধ্যে করোনা ছড়িয়েছেন কে জানে?

বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টাইন করা হয়নি বলে নিজামুদ্দিনের তাবলিগ-ই-জামাতের অনুষ্ঠানে ইন্দোনেশিয়া সহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা আসতে পেরেছিলেন। তাঁরাই ছিলেন সেখানে করোনার বাহক। তারপর সেখান থেকে এমনভাবে করোনা ছড়াচ্ছ যে, গোষ্ঠী সংক্রমণের আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। তাবলিগের কথায় আসার আগে মার্চের গোড়ার ছবিটা দেখে নেওয়া যাক। করোনা ছড়াতে শুরু করেছে। কিন্তু বিদেশ থেকে বিমান যথারীতি আসছে। সে সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বলা সত্ত্বেও বিমান বন্ধ করা হয়নি। এরই মধ্যে ২ মার্চ থেকে ভারতে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। লকডাউন ঘোষণার আগের দিন পর্যন্ত তা চলেছে। মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের দলছুট বিধায়কদের পদত্যাগ করিয়ে সেখানে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা রূপায়ণ হয়েছে এরই মধ্যে। অর্থাৎ, এমন একটা ভাব দেখানো হয়েছে, যেন করোনা হচ্ছে তো কী হয়েছে, আমরা ঠিক থাকব। সামাজিক মাধ্যমে কেউ করোনা রুখতে গোবরস্নানের ভিডিও আপলোড করেছেন, কোনও বিজেপি বিধায়ক গোমূত্র পানের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের নিন্দা বা সতর্ক পর্যন্ত করা হয়নি। দিল্লিতে রীতিমতো গোমূত্রের পার্টি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতা ও বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান যখন প্রশ্ন তোলেন, মধ্যপ্রদেশে করোনার প্রকোপ কেটে যাওয়ার পর সরকার ফেললে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো? তখন তাঁকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় কি?

তার মানে করোনাকে খুবই হাল্কাভাবে নেওয়া হয়েছিল। যখন সম্বিত ফিরলো, তখন দেরি হয়ে গিয়েছে। তখন প্রথমে জনতা কার্ফু ঘোষণা করা হল। তার একদিন পরে লকডাউন। কোনও আগাম ইঙ্গিত ছাড়াই, রাজ্য গুলির সঙ্গে আগাম আলোচনা ছাড়াই রাতারাতি সব বন্ধ। বন্ধ করে দেওয়া হল রেল যোগাযোগ, বাস, দোকানপাট। আবার বলছি, লকডাউন না করে কোনও উপায় ছিল না। লকডাউন হয়েছে বলে করোনা ছড়ানোর হার এখনও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। না হলে, এতদিনে ভয়ঙ্কর অবস্থায় পৌঁছে যেত ভারত। কিন্তু লকডাউনের আগে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া হয়নি। আর আচমকা লকডাউন ঘোষণা করার ফলে পরিযায়ী শ্রমিক ও গরিবরা ভয়ঙ্কর কষ্টের মধ্যে পড়েছেন। হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সে সবই এড়ানো সম্ভব ছিল। সরকার এখন ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এনেছে, কিন্তু আগে থেকে ভেবে করলে সাধারণ মানুষের অযথা হয়রানি এড়ানো যেত।

Goutam Hore

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে

তৃমমূলের সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় রাজ্যসভায় প্রথম করোনার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তাঁর মতে, ''জনতা কার্ফুর মধ্যে থালা-বাসন বাজাতে বলে মোদী বিষয়টাকে লঘু করে দিয়েছেন। আর তাঁর মন্ত্রীরা কেউ ট্র্যাক স্যুট পরে রামায়ণ দেখছেন, কেউ লুডো খেলছেন, কেউ বাগান করছেন এবং সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন। তাঁরা করোনার ভীতিকে সমানে লঘু করে দেখাচ্ছেন। কোথায় তাঁরা গরিবদের কাছে খাবার পৌঁছবার চেষ্টা করবেন, তা নয়, উল্টে বাড়িতে বসে অবসর বিনোদনের ছবি দিচ্ছেন। মনে রাখা দরকার, বিদেশের বিমান বন্ধ করার আগে ১৬ লাখ লোক ভারতে এসেছেন।''

করোনাার বিপদকে লঘু করে দেখার চরম উদাহরণ হল তাবলিগের জমায়েত। বিশ্বে কী চলছে, করোনা কীভাবে ভয়াবহ হয়ে উঠছে তা ততদিনে পরিষ্কার। তারপরেও তাঁরা জমায়েত করেছেন, ভারতের বাইরে থেকে লোকে এসেছেন। দিল্লি সরকার ৫০ জনের বেশি ধর্মীয় জমায়েত নিষিদ্ধ করার পরেও তাঁরা সে কথায় কান দেননি। মারকাজ খালি করার নির্দেশও লঘুভাবে নিয়েছেন। ফলে তাঁরা দেশের লাখ লাখ লোককে বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছেন। যে দিন লকডাউনের ঘোষণা হল, তারপরেও অযোধ্যা গিয়ে পুজো দিতে দেখা গিয়েছে যোগী আদিত্যনাথকে। সঙ্গে তাঁর পারিষদেরা। করোনা প্রকোপের পরেও তাঁদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছিলেন শাহিনবাগের বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের জোর করে তুলে দিতে হয়েছে। গোমূত্রের পার্টিতে জড়ো হয়েছিলেন ২০০ ভক্ত। সেটিও দিল্লি সরকারের নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে ্নুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সব আচরণই বুঝিয়ে দিচ্ছে, হয় তাঁরা করোনার স্বরূপ বুঝতে পারেননি, অথবা, তাঁরা সব জেনেও বেপরোয়া। লকডাউনের সময়েও দেশের অনেক জায়গায় লোকের মধ্যে এই বেপরোয়া আচরণ দেখা যাচ্ছে।

তাই লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে না।  প্রশ্ন উঠতে পারে তার আগে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত না নেওয়া নিয়ে। প্রশ্ন উঠতে পারে কিছু লোক ও সংগঠনের বেপরোয়া আচরণ নিয়ে।

নির্বাচিত প্রতিবেদন