যৌনশিক্ষার অভাবে বিকৃত যৌনাচার বাড়ছে | আলাপ | DW | 15.01.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

যৌনশিক্ষার অভাবে বিকৃত যৌনাচার বাড়ছে

স্বাভাবিক শিক্ষা না থাকায় তরুণদের কাছে যৌনশিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠছে পর্নোগ্রাফি৷ সেখান থেকেই তারা শিখছে বিকৃত যৌনাচার৷

এমনটাই মনে করছেন মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা৷ পাশাপাশি মাদকের সহজলভ্যতা ও ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার না হওয়াকেও এজন্য তারা দায়ী মনে করছেন৷ 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন শিশু ও তরুণদের যৌনাচার নিয়ে৷ তিনি বলেন, ‘‘স্কুল, কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও আমাদেরযৌনশিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই৷ যেটুকু আছে, তাও শিক্ষকরা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন৷ পরিবার থেকেও তারা যৌনশিক্ষা পাচ্ছে না৷ ফলে তারা বিভিন্ন ধরনের পর্ণোগ্রাফির বই ও ভিডিও দেখে যৌনশিক্ষা পাচ্ছে৷ এই বইগুলোতে স্বাভাবিক কোন যৌনশিক্ষার ব্যবস্থা নেই৷ সেখানে যা লেখা থাকে পুরোটাই বিকৃত যৌনাচার৷ এই কারণে তরুণরা ওই বইগুলো পড়ে বান্ধবী বা সহপাঠীর উপর পরীক্ষা চালানোর চেষ্টা করে৷ এই প্রবণতাটি খুব অল্পদিন হলো লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷’’

শুধু তরুণী নয়, ধর্ষক তরুণের সঙ্গেও কারাগারে কথা বলেছেন এই গবেষক৷ সেই অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে শুভ্রা বলেন, ‘‘ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত এক তরুণ তো কারাগারে আমাকে বলেই বসল, সে রসময় গুপ্তের গল্পের (পর্ণোগ্রাফির বই) নায়ক হতে চায়! যে সমাজে পিতা-মাতা, ভাই-বোন বলে কিছু থাকবে না৷ যেখানে থাকবে শুধুই যৌনাচার৷ অর্থাৎ তার কাছে যৌনাচারই হল পৃথিবী৷ অন্য কিছু তার মাথায় নেই৷ এটা সমাজের বাস্তব চিত্র৷’’

সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কলাবাগানে বন্ধুর বাসায় গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন ইংরেজি মাধ্যমে পড়া এক শিক্ষার্থী৷ বিকৃত যৌনচারের কারণে অধিক রক্তক্ষরণে তরুণীর মৃত্যু হয় বলে ময়নাতদন্তে জানা গেছে৷ তরুণীর লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘‘আমার ২৫ বছরের চিকিৎসা জীবনে এমন একটি কেস পেলাম যা আমার কল্পনাতেও ছিল না৷ ধর্ষণের শিকার শত শত নারীর লাশের ময়নাতদন্ত আমি করেছি৷ ধর্ষণ বা গণধর্ষণের কারণে যৌনাঙ্গ ফেটে যাওয়া বা নানা ভাবে বিকৃত হয়ে যাওয়া দেখেছি৷ এমনকি পায়ুপথেও নানা ধরনের ক্ষত হতে দেখেছি৷ কিন্তু এই তরুণীর যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথ এমনভাবে ক্ষত হয়েছে যা দেখে আমাদের মনে হয়েছে, শক্ত এমন কোনো বস্তু সেখানে নির্দয়ভাবে ঢোকানো হয়েছে, যে কারণে তরুণীর দু'টি পথই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ বীভৎস অবস্থা হয়েছে৷ দু'টি পথেই অধিক রক্তক্ষরণে মেয়েটির মৃত্যু হয়েছে৷’’

অডিও শুনুন 05:26

যৌনশিক্ষার স্বাভাবিক ব্যবস্থা নেই: নৃবিজ্ঞানী ফাতেমা সুলতানা

এই ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘‘এটা একটা পূর্ণাঙ্গ ক্রাইম৷ কারণ এখানে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে৷ আমি মনে করি, পরিবারকে জানতে হবে ছেলে বা মেয়ে কোথায় কার সাথে মেশে, কী করে, কখন কোথায় যায়?’’ তিনি বলেন, সন্তান জন্ম দিলে দায়-দায়িত্ব পিতামাতাকে নিতে হবে৷ এই কিশোরদের মধ্যে ‘গ্যাং কালচার' গড়ে উঠার কথা তুলে ধরে বলেন, তারা মাদক নিয়ে ধ্বংস হয়ে যাক সেটা কোনোমতেই আমরা মানতে করতে পারি না৷ নতুনপ্রজন্ম সামাজিকভাবে ধ্বংস হবে, তা হতে দেওয়া যাবে না৷ 

গত বছরের ১৩ এপ্রিল সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় প্রেমের অভিনয় করে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করে তার প্রেমিক৷ আর সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে ওই তরুণের সাতজন সহপাঠী৷ মামলাটির তদন্ত করেছেন উল্লাপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক মোশারফ হোসেন আকন্দ৷ তিনি বলেন, ‘‘ধর্ষক তরুণ বা ধর্ষণের শিকার হওয়া তরুণী এবং যে সাতজন ভিডিও ধারণ করেছে এরা সবাই কিশোর৷ এদের সবার বয়স ১৮ বছরের নিচে৷ ধর্ষকসহ ভিডিও ধারণ করা কিশোরদের আমি জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, জানতে চেয়েছি কেন তারা এই কাজ করল? জবাবে ভিডিও ধারণ করা তরুণরা বলেছে, তারা এটা দেখে পরেও ‘মজা নিতে' চেয়েছিল, এই কারণে তারা ভিডিও ধারণ করেছে৷ আর ধর্ষক বলেছে, বিভিন্ন পর্নোগ্রাফি দেখে ধর্ষণে উদ্বুর্দ্ধ হয় সে৷’’

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, ‘‘প্রত্যেকটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের জৈবিক চাহিদা থাকে৷ এটা কোন না কোনভাবে পূরণ হতে হয়৷ আমাদের দেশে দৌলতদিয়া ছাড়া আর কোন ব্রোথেল নেই৷ অথচ এটা সারা বিশ্বেই আছে৷ এগুলো না থাকায় দেখবেন আনাচে কানাচে কাজগুলো হচ্ছে চুরি করে৷ তরুণরাও প্রেমের নামে তরুণীদের ফ্ল্যাটে নিয়ে আসছে৷ সেখানে এই কাজগুলো হরহামেশাই হচ্ছে৷ দু'একটি ঘটনায় ব্যতিক্রম হলে মিডিয়ায় হৈ চৈ হচ্ছে৷ আসলে আমরা কি তরুণ বা তরুণীদের যৌনশিক্ষা দিচ্ছি? পরিবারে মা সংসারের কাজের পাশাপাশি মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত, বাবা চাকরি বা ব্যবসা নিয়ে সময় পার করছেন৷ তাহলে শিশুটি কিভাবে বড় হচ্ছে৷ তার হাতে ইন্টারনেটযুক্ত মোবাইল ফোন ধরিয়ে দিয়েছেন৷ সেই ফোনে সে কী দেখছে? কেউ তার খোঁজ নিচ্ছে? এভাবে বেড়ে উঠা তরুণ বা তরুণী কী শিক্ষা পাচ্ছে?’’

এক তরুণীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার মিরপুর থেকে সভারের আশুলিয়ায় ডেকে নেয় কথিত প্রেমিক৷ এরপর ঘুরতে যাওয়ার নাম করে জঙ্গলে নিয়ে যায়৷ সেখানে ৭ বন্ধু মিলে রাতভর আটকে রেখে তরুণীকে গণধর্ষণ করে৷ পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ এই তরুণদের গ্রেফতার করে৷ এদের সবার বয়স ১৭ থেকে ২০ বছরের মধ্যে৷ আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক জসিম উদ্দিন বলেন, তরুণরা গ্রেফতারের পর স্বীকার করেছে পর্নোগ্রাফি থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই পরিকল্পিতভাবে এই গণধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে৷

অডিও শুনুন 05:59

মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণ হতে হয়: অধ্যাপক নেহাল করিম

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘মাদকের সহজলভ্যতা, যৌনশিক্ষা না পাওয়া এবং ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার না হওয়ার কারণে তরুণদের মধ্যে বিকৃত যৌনাচারের প্রবণতা তৈরী হয়৷ আমাদের কাছে এমন অনেক রোগী নিয়ে আসেন পিতা-মাতা৷ কিছুদিন আগে এক তরুণকে তার মা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন৷ ওই তরুণের পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি তৈরী হয়েছে৷ পরিবারের সদস্যদের অজান্তে লুকিয়ে সে পর্নোগ্রাফি দেখতে দেখতে ভয়াবহ আসক্ত হয়ে পড়েছে৷ আসলে স্কুল কলেজে যৌন শিক্ষাটা হওয়া জরুরি৷ পাশাপাশি পরিবার থেকে তরুণদের হাতে বিপুল পরিমান টাকা দেওয়ার কারণে তারা মাদকের প্রতিও ঝুঁকে পড়ছে৷ মাদকাসক্ত তরুণের পক্ষেই সম্ভব বিকৃত যৌনাচার৷''

ঢাকা শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেনও একই অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, সঠিক যৌনশিক্ষার অভাবে শিশুদের মধ্যে বিকৃত যৌনাচার বাড়ছে৷

বাংলাদেশের একটি প্রথম শ্রেণীর দৈনিকে সম্প্রতি চট্টগ্রামের ধর্ষণের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গত বছরের ১১ মাসে সেখানে ২২৭টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে৷ ধর্ষণের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের প্রায় ৬৪ শতাংশই শিশু-কিশোরী, যাদের বয়স চার থেকে ১৮ বছর৷ প্রেম, বিয়ে ও ফাঁদে ফেলে কিশোরী ও তরুণীদের প্রতারণার মাধ্যমে ধর্ষণ করা হচ্ছে৷ ধর্ষণের মামলার ৮৬ শতাংশই এই অভিযোগে করা৷

তরুণদের মধ্যে কেন বিকৃত যৌনাচার বাড়ছে? জানতে চাইলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী নানুপুরী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সালাহউদ্দিন নানুপুরী বলেন, ‘‘মাদ্রাসাগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি যৌনশিক্ষা দেওয়া হয়৷ কিন্তু সাধারণ শিক্ষায় যৌন শিক্ষা দেওয়া হয় না৷ একই সঙ্গে এই তরুণীদের অনেকেই পর্দা মেনে চলে না৷ খানিকটা উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনে তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠছে৷ এই কারণে তাদের মধ্যে বিকৃত যৌনাচারের মানসিকতার সৃষ্টি হচ্ছে৷’’ অনেক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে তো এই ধরনের বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগ পাওয়া যায়? জবাবে মাওলানা নানুপুরী বলেন, ‘‘দু'একটা দুষ্টু লোক তো সবখানেই আছে৷ মাদ্রাসাতেও আছে৷’’

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন