যৌবন আর পরাহত প্রবাস জীবন | আলাপ | DW | 15.05.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

যৌবন আর পরাহত প্রবাস জীবন

একটা সময় ঋণ শোধ হলো৷ দীর্ঘ সৌদি প্রবাসে থাকার কারণে আরবি ভাষাটাও বলতে পারলাম ভালোই৷ ফলে ভালো কাজ জুটলো৷ আর অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকল৷

২০০৫ সালে ৫ ভাই-বোনের সংসারের অভাব ঘোচানোর তাগিদেই অনেক কষ্ট আর ঋণ করে পাড়ি দিয়েছিলাম মরুদেশ সৌদি আরব৷ দেশে থাকতে একটি পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে টুকটাক কাজ করতাম৷ প্রবাসে সে সুযোগ হয়ে পড়লো সীমিত৷

দীর্ঘ ১৩ বছর প্রবাসে কাটিয়ে দিলাম সংসারের ঘানি টানতে টানতে৷ এক কথায় সংসারের সুখের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলাম নির্লজ্জ, অসহায় হয়ে প্রবাসের মাটিতে৷ সংসারের সুখের পিছনে ছুটতে ছুটতে কখন যে জীবনের ৩৪ বসন্ত শেষ হলো বুঝতে পারিনি৷

প্রথম দিকে প্রবাসে যা বেতন পেতাম সবই সংসারে মাসে মাসে পাঠিয়ে দিতাম৷ এরই মাঝে বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সংসারের পুরো চাপ আসে আমার উপর৷

 

একদিন বাবা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ায় সকাল বেলায় না খেয়ে এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে এক লাখে বছরে ৩০ হাজার টাকা সুদে ৪ লাখ টাকা ঋণ নিলাম৷ বাকি ২ লাখ টাকা প্রবাসী বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিয়ে বাবাকে দেশে পাঠালাম৷

এদিকে ছোট ভাই-বোনের স্কুল কলেজের মাসিক ফি মাস শেষ হবার আগেই দিতে হতো৷

নিজেকে বিলিয়ে দিলাম কাজের মধ্যে৷ ঋণ শোধের চিন্তায় কত রাত যে নির্ঘুম কেটেছে৷ অপেক্ষা ছিল কখন শেষ হবে ঋণ৷ আর মর্মে মর্মে বুঝতে পারলাম ঋণ থাকলে প্রবাস জীবনটা কত যন্ত্রণার ও কষ্টের৷ মাসে মাসে যা বেতন পাই তার বেশিরভাগই ঋণ শোধ করতে বেরিয়ে যেত৷

এ সময়টা আগের মতো টাকা বাড়িতে দিতে পারতাম না বলে বাড়ির সবাই আমাকে নানা কথা বলতে লাগে৷ খুব খারাপ লাগতো তখন৷ শূন্য অনুভূতি হতো৷

অভিমানে মনে হতো দেশ ছেড়ে কেন একা একা জ্বলছি দূর প্রবাসে! আমি তো চেয়েছিলাম সবাইকে নিয়ে সুখে থাকতে৷ কী পেলাম আপনজনদের থেকে যন্ত্রণা ছাড়া? কাদের জন্য জীবনের অনেকগুলো বছর যন্ত্রণার প্রবাসে ঘাম ঝরিয়েছি৷ কাদের সুখের জন্য তবে কবর দিয়েছি সৌদি মরুতে আমার যৌবন!

একটা সময় ঋণ শোধ হলো৷ দীর্ঘ সৌদি প্রবাসে থাকার কারণে আরবি ভাষাটাও বলতে পারলাম ভালোই৷ ফলে ভালো কাজ জুটলো৷ আর অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকল৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

প্রবাসে থাকার শেষ বছরটা কিছুটা ভালো কাটছিল আমার৷ নিজের লেখালেখিতে ফিরে যেতে পেরেছিলাম৷ বাংলাদেশের একটি চালু অনলাইন পত্রিকায় লেখা শুরু করেছিলাম৷ ওই পত্রিকায় সংবাদ প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করছিলাম৷

এ সময়ে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে আসা বাংলাদেশি নারীদের ওপর নির্যাতনের বেশ কয়েকটি সংবাদ পাঠাই৷ খবরগুলো খুব আলোচিত হয়৷ সাংবাদিকতা যেহেতু নেশা ছিল, আস্তে আস্তে সৌদি প্রবাসী শ্রমিকদের মানবেতর জীবনের সংবাদগুলো ছাপাতে থাকি

প্রচুর মানুষের সাথে পরিচিত হই৷ সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সাথেও পরিচিত হই৷ আমরা এখানে যৌথভাবে কাজ করতাম৷

আমি মূলত একটি আন্তর্জাতিক চেইন শপের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতাম৷

এদিকে থিতু হওয়ার পর থেকেই আমার স্ত্রী দেশে স্থায়ীভাবে ফেরার তাগিদ দিতে থাকে৷ তাছাড়া এর মধ্যে বেশ কয়েকবার দেশে গিয়েছি স্বল্প সময়ের জন্য৷ আর এ কারণে আমার সন্তানও হয়েছে৷ তাকেও খুব দেখতে ইচ্ছা করে৷ তার শৈশবের দিনগুলোতে পাশে না থাকার যন্ত্রণাও আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়৷ এদিকে দেশে ফিরে কী করবো, সে চিন্তাও আমাকে পেয়ে বসেছিল৷ এটা ছিল একটা প্যারাডক্স! ফেরা আর না ফেরার দোলাচল৷

কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত যেন প্রকৃতি নিয়ে নিলো৷ সৌদি সরকারের অথর্নৈতিক সংস্কার উদ্যোগের কারণে সব ধরনের দোকানে সৌদি নাগরিক ব্যতীত অন্য দেশের কর্মীদের নিয়োগে আইনগত নিষেধাজ্ঞা এলো৷ ফলে চাকরি ছেড়ে নতুন চাকরির পেছনে ছুটতে হচ্ছিল৷

ঠিক এ সময়েই সিদ্ধান্ত নেই, ‘‘অনেক হয়েছে, দেশে ফিরে যাবো৷ নতুন করে সেখানেই কিছু করার চেষ্টা করবো৷'' গত এপ্রিলে দেশে ফিরে আসি৷ পেছনে পড়ে থাকে যৌবন আর পরাহত প্রবাস জীবন৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন