রোহিঙ্গা শিবিরে বারবার আগুন, ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটুকু? | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 14.01.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা শিবিরে বারবার আগুন, ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটুকু?

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বারবার আগুন লাগার ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি বাড়ছে৷ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা পরিবারগুলো৷

ভিডিও দেখুন 03:17

আগুনে পুড়লো সর্বস্ব, দিশেহারা কয়েক হাজার রোহিঙ্গা

রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, শিবিরে বারবার অসাবধানতায় আগুন লাগছে৷ তবে এর পেছনে কোনো নাশকতামূলক তৎপরতা রয়েছে কিনা, সে প্রশ্নও এখন সাধারণ রোহিঙ্গাদের মুখে মুখে৷

প্রতিবছর শিবিরগুলোতে ৬০-৫০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও মাইকিং আর মহড়া ছাড়া সংশ্লিষ্টদের খুব বেশি জোড়ালো ভূমিকা চোখে পড়ে না৷ শিবিরে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নেভানোর তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই৷ এছাড়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনগুলোও আলোর মুখ দেখে না৷

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ৬৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে৷ ২০২০ সালে ঘটেছিল ৮২টি৷ যদিও রোহিঙ্গাদের হিসেবে এই সংখ্যা আরো বেশি৷

চলতি বছর ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত ছোট-বড় তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে৷ এর মধ্য সবশেষ ৯ জানুয়ারি উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের শফিউল্লাহ কাটা রোহিঙ্গা শিবিরের প্রায় ৬০০ ঘর পুড়ে গেছে৷ কিন্তু টেকনাফের চেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে উখিয়ার শরণার্থী শিবিরে৷

জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উখিয়া স্টেশনের কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক জানান, ‘‘গেল বছরে উখিয়া শরণার্থী শিবিরে অর্ধশতাধিকের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে৷ মূলত রোহিঙ্গাদের অসাবধানতার কারণে ক্যাম্পে শীত মৌসুমে এ ধরনের ঘটনা ঘটে৷ তাদের গ্যাস সিলিন্ডার ও অসর্তকতার কারণে সামনে এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটার আশঙ্কা রয়েছে৷ এ বছরে এখানে দুইটি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে৷ তবুও আমরা সবাইকে আরো বেশি সর্তক থাকতে বলেছি৷''    

এদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের টেকনাফ স্টেশনের কর্মকর্তা মুকুল কুমার নাথ জানান, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো ঘনবসতিপূর্ণ৷ সেখানে ঝুপড়ি ঘর আছে৷ দুর্গম পাহাড়ে অবস্থানের কারণে আগুন লাগলে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় না৷ বেশিরভাগ ক্যাম্পে রাস্তার কারণে ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে৷ আবার পানির উৎসের সংকটও বেশি হওয়ার ফলে আগুন লাগলে শিবিরগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি হয় বলে জানান তিনি৷


কিছু অগ্নিকাণ্ড ‘পরিকল্পিত'

গত বছরের ২২ মার্চ উখিয়ার বালুখালীর একটি শিবিরে আগুন লেগে শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল৷ আশ্রয় হারিয়েছিলেন প্রায় ৪৫ হাজার শরণার্থী৷ যদিও সেই সময় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর নিহতের সংখ্যা ১৫ জন বলে উল্লেখ করেছিল৷

রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যাণ্ড হিউম্যান রাইটসের নেতা সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘‘রোহিঙ্গা শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের কিছু ঘটনা রহস্যজনক মনে হয়৷ এর পেছনে কোনো চক্রের হাত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘নাশকতামূলক অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ বের করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা না গেলে সবসময়ই এখানকার মানুষের মাঝে আগুন লাগার ভয়ভীতি থাকবে৷ তাই এ ধরনের ঘটনা রোধে পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার৷ গত বছর রোহিঙ্গারা ব্লকে ব্লকে পাহারা বসিয়েছিল৷''

অনেকদিন ধরে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় কাজের অভিজ্ঞতা থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের এক কর্মকর্তা জানান, ‘‘আগের তুলনায় শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কমেছে৷ তবে এটা সত্য যে অগ্নিকাণ্ডের কিছু ঘটনা অস্বাভাবিক মনে হয়৷ শিবিরে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে মনে হয় কিছু ঘটনা ‘পরিকল্পিত'৷ আবার কিছু ঘটনা অসাবধানতার কারণে ঘটছে৷ এছাড়া শিবিরে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্য দ্বন্দ্ব রয়েছে৷ তাদের কারণে এ ধরনের ঘটনা উৎপতির সুযোগও রয়েছে৷ বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মানুষের মাঝে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে৷ সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আগুনের কারণ চিহ্নিত করার ‘প্রযুক্তি' আমাদের আদৌ কি আছে?''

এ বিষয়ে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) সামছু-দৌজা নয়ন বলেন, ‘‘আগুনের কারণ চিহ্নিত করার প্রযুক্তি আছে কিনা সেটি আমার জানা নেই৷ তবে শরণার্থী শিবিরগুলোতে অগ্নিকাণ্ড রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে৷ সম্প্রতি শফিউল্লাহ কাটা শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমরা একটি প্রতিবেদন দিব৷ কিন্তু তার বিষয়ে এখন কিছু বলতে চাই না৷''

তিনি বলেন, ‘‘আগুনে পোড়া শিবিরগুলোতে নতুন ঘর তৈরির ক্ষেত্রে ঘরগুলো ফাঁকা ফাঁকা করে তৈরি করার পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপক সামগ্রী রাখা এবং ফায়ারের কর্মীরা যাতে সহজে ঢুকতে পারে সেই ব্যবস্থা রাখা হবে৷ পাশাপাশি কিছু রাস্তার মোড় চওড়া করছি, যাতে ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়িগুলোও ঢুকতে পারে৷''

উখিয়ার শফিউল্লাহ কাটা শিবিরে আগুনের ঘটনায় রোহিঙ্গা নেতা ও সিপিপি কর্মী মো. মিয়ার ঘর আগুনে পুড়ে যায়৷ তিনি জানান, ‘‘ওই দিন বিকেলে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দ্রুত এগিয়ে এসে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রগুলো নিয়ে আগুন নেভাতে গেলে দেখা যায় সেই যন্ত্র কাজ করছিল না বরং এ যন্ত্রগুলো থেকে পানি বের হচ্ছিল৷ তাছাড়া এমন জায়গায় আগুন ধরেছে যা ছিল খুব ঘিঞ্জি ছিল, ফলে সেখানে পৌঁছানো খুব মুশকিল ছিল৷''

বারবার কেন ক্যাম্পে আগুন লাগে এমন প্রশ্নের জবাবে এই রোহিঙ্গা নেতা বলেন, ‘‘রোহিঙ্গারা অনেকে গ্যাসের চুলা ব্যবহার করতে জানে না৷ আর যারা জানেন তাদের অধিকাংশই অসর্তকতায় রান্নার কাজ করে থাকেন৷ আবার দেখা যায় অনেকে অভাবের কারণে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করে কাঠের লাকরি ব্যবহার করে৷ এসব কারণে শিবিরে  অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে৷ বিশেষ করে শিবিরগুলো ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে৷ ফলে শিবিরে ফায়ার সার্ভিস মজুদ রাখা দরকার৷ তা যদি সম্ভব না হয় সরকারের উচিত আগুন প্রতিরোধে শিবিরের ঘরগুলো পরিকল্পিভাবে (ফাঁকা) গড়ে তুলা৷ পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড ঘটলে যাতে দ্রুত সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌছতে পারে, সেই ব্যবস্থা রাখা দরকার৷''



সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিযোগ

গত বছরের ২২ মার্চ উখিয়ার বালুখালী-৮ ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডে ১০ হাজার ১৬৫টি বসতি পুড়ে যায়৷ ১১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন৷ ঐ ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছিল৷ এতে ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি ও জানমাল রক্ষায় ১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছিল৷ কিন্তু সেগুলো বাস্তাবায়িত হয়নি বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা নেতারা৷  

জানতে চাইলে কক্সবাজারের শিবিরে রোহিঙ্গা ইয়ুথ এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা কিন মং জানান, ‘‘শিবিরে কেন বারবার আগুন লাগে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে রোহিঙ্গার মাঝে৷ ক্ষতিগ্রস্তরা অনেক সময় আগুন লাগার পেছনে রহস্য লুকিয়ে থাকার অভিযোগ আনলেও সেই রহস্যের জট খুলে না কখনও৷ এমনকি তাদের অভিযোগ আমলে নেয়ার কোনও নজির নেই৷ তাছাড়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনগুলো কি আলোর মুখ দেখে?''

তিনি বলেন, ‘‘শিবিরে ঘনবসতি হওয়ার কারণে দ্রুত চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে৷ এর জন্য ঘরগুলো ফাঁকা করে নির্মাণ করা উচিত৷ তাছাড়া শিবিরে তাৎক্ষণিক আগুন নেভানোর অগ্নিনির্বাপন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রসহ পানি ব্যবস্থার বারবার বলে আসলেও সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি৷''  

এ বিষয়ে অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশ্লেষক আসিফ মুনীরের মতে, ‘‘বছরের শুরুতে আগুন লাগার ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত নয়, এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়৷ কারণ এর আগে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর জন্য একটি সংগঠিত চক্রের কাজ করার অভিযোগ উঠেছিল৷''

তিনি বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক সংস্থা, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় ছাড়া এসব আগুনের প্রকৃত কারণ বের করা সম্ভব হবে না৷ সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে কোন অগ্নিকাণ্ডটি দুর্ঘটনা, আর কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা বের করা দরকার৷ অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা ঠেকানো যাবে না৷''

সংশ্লিষ্ট বিষয়