‘যৌতুক সামাজিক ব্যাধি, যারা নিচ্ছে তারা অপরাধী′ | আলাপ | DW | 21.11.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘যৌতুক সামাজিক ব্যাধি, যারা নিচ্ছে তারা অপরাধী'

যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সফলতা আসছে না৷ সামাজিক এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে৷ গ্রাম থেকে শহরে, উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত – সর্বোত্রই এই ব্যাধির প্রকোপ৷ এ নিয়েই এবার ডয়চে ভেলের মুখোমুখি ডা. মালেকা বানু৷

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানুর কথায়, নারীর ক্ষমতায়ন বা বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে গেলেও আগে দরকার যৌতুক প্রথা বন্ধ করা৷ তবে শুধু যারা যৌতুক দিচ্ছে, তারা নয়৷ যারা দিচ্ছে, তারাও অপরাধী৷

ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশে যৌতুক প্রথার অবস্থাটা এখন কেমন?

ডা. মালেকা বানু: বাংলাদেশে যৌতুক প্রথা এখনো চলছে সেই আগের মতোই৷ তাই এটা আগের চেয়ে কমেছে, এটা আমরা বলতে পারব না৷

এই সংখ্যাটা কি আগের চেয়ে বেড়েছে না কমছে?

কমেনি তো বটেই৷ উলটে যৌতুক প্রথাটা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে৷ এক সময় এটা একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল৷ কিন্তু এখন এটা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে৷ উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত – সবার মধ্যেই এটা ছড়িয়ে আছে৷ তাছাড়া সকল ধর্ম-বর্ণের মধ্যে এই যৌতুক প্রথা এখন আসন গেড়ে বসেছে৷ 

যৌতুক কি সামাজিক ব্যাধি না কি একটা প্রথা?

এটা অবশ্যই সামাজিক ব্যাধি৷ আমাদের সমাজে মেয়েদের যেভাবে দেখা হয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গি তো বদলায়নি৷ বিয়েতে যৌতুক দেয়া এবং নেয়া আমাদের সমাজে এখনো প্রচলিত আছে৷ বাংলাদেশে কিন্তু যৌতুকবিরোধী আইন আছে৷ অথচ যারা যৌতুক দিচ্ছে এবং নিচ্ছে তারা কিন্তু এই আইনের তোয়াক্কা করছে না৷ তবে আইনের ফাঁক-ফোকর রয়েছে৷ এই যৌতুকটা একটা মেয়ের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক৷ এর কারণেই মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে৷ মেয়ের বয়স যত বেশি হবে, তার জন্য নাকি তত বেশি যৌতুক দিতে হবে৷ উচ্চবিত্ত পরিবারেও নানা কৌশলে যৌতুক দেয়া এবং নেয়া হচ্ছে৷ আমাদের ৮৭ ভাগ মেয়ে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে৷ এর সিংহ ভাগই হচ্ছে যৌতুকের কারণে৷ এটা পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্টে উঠে এসেছে৷ বিয়ের ১০ বছর পরও যৌতুকের কারণে মেয়েদের নির্যাতন করা হচ্ছে, তার পরিবারের উপর চাপ দেয়া হচ্ছে৷ এটা বন্ধ করা না গেলে নারীর ক্ষমতায়ন, বাল্যবিবাহ বন্ধ বা মেয়েদের সম্মানজনক একটা অবস্থায় কখনও নিয়ে যাওয়া যাবে না৷ দেশে যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং হত্যা চলছেই৷

যৌতুক প্রথা শহরে না গ্রামে বেশি?

আমরা বলব গ্রামে বা শহরে সব জায়গাতেই এটা চলছে৷ গ্রামেরটা দৃশ্যমান৷ সেখানে বলাই হয় যে, যৌতুক না দিলে মেয়ের বিয়ে হবে না৷ বয়স বেশি হলে যৌতুক বেশি দিতে হবে৷ কিন্তু শহরে নানান ‘ফরম্যাটে' যৌতুক দেয়া এবং নেয়া হচ্ছে৷ এখানে উচ্চবিত্তরা চাকরি, গাড়ি, বাড়ি, ব্যাংক – নানা কায়দায় এটা চালাচ্ছে৷ যারা দিচ্ছে এবং নিচ্ছে তাদের আমরা সামাজিকভাবে বয়কট করতে পারছি না৷ আমরা যদি তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে না পারি তাহলে যৌতুক প্রথা বন্ধ করতে পারব না৷

অডিও শুনুন 10:19

‘বিচার ব্যবস্থা থেকে নারীরা যে ন্যায় বিচার পাবে, তার সম্ভাবনা সবক্ষেত্রেই কম’

বাল্যবিবাহ যৌতুকের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত?

খুবই সম্পর্কিত৷ এখানে দারিদ্র একটা কারণ৷ বলা হয়, কম বয়সে বিয়ে হলে কম যৌতুক দেয়া যায়৷ এ কারণে গ্রামের বাবা-মায়েরা মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন৷

পুরুষদের মধ্যে যৌতুকের আকাঙ্খা কেন তৈরি হয়?

আমাদের সমাজে ছেলেরা একটা ভিন্ন ধরনের মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে৷ যৌতুক নেয়াটা তারা এক ধরনের অধিকারের বলে ধরে নিছে৷

এটা কি তাহলে পারিবারিক প্রথার মধ্যে ঢুকে গেছে?

শুধু পারিবারিক বা সামাজিক প্রথা নয়, এটা মানসিক চিন্তার মধ্যেও এটা ঢুকে গেছে৷ যৌতুক নেয়াটা একটা ছেলের জন্য কতটা অসম্মানজনক, সেটা আজকের ছেলেদের আমাদের বোঝাতে হবে৷

শাশুড়ি কিংবা ননদ যৌতুকে জড়িত হন কেন? তাঁরাও তো নারী?

এটা আসলে দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ঢুকে গেছে৷ এই দৃষ্টিভঙ্গির ধারক-বাহক ছেলে এবং মেয়ে৷ এর শিকারও হচ্ছে ছেলে-মেয়ে সবাই৷ ফলে নির্যাতিত মেয়ের পাশে এই শাশুড়ি বা ননদ দাড়াঁচ্ছেন না৷ অনেক সময় তাঁরাও নির্যাতনকারীর ভূমিকায় চলে আসছেন৷

শিক্ষিত সচেতন নাগরিকরাও তো যৌতুক দিচ্ছেন এবং নিচ্ছেন৷ তাহলে আমাদের শিক্ষায় কোনো গলদ আছে কি?

আমি বলব অবশ্যই শিক্ষায় গলদ রয়েছে৷ একটা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষা – এই বিষয়গুলো আমাদের পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে৷ এটা নিয়ে আমরা আন্দোলন করছি৷ তবে এবার এটাকে পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে৷

যৌতুকের জন্য প্রাণ নিয়ে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে না কমছে?

আমরা কমার কোনো লক্ষণ দেখছি না৷  নানানভাবে এই প্রবণতা বেড়েই চলছে৷ আমরা দেখছি শুধু প্রাণ কেড়ে নেয়া নয়, একজন নারীর চোখ তুলে নিচ্ছে বা নানাভাবে তাঁর উপর নির্যাতনও করা হচ্ছে৷ আর এ ধরনের নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে৷

যাঁরা যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার তাঁরা যদি মামলা করেন, তাহলে তাঁদের কতভাগ নিজেদের পক্ষে রায় পান? আর এই ভাগ যদি কম হয়, তাহলে তার কারণ কী?

আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চয় আপনাদেরও একটা ধারণা আছে! আর দ্বিতীয় কথা হলো, এটা কিন্তু নারী বান্ধব না৷ এই বিচার ব্যবস্থা থেকে নারীরা যে ন্যায় বিচার পাবে, তার সম্ভাবনা সবক্ষেত্রেই কম৷ যৌতুকের মামলার ক্ষেত্রে তো আমরা দেখিই যে, এটা ঠিকমতো উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অনেক ব্যতয় ঘটে৷

তাহলে কি আদালতে নারী ‘পাবলিক প্রসিকিউটার' বা সরকারি প্রতিনিধি জরুরি হয়ে পড়ছে?

নিশ্চয় প্রয়োজন৷ আমরা দেখছি যে, বিচার ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে৷ আমরা বলছি, যিনি ‘পাবলিক প্রসিকিউটার' বনা পিপি রয়েছেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিটা যেন নারীবান্ধব হয়৷ নারীর প্রতি তাঁর একটা সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি যেন থাকে৷ তাছাড়া আইনেও পরিবর্তন আনতে হবে৷ আমরা চেষ্টা করছি৷ সরকারেরও একটা ‘পজেটিভ' দৃষ্টিভঙ্গি আছে৷ দেখা যায় কী হয়!

যৌতুক নির্মূলে আপনার পরামর্শ কী?

সর্বপ্রথম আমাদের আইনে সংশোধন প্রয়োজন৷ কারণ একটা আন্দোলনে নামতে হলে আগে আপনার হাতিয়ার প্রয়োজন৷ সেইভাবে আইনটা আগে ঠিক করতে হবে৷ দ্বিতীয়ত, সামাজিক আন্দোলনটা অব্যহত রাখতে হবে৷ যারা যৌতুক দিচ্ছে বা নিচ্ছে তারা সামাজিকভাবে অপরাধী৷ তাদের বয়কট করতে হবে৷ এই চর্চাটা শুরু করতে পারিনি৷ এ জন্য ব্যাপক প্রচারণা দরকার৷ আর এটা যে একটা সামাজিক ব্যাধি, সেটা তরুণ প্রজন্মকে বোঝাতে হবে৷

সাক্ষাৎকারটি নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন