‘রুখে দাঁড়ান আজই′ | আলাপ | DW | 21.11.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

‘রুখে দাঁড়ান আজই'

বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম বলে ‘যৌতুক' শব্দটির সাথে আমার পরিচয় জন্মলগ্ন থেকে৷ আর বিষয়টি ‘কী‘ তা বুঝেছি এর অর্থ বোঝার ক্ষমতা যখন থেকে হয়েছে তখন থেকেই৷ তবে যৌতুক যে আসলে কী সেই উপলব্ধি হয় অনেক পরে, চারপাশ দেখে৷ 

চারপাশের কথা বলছি এই কারণে যে, যৌতুকের যে কত ধরন আর কত রকম হতে পারে এই যৌতুক, চারপাশে না তাকালে তা বোঝা যাবে না৷ এ সত্যিই দেখার মতো এক জিনিস! আর সেই যৌতুক দিতে না পারার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে সে আলোচনায় না হয় আজ না-ই বা গেলাম৷

যৌতুক দিতে না পারার পরিণতির কথা যখন ভাবি তখনই নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবান মনে হয়৷ কারণ এই গ্লানির ঘানি আমাকে টানতে হচ্ছে না৷ এরপরেও প্রায়ই ভাবি সেইসব পরিবারের কথা, যাদের শ্বাস ভারি হচ্ছে প্রতিনিয়ত কেবল এই একটি কারণে৷

আমার বিয়ের কাহিনির খানিকটা সঙ্গত কারণেই এখানে বলতে হচ্ছে৷ মোটামুটি বিনা নোটিশে আমার বিয়ে হয়৷ কথা ছিল আংটি বদলের৷ পরে বিয়ে৷ তবে ঘটনাচক্রে আংটি বদলের দিনই হয়ে যায় বিয়ে৷ সেদিন থেকেই শুরু স্বামীর ঘর করা৷ এরপর আবারও কথা হয় বিয়ের অনুষ্ঠানের (যখন সাধারণত লেনদেন বিষয় আসে)৷ পরে সেটাও হয়নি৷ বিয়ের দিনে আমার স্বামী ও তাঁর পরিবার আমর জন্য শাড়ি, গহনা এনেছিলেন৷ অন্যদিকে আংটি বদলের জন্য আমার পরিবারও তাঁর জন্য আংটি আর পোশাক এনে রেখেছিল৷ সেগুলো পরেই আমাদের বিয়ে হয়৷ পরে অবশ্য আমি উত্তরাধিকার সূত্রে আমার মায়ের কিছু গহনা আর ‘এক্সক্লুসিভ' কয়েকটা শাড়ি পাই৷

এ তো গেলো আমার বিয়ে৷ আমার আগের দু'বোনের বিয়েও বেশ অনাড়ম্বরপূর্ণভাবেই হয়৷ ফলে প্রায় আমার মতোই ঘটনা ঘটেছিল তাঁদের বেলাতেও৷ আবার আমার ভাইয়ের বিয়ের বেলাতেও তাই৷ যে মেয়েটিকে আমরা ঘরের বউ করে এনেছিলাম, তাঁর জন্য বিয়ের পোশাক আর গহনা কেনা হয়েছিল৷ মা তাঁর নিজের গহনা পরিয়েই ছেলের বউকে ঘরে তুলেছিলেন৷

কিন্তু আমার বিয়ের আগে ও পরে এই লেনদেন, ‘আধুনিক সভ্য সমাজে' যা ‘গিফট' বলে পরিচিত কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘মেয়েকে সাজিয়ে দেয়া' বিষয়ক ধ্যানধারণার চর্চা দেখতে দেখতে আমি প্রায় তেঁতো হয়ে গেছি৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

খুব মনে পড়ছে, আমার এক বন্ধুর বিয়ের কথা৷ তাঁর শিক্ষিত-ধনী বাবা-মা বিয়ের সময় মনের মাধুরী মিশিয়ে মেয়েকে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন৷ একটা পর্যায়ে আমি বন্ধুকে বলেই বসলাম, ‘‘এ সব কী হচ্ছে!'' বন্ধু নিরুত্তর৷

সইতে না পেরে বন্ধুর মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘আপনারা এ সব কী করছেন? কেন করছেন?''

ঝটপট তাঁর জবাব, ‘‘না, না ছেলেপক্ষ কিছু চায়নি তো৷ আমরা নিজে থেকেই দিচ্ছি৷''

বললাম, ‘‘কেন?''

‘‘সে কি! আমার তো আদরের একটা মেয়ে, ওকে সাজিয়ে দেবো না ?'' – এই ছিল তাঁর জবাব৷

শেষমেষ এই সাজিয়ে দেয়া কেবল শাড়ি-গহনাতে থেমে থাকলে হতো৷ সেটি গিয়ে ঠেকলো বিছানা, বালিশ, তোষক...এ সবে৷ এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখলাম আরও অনেকবার, বহুবার৷

শুধু বন্ধুমহলে নয়, দেখলাম পরিবারের গণ্ডিতেও৷ এক আত্মীয়ার কথা মনে পড়লে প্রতিবার আমি কষ্টে নীল হয়ে যাই৷ একরাশ বেদনা গ্রাস করে আমাকে৷

কেবল মেয়ের গায়ের রং অনুজ্জ্বল বলে, মেয়ের শিক্ষা-দীক্ষা সব ভুলে সেই পরিবার মানসিকভাবে রীতিমতো প্রস্তুত ছিলেন মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিতে৷ বিয়ের পাত্রও জুটেছিল সেরকমই! বিয়ের পর পাত্রের বাবা নাকি একবার মেয়ের বাসার শোকেসে সাজানো কাঁচের বাসন-কোসনের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,‘‘এইরকম একটা ডিনার সেট আমার বাসায় পাঠিয়েন৷''

প্রতি সপ্তাহে বউয়ের বাড়ি থেকে খাবার রান্না করে পাঠানোও নাকি তাঁদের এলাকার রেওয়াজ বলে দাবি করতেন তাঁরা৷ ফলের মৌসুমে ফল, শীতের মৌসুমে পিঠা, ক'দিন পর পর দাওয়াত দেয়া, ছেলের বাড়িতে কোনো আত্মীয় আসলে আবারও উপহারসহ দাওয়াত দেয়া আর বছরে দু'টি ঈদ তো আছেই৷ ফর্দ কেবল লম্বাই হতে থাকে৷ হাঁপাতে থাকে সেই পরিবার৷

Asma Khanom

আসমা মিতা, ডয়চে ভেলে

এ এক অসহনীয় দৃশ্য!

বলে রাখা ভালো, এই ঘটনা আমার আর আমার বাবা-মায়ের মাথায় তীব্রভাবে নাড়া দেয়৷ আমিও নড়েচড়ে বসি৷ কিছুতেই এই ঘটনা যেন আমার সাথে ঘটতে না পারে৷

আমাকে অবশ্য আলাদা করে কিছুই করতে হয়নি৷ আমার শ্বশুরবাড়ি গ্রামে হওয়া সত্ত্বেও সেই গ্রামের লোকজন নাকি আগে থেকেই যৌতুকপ্রথা থেকে নিজেদের দূরে রেখেছেন৷ ফলে কোনো সময়ই তাঁদের আচরণে এ ধরনের কিছু প্রকাশ পায়নি৷ বরং যৌতুক নিয়ে ঘৃণাই দেখেছি সবার চোখে৷ আমি জানি না, এই বোধ কবে, কখন বাংলাদেশের সব ঘরে, সব গ্রামে, প্রতিটি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাবে৷

আসলে এটা কেবল শিক্ষা দিয়ে নয়, বোধ আর চেতনা নিয়ে বদলাতে হবে৷ একবার ভাবতে হবে, যে মেয়েটির সঙ্গে এমন করা হচ্ছে সে যদি আমার নিজের মেয়ে হতো? যে পরিবারটির সঙ্গে এমন করছি, সেটা যদি আমার কোনো নিকটাত্মীয়ের পরিবার হতো তাহলে কেমন লাগতো? আমার মেয়ে, আমার বোন বা আমার আত্মীয়দের যে কোনো একজনের সাথেও কিন্তু এমনটা ঘটতে পারে৷ এই চিন্তা না হলে বোধহয় যৌতুকের বিরুদ্ধে, পণপ্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সম্ভব না৷

আর আমার সেই আত্মীয়ার জন্য নিরন্তর চাওয়া, ‘শক্তি সঞ্চয় করে রুখে দাঁড়ান আজই৷'

এ বিষয়ে আপনার কোনো মতামত থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়