যৌনপল্লি বদলাচ্ছে, সমাজ নয় | আলাপ | DW | 23.01.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

যৌনপল্লি বদলাচ্ছে, সমাজ নয়

ভারতে যৌনকর্মীদের অবস্থা বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি তাঁদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী৷ ফলে এখনও বিশ্বের আদিমতম এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মেয়েদের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়৷

সোনাগাছিতে জন্ম নেওয়া শিশুরা

সোনাগাছিতে জন্ম নেওয়া শিশুরা

কলকাতার সোনাগাছি৷ ভারতীয় উপমহাদেশের সবথেকে পুরনো, সবচেয়ে বড় যৌনপল্লিগুলির মধ্যে অন্যতম৷ আজ থেকে ২৫/-৩০ বছর আগেও এই সোনাগাছি ছিল সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত যৌনকর্মীদের এলাকা, যেখানে চলতো গুন্ডা, মাস্তান আর পুলিশের দাপট৷ যৌনরোগের সংক্রমণ ছিল ব্যাপক৷ যৌনকর্মীদের আর্থিক সুরক্ষা বলে কিছু ছিল না৷ তাঁদের সন্তানদেরও ছিল না কোনো ভবিষ্যৎ৷ যৌনকর্মীর কন্যাসন্তান ফের একজন যৌনকর্মীই হবে, এটাই ছিল একমাত্র নিশ্চয়তা৷

সেসময় বহু মেয়েকে ফুসলিয়ে বা জোর করে ধরে নিয়ে এসে, তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যৌনপেশায় নামিয়ে দেওয়া হতো৷ এরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই হতো গরিব পরিবারের সন্তান, অনেকেই নাবালিকা৷ তারা না চাইলেও যৌনবৃত্তিতে বাধ্য হতো৷ পুলিশ বা প্রশাসন তাদের পাশে দাঁড়াত না৷ উল্টে হেনস্থা বাড়ত৷ রাজনৈতিক দলগুলোও ভোট চাওয়ার বাইরে এই এলাকায় পা রাখত না. তবে পৌঁছে গিয়েছিল মারাত্মক রোগ ‘‌এইডস'‌৷ যৌনকর্মীদের থেকে যে রোগ ছড়িয়ে পড়ত বৃহত্তর সমাজে৷

কিন্তু এ সব এখন ইতিহাস৷ ১৯৯০-এর দশকেই পরিবর্তনটা শুরু হয়েছিল৷ আর এখন আমূল বদলে গেছে সোনাগাছি৷ এক কথায় বলতে গেলে, এখানকার মেয়েদের এক বিপুল ক্ষমতায়ন হয়েছে গত আড়াই দশকে, যার শুরু হয়েছিল আদতে এইডস সংক্রমণ রোখার লড়াই এবং নারী পাচার বন্ধের উদ্যোগের হাত ধরে৷ জন্ম নিয়েছিল যৌনকর্মীদের নিজস্ব সংগঠন ‘‌দূর্বার মহিলা সমিতি'‌, যা এখন দূর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি৷ সামাজিকভাবে প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি কাজটা করেছিল দূর্বার, তা হলো সোনাগাছির যৌনকর্মীদের জন্যে একটা মঞ্চ গড়ে দেওয়া, যার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা নিজেদের কথা বলতে পারেন৷ মাথার ওপর একটা ছাতা হয়ে দাঁড়ানো, আপদে-বিপদে যে ছাতার তলায় তাঁরা আশ্রয় নিতে পারেন৷ এবং শুধু যৌনকর্মীরাই নন, তাঁদের ‘‌খদ্দেররা', চলতি ভাষায় যাঁদের ‘‌বাবু'‌ বলা হয়, তাঁদেরকেও সংগঠিত করেছে দূর্বার৷ এই বাবুদের জন্যে তৈরি হয়েছে ‘‌সাথী'‌ সংগঠন, যার ‘সহায়তা কিয়স্ক' চালু হয়েছে সোনাগাছি ও শহরের অন্য যৌনপল্লিতে, যেখানে তাঁরা দরকার হলেই গিয়ে সাহায্য চাইতে পারেন৷ সাধারণভাবে যাঁরা নিয়মিত যৌনপল্লিতে যাতায়াত করেন, তাঁরা সামাজিকভাবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, যেহেতু সমাজ তাঁদের সুনজরে দেখে না৷ সেই মানসিকতা থেকে তাঁদের মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং একই সঙ্গে এইডস ও অন্যান্য যৌন রোগ সম্পর্কে এক বৃহত্তর সচেতনতার প্রসার ঘটানো সম্ভব হয়েছে৷ পরিণতিতে সব ধরনের যৌন রোগের প্রকোপ আজ অনেক কমে গেছে সোনাগাছিতে৷

একই ঘটনা ঘটেছে যৌনকর্মীদের সন্তানদের ক্ষেত্রে৷ তাদের পড়াশোনা শেখানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা অন্য পেশায় যেতে পারে, স্বাবলম্বী হয়৷ যৌনকর্মীর সন্তানেরা যাতে কোনোভাবে সমাজে নিজেদের অচ্ছ্যুৎ বা অপাংক্তেয় না মনে করতে পারে, সেজন্য খুব জরুরি ছিল এই উদ্যোগ৷ এখন যৌনকর্মীর সন্তানেরাও মূল ধারার স্কুলে ভর্তি হচ্ছে৷ তাদের নিজস্ব একটা ফুটবল দল হয়েছে, যে দল গত বছর তৃতীয় ডিভিশনে খেলার পর দ্বিতীয় ডিভিশনে খেলার যোগ্যতামান পার করেছে৷ এর মধ্যে একবার ইউরোপে খেলে এসেছে এই ফুটবল দল

এছাড়া মাঝেমধ্যেই নানা ধরনের আন্তর্জাতিক প্রকল্প, কর্মসূচির শরিক হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এরা৷ কয়েক বছর আগেই যেমন জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেসকোর একটি প্রকল্পে এদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া হয়েছিল, যাতে ছবির ভাষায় এরা নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে পারে৷

তা হলে পুরো ছবিটাই কি প্রগতির এবং খুব আশাজনক?‌ না, বলছেন ডা. স্মরজিৎ জানা, যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন দূর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটিকে৷ কিছু সাফল্য অবশ্যই এসেছে৷ যেমন সোনাগাছির যৌনকর্মীদের যে সমবায় তহবিল, সেই ‘‌ঊষা কোঅপারেটিভ ক্রেডিট লিমিটেড'‌-এর নিবন্ধিকরণ করা গেছে যৌনকর্মীদের নামেই৷ এটা একটা বিরাট বড় সাফল্য, যেহেতু যৌন পেশা এখনও বৈধ বৃত্তি বলে স্বীকৃত নয় ভারতের আইনে৷ কিন্তু ঐ মূল জায়গাটায় সমস্যা থেকে গেছে৷ বহু উদ্যোগ সত্ত্বেও যৌনবৃত্তিকে বৈধ পেশার স্বীকৃতি দেওয়া যায়নি৷ এ নিয়ে আইন সংশোধনের কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, কিন্তু ঐ পর্যন্তই৷ যেমন যৌনকর্মীর সন্তানদের জন্য বারুইপুরে একটি হস্টেল চালু হয়েছে, যেখানে থেকে সাধারণ স্কুলে, আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারবে তারা৷ আলাদা পরিবেশে থেকে৷ কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী তো এখনও বদলায়নি৷ ফলে কোনো শিক্ষকই হয়ত ঘুরিয়ে এমন কোনো একটা খোঁচা দিয়ে দিলেন যে, বাচ্চাটির খারাপ লাগল৷ যে কারণে স্কুল থেকে ‘ড্রপ আউট'-এর সংখ্যাও খুব বেশি, জানালেন ডা. জানা৷

তবু চেষ্টা চলছে, লড়াই চলছে, চলবেও৷ সোনাগাছি এবং কলকাতার খিদিরপুর, কাশীপুর, বউবাজার অঞ্চলের যৌনপল্লির মেয়েরা এখন অন্তত এটা জানেন যে তাঁরা আর একা নন৷ নিজেদের অধিকারের লড়াইটা তাঁরা নিজেরাই লড়ছেন, তবে একসঙ্গে৷

বন্ধ, কেমন লাগলো প্রতিবেদনটি? লিখুন আপনার মন্তব্য, নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন