রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: সম্ভাবনা নাকি সম্ভব না? | আলাপ | DW | 18.12.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: সম্ভাবনা নাকি সম্ভব না?

গত ৪০ বছর ধরে নাফ পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আছড়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা৷ ‘আশ্রয় নিচ্ছে' না লিখে ‘আছড়ে পড়ছে' লিখতে হচ্ছে কারণ, রোহিঙ্গারা অভিবাসিত হতে আসেনি বাংলাদেশে৷ তাদের স্বেচ্ছায় নিজ দেশ ছেড়ে আসার প্রশ্নই আসে না৷

প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে চলমান নিষ্ঠুর নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও গণহত্যার শিকার হয়ে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে রোহিঙ্গারা৷ তাদের জাতিগত পরিচয় তো বিপন্ন হয়েছেই, কেড়ে নেওয়া হয়েছে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার৷ সম্পদ, সম্ভ্রম সব হারিয়ে শুধু প্রাণটুকু নিয়ে ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশে এসেছে তারা; দলে দলে, বানের পানির মতো৷

রোহিঙ্গাদের এই স্রোত বিপরীতে বইবে, অর্থাৎ তাদের ঢেউ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারমুখী হবে, বাংলাদেশ সরকারের এমন আশায় ভরসা পাওয়া যাচ্ছে না৷ বরং ‘নব্য অক্ষশক্তি' চীন, রাশিয়া ও ভারত স্বার্থ হাসিলের নীতি নিয়ে যেভাবে বর্বর বার্মিজ সেনাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, তাতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী যাত্রাপথ হয়ত একমুখী হতে যাচ্ছে৷ যে পথে শুধু আসা যায়, ফেরার উপায় থাকে না৷

এরই মধ্যে গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা-স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বন্ধ হয়নি বাংলাদেশ-অভিমুখী রোহিঙ্গা স্রোত৷ বাংলাদেশের অনুরোধে জাতিসংঘ গত ৫ ডিসেম্বর ‘মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি' শীর্ষক যে বিশেষ অধিবেশন ডেকেছিল, সেখানে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রাদ আল-হুসেইন ২৬ নভেম্বরের পরও ১ হাজার ৬২২ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, এমন তথ্য জানিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন৷ যখন রোহিঙ্গাদের রাখাইনে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমারের উদ্যোগী হওয়ার কথা, তখনও সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায়টির লোকজন তেলের খালি কন্টেইনার ভাসিয়ে সেটা ধরে সাঁতরিয়ে, বাঁশ দিয়ে বানানো ভেলায় নাফ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছে৷ নদী যেখানে সাগরের সঙ্গে মিলেছে, কতটা অসহায় হলে মানুষ সেখানে ভেলা ভাসায়, সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার দুঃসাহস করে?

কেন রোহিঙ্গা নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে আসছে, তা জানতে গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে দু'দফায় টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছি৷ তাদের কাছ থেকে শুনেছি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের নামে পরিচালিত গণহত্যার মর্মান্তিক বিবরণ৷ ৬ সেপ্টেম্বর ভোরে টেকনাফ বাস স্ট্যান্ডে নেমে হতচকিত হয়ে পড়ি৷ পরে টেকনাফ রোডের ৩০ কিলোমিটারের মতো পথ ঘুরে দেখার সময় বারবার মনে পড়ছিল অ্যালেন গিন্সবার্গের অমর কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড'৷ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যশোর রোড ঘুরে গিয়ে কবিতায় বাংলার শত শত মানুষের কলকাতার দিকে ছুটে যাওয়ার মর্মস্পর্শী বিবরণ দিয়েছিলেন গিন্সবার্গ৷ এতকাল শরণার্থী জীবনের সেই সব গল্প ছিল শুধুই অন্যের কাছ থেকে শোনা, বইপত্র পড়ে জানা৷ হাল-আমলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে যাওয়া শরণার্থীদের কিছু ছবিও দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে৷ কিন্তু টেকনাফ রোডে গিয়ে সেদিন মনে হয়েছিল, হালের সেই সব ঘটনা ছাড়িয়ে গেছে মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয়ের খোঁজে আসা রোহিঙ্গাদের সমস্যা৷ নিজ দেশের মানুষকে উচ্ছেদ করার যাবতীয় নৃশংসতার উদাহরণ মিয়ানমারে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে৷ সেপ্টেম্বরে সপ্তাহ দুয়েক এবং অক্টোবরে সপ্তাহখানেক কাটানোর সুযোগ হয়েছিল টেকনাফ ও উখিয়ায়৷ উদ্বাস্তু নরনারীর কাছে বার্মিজ সেনাদের পোড়ামাটি নীতির বহু ঘটনা শুনেছি৷

মিয়ানমার পুলিশের ২৪টি তল্লাশি-চৌকি ও একটি সেনাঘাঁটিতে হামলার যে ঘটনাকে সেনা অভিযান শুরু করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি সাজানো নাটক কিনা এ নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন আমাদের কাছে৷ পুলিশের তল্লাশি-চৌকি ও সেনাঘাঁটিতে হামলার দায়ে অভিযুক্ত আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এমনটা ঘটিয়েছে কিনা, এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন৷

আরসার প্রতি সহানুভূতিশীল রোহিঙ্গাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল আমার৷ ওই রোহিঙ্গাদেরও প্রশ্ন, যদি আরসা এ হামলা করে থাকে, তাহলে আরসার কার্যক্রম পরিচালনায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কোনো ভূমিকা আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে হবে৷ তারা যুক্তি দিয়েছিল, আরসা যদি রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে, তাহলে কী করে এমন কিছু করল যা রোহিঙ্গাদের এত ব্যাপক হারে বাস্তুচ্যুত করার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? তাছাড়া কাণ্ডটি এমন এক সময়ে ঘটানো হয়েছে, যখন কোফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে৷ তাই ওই রোহিঙ্গাদের সন্দেহ, আরসার ভেতরে হয়ত কলকাঠি নাড়ার ক্ষমতা রাখে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী৷ রোহিঙ্গাদের এমন সন্দেহের একটি ভিত্তি আমি পেয়েছি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে৷ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধ ও সংঘর্ষ নিরসন এবং প্রতিরোধে কার্যকর আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদন থেকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও আরসার মধ্যে ঘুস লেনদেনের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের ছেড়ে দেওয়ার খবর জানা যায়, যা আরসার সঙ্গে মিয়ানমারের নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়৷ মিয়ানমারের জাতীয় সংসদে ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর৷ গণতন্ত্র এলেও কার্যত স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগ পরিচালনা করে সেনাবাহিনী৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে গত মাসে মিয়ানমারের সঙ্গে ‘সম্মতিপত্রে' সই করেছে বাংলাদেশ৷ এই সম্মতিপত্র অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সরকারকে কতখানি কার্যকর ভূমিকা সেনাবাহিনী রাখতে দেবে, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে৷ যদিও বাংলাদেশ সরকার বলছে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে শিগগির৷ চলতি মাসেই দু'দেশ মিলে ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ' গঠন করবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর বক্তব্যে জানাতে পেরেছি৷ তবে সরকার যতই বলুক, রোহিঙ্গাদের নিজভূমে নিরাপদে ফেরত পাঠানোর যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবতা বলছে শিগগিরই তা সম্ভব না৷ বরং সম্মতিপত্র স্বাক্ষর করার পর বাংলাদেশ আদৌ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে চায় কিনা এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে৷ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘মিয়ানমারের ইচ্ছেতেই ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুসরণ করে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করা হয়েছে৷'' অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রীই বলেছিলেন, ‘‘১৯৯২ সালের মতো চুক্তি বা সমঝোতা করা যাবে না৷'' এ কথাও বলেছিলেন, ‘‘১৯৯২ সালের প্রেক্ষাপট আর ২০১৭ সালের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা৷''

বাংলাদেশ তার নিজের অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে এসে মিয়ানমারের সঙ্গে ১৯৯২ সালের চুক্তির আলোকে যে সমঝোতা করেছে, সেটা অনুযায়ী ‘যাচাই বাছাই' করে দেখা হবে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক কিনা৷ যাচাই-বাছাই করবে মিয়ানমার-বাংলাদেশ, যৌথভাবে৷ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিলে সিদ্ধান্ত নেবে এককভাবে মিয়ানমার৷ আমরা জানি বাংলাদেশে এবার আসা রোহিঙ্গাদের মাত্র ১৪ হাজারের মতো মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দাবি করার মতো কাগজপত্র দেখাতে পারবে৷ যেসব রোহিঙ্গা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারবে না, অর্থাৎ তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেবে মিয়ানমার৷

১৯৯২ সালের এপ্রিলের ২৩ তারিখ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয় এবং আলোচনা শেষে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ একটি যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে ১৯৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২০০৫ সালের মিয়ানমার আর ২০১৭ সালের মিয়ানমারের মধ্যে বিস্তর ফারাক৷ এরই মধ্যে সুকৌশলে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের আরও প্রান্তিক করে ফেলা হয়েছে৷ রোহিঙ্গারা যে নিজেদের মিয়ানমারের স্থায়ী বা অস্থায়ী বাসিন্দা বলে প্রমাণ করবে, তার কাগজপত্র রীতিমতো গায়েব করে ফেলা হয়েছে৷ ১৯৮২ সালের মিয়ানমার নাগরিকত্ব আইন দিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়৷ তারপরই ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা হয়, যেখানে রোহিঙ্গাদের রাখাইনের অধিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ অথচ ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের যে সমঝোতা হয়েছিল, সে অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ ফলে মিয়ানমার অনেক হিসাব-নিকাশ করেই ১৯৭৮ সালের ফর্মুলা না এনে, ১৯৯২ সালের ফর্মুলার কথা বলছে৷ যদি ১৯৯২ সালের ফর্মুলা দিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের একটা কাঠামো দাঁড় করানো হয়, তাহলে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে৷

২০১৪ সালে মিয়ানমারে পুনরায় নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল৷ সে প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে যাদের অস্থায়ী অধিবাসী হিসেবে কার্ড ছিল, তাদের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়৷ তবে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে, তারা আদমশুমারিতে নিজেদের ‘বাঙালি' বলে তালিকাভুক্ত করবে৷ তখন এই শর্তে মাত্র চার হাজার রোহিঙ্গা তালিকাভুক্ত হতে রাজি হয়েছিল৷ পরে ২০১৫ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে রোহিঙ্গাদের কাছে যে অস্থায়ী অধিবাসী কার্ড ছিল, সেটাও বাতিল করে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়৷ মিয়ানমারের নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী নেত্রী সু চি ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালের জুন মাসে আবারও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়৷ কিন্তু এবারও রোহিঙ্গাদের মাত্র ১০ হাজার বাঙালি পরিচয়ে নাগরিকত্ব প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বীকৃতি পায়৷ আগের চার হাজার ও পরের ১০ হাজার মিলিয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারার মতো রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ হাজার৷

সর্বশেষ সমঝোতা অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের যারা স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চাইবে, তাদেরকেই ফেরত পাঠানো যাবে৷ বাংলাদেশ কাউকে জোর করে ফেরত পাঠাতে পারবে না৷ রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি ফসলের ক্ষেত পর্যন্ত জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে৷ টেকনাফ ও উখিয়া আশ্রিত শত শত রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলার সময় আমরা এমন পরিবার খুবই কম পেয়েছি, যে পরিবারের একজনও মিয়ানমার সেনাদের হাতে নিহত হয়নি৷ ধর্ষণের শিকার হয়েছে বহু রোহিঙ্গা নারী৷ রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, বসত ভিটায় অগ্নিসংযোগ, উচ্ছেদের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়েছে যে বার্মিজ সেনারা, ফিরে গেলে তাদের খপ্পরেই পড়তে হবে; এটা জেনেও কি রোহিঙ্গাদের কেউ ফিরে যেতে চাইবে?

ভিডিও দেখুন 01:21
এখন লাইভ
01:21 মিনিট

রোহিঙ্গারা ফিরতে চান, তবে...

পরাশক্তির লাই পেয়ে বেপরোয়া হয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী৷ গত ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষার প্রস্তাবে চীন বাধার প্রাচীর তুলে দাঁড়ায়৷ সৌদি আরবের প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হতে দেয়নি চীন৷ এর আগেও চীন জাতিসংঘে মিয়ানমারের পক্ষে ভেটো দিয়েছে, ভোট দিয়েছে৷ মিয়ানমারের পক্ষ হয়ে বাংলাদেশকে চাপ দিয়ে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করিয়েছে৷ চীনের বিরাগভাজন হতে চায়নি বাংলাদেশের সরকার, ফলে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাবে কি যাবে না, তা খুব একটা বিবেচনা করেছে বলে মনে হয় না৷ শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গাদের সবাইকেই ফেরত পাঠানো যাবে, এমনটা যে খোদ সরকারের নীতিনির্ধারকরাও মনে করছেন না, তা এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসান চরে আশ্রয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের মধ্য দিয়েও ধারণা করা যায়৷ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী৷ পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নের এ প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে৷

চীনের চাপে বাংলাদেশ সম্মতিপত্র স্বাক্ষর করেছে৷ চীনের হৃদ্যতা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে৷ সেনাপ্রধানকে ডেকে নিয়ে রাজকীয় সম্মাননা দেওয়ার ঘটনা এবং বাংলাদেশকে চাপ দিয়ে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার মধ্য চীন যে আসলে মিয়ানমারের স্বার্থ রক্ষা করেছে, তা বোঝার জন্য খুব বেশি কূটনীতি জানার দরকার হয় না৷ চীন যে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দিয়ে মিয়ানমারে পুনর্বাসনে সমর্থন করবে না, তা বুঝতেও ‘নস্ট্রাডুমাস' হওয়ার প্রয়োজন নেই৷ দরকার নেই দিব্যজ্ঞানেরও৷ দুইয়ে দুইয়ে চারের মতো সরল হিসাব এটি৷ একই কাতারে বন্দি হয়েছে চীনের শত্রু ও বাংলাদেশের মিত্র ভারত৷ আছে রাশিয়াও৷ রোহিঙ্গাদের সম্পদের লোভ কী জাদু! রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রতিবাদে জাতিসংঘ আজও সর্বসম্মত একটি নিন্দা প্রস্তাব পাস করতে পারেনি৷ তাদের ভূমিকা আবেদন, নিবেদনে সীমাবদ্ধ৷ মৃদু বকুনিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র দায় সেরেছে৷ তাতে যে বার্মিজ সেনারা কর্ণপাত করছে না, তা স্পষ্ট৷ অং সান সু চি তো ‘শালগ্রামশীলা', সু চির কথিত নির্বাচিত সরকার কোনো কিছুতে গা করছে বলেও মনে হয় না৷ তিন বড় শক্তির মদদে মানবিক বিশ্বের সমালোচনার পরও রোহিঙ্গাদের নিজভূম থেকে উৎখাত অব্যাহত রয়েছে৷ ৫ ডিসেম্বর জেনেভায় যখন জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের অধিবেশন চলছিল, সেদিনও বিকেলে আমার কথা হয় টেকনাফে অবস্থানরত সহকর্মী আবদুর রহমানের সঙ্গে৷ রহমান জানালেন, বিকেলে হোয়াইক্যং থেকে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে আকাশছোঁয়া ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখতে পেয়েছেন তাঁরা৷ এই ধোঁয়ার কুণ্ডলি ভয় জাগায়, মিয়ানমারে এখনও যে স্বল্প সংখ্যক রোহিঙ্গা মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছে, তারা কতদিন থাকতে পারবে৷ তাদের গন্তব্যও যে বাংলাদেশ হবে না, এ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না৷ আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে তিন মাসে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে৷ অবশ্য জাতিসংঘ সংখ্যাটা ছয় লাখ ২৬ হাজার বলছে৷ হিসেব বলছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গার বাস এখন বাংলাদেশে৷

রাজীব নূর

রাজীব নূর, সাংবাদিক, দৈনিক সমকাল

‘আপনা মাসে হরিণা বৈরী' — হরিণের মাংসের মতো রাখাইনের সম্পদ রোহিঙ্গাদের শত্রু৷ হালে রাখাইন নামে পরিচিত যে আরাকানে হাজার বছর ধরে রোহিঙ্গাদের বাস, সেই আরাকানের মাটির তলায় রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ তেল৷ আরাকান পর্বতমালা বনজ সম্পদের খনি৷ দক্ষিণ-পশ্চিমের বঙ্গোপসাগরের জলের তলেও রয়েছে গ্যাস৷ আরাকানের হাজার বছরের পুরনো আকিয়াব বন্দরও ভূ-রাজনৈতিক কারণে অশেষ গূরত্বপূর্ণ, সেখানে ভারত গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করতে পারলে, দেশটির অস্থিতিশীল, পিছিয়ে পড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামনে সমুদ্র বাণিজ্যের পথ খুলে যাবে, যা করার চেষ্টা ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈর আমল থেকে ৭০ বছর ধরে চলছে৷ চীনেরও চাই দক্ষিণাঞ্চলের উন্নতিতে কাছকাছি সমুদ্র বন্দর৷ আরাকানের মাটি ও সাগরের নীচে থাকা গ্যাস, তেল চায় রাশিয়া৷ ভারত ও চীনও একই মতলবে ছোঁক ছোঁক করছে৷ তাই পরস্পরের শত্রু হলেও ‘লাভ ও লোভের সীমকরণ' থেকে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে এই তিন দেশ৷ আরাকানে লাভজনক বিনিয়োগের আশায় বাংলাদেশের ‘অকৃত্রিম' বন্ধু জাপানও জাতিসংঘে মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে৷

১৯৬২ সাল থেকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে ‘প্রোপাগান্ডা' চালানো হচ্ছে, রোহিঙ্গারা বাঙালি ‘কালা'৷ ২০১২ সাল থেকে বলা হচ্ছে ‘কালা সন্ত্রাসী'৷ রোহিঙ্গা শব্দটিও উচ্চারণ নিষিদ্ধ মিয়ানমারে৷ মানবতার প্রতীক ভ্যাটিকানকেও খামোশ করে দিয়েছে মিয়ানমার৷ যে ভ্যাটিকান চার্চ হাজার বছর ধরে মৃত্যু ভীতিকে ‘সেঞ্চুরি' দিয়েছে রাজার রক্তচুক্ষুকে উপেক্ষা করে, তাদের মুখেও রা নেই৷ মিয়ানমারের পর বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়া পোপ ফ্রান্সিস মিয়ানমারে তো বটেই, বাংলাদেশে আসার পর রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগপর্যন্ত রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি৷ ঈশ্বরের সন্তানদের রক্ষা করার দাবি যখন সাধুসন্তরাও জোর গলায় বলতে পারেন না, তখন বাকি সংসারি বিশ্ব আর কী করবে?

এ বিষয়ে আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন