যৌতুক বন্ধে প্রয়োজন ঘরে ঘরে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়া | আলাপ | DW | 20.11.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

যৌতুক বন্ধে প্রয়োজন ঘরে ঘরে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়া

সামাজিক মর্যাদা বা ‘স্ট্যাটাস' বজায় রাখতে কেবল নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত নয়, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারেও উপহারের নামে যৌতুক দেয়ার চল রয়েছে বাংলাদেশে৷ সমাজকে যৌতুকমুক্ত করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা৷

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারে তথাকথিত যৌতুক প্রথা সাধারণত পরিলক্ষিত হয় না৷ কিন্তু অন্যভাবে কন্যার পরিবারকে চাপের মধ্যে রাখা হয়, যেটা যৌতুকের অন্তর্ভুক্ত৷ অনেকে মনে করেন নিজের মেয়েকে সুখে থাকবে তাই ভালো করে বেশি বেশি জিনিস দিয়ে তাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো হোক৷ কিন্তু তারা একটা জিনিস বুঝতে পারেন না যে, এই দেয়ার প্রবণতা অন্যপক্ষের চাওয়ার প্রবণতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়৷ অর্থাৎ যৌতুক যে লোভ, সেই লোভকে আরো উসকে দেয়া হয়৷ কেননা আমাদের সমাজে ধরেই নেয়া হয় পুত্র সন্তান মানেই ধন-সম্পদ, পরিবারে অর্থ উপার্জন বা অর্থ আনার লক্ষ্মী৷ সুতরাং তাকে দেখেই যেন মেয়ের বাপ-মা সবকিছু উজার করে দেবেন৷ অথবা কেউ দেবেন চাকরি, কেউ দেবেন সম্পত্তি৷

যারা নিচ্ছেন তারা একবারও কি ভেবে দেখেছেন যে, এই যৌতুক চাওয়াটা একেবারে ভিক্ষার পর্যায়ে পড়ে? একটা পরিবারে একজন মেয়ে তো ঠিক ততটাই আদর যত্নে বড় হয়, যতটা একটা ছেলে৷ সেট যত্নের ধনকে আপনার হাতে যখন তুলে দেয়া হচ্ছে, আপনি তাকে আপনার পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করছেন, অর্থাৎ শর্তহীন ভালোবাসায় গ্রহণ করছেন তাকে৷ সেখানে ভিক্ষার দান থাকবে কেন?

এটা তো গেল নিম্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা৷ আর উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো কী করছে? সমাজের ধনী ও বিত্তশালী হবার প্রতিযোগিতায় নেমেছে তারা৷ অর্থাৎ দেখানোর প্রতিযোগিতা৷ কে কত অর্থ ঢালতে পারে ছেলে-মেয়ের বিয়েতে৷ অর্থাৎ সামাজিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাস বজায় রাখতে জাঁকজমকের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠান করা, প্রচুর মানুষ দাওয়াত করা এবং উপঢৌকন দেয়া৷ দুই পরিবারে সামাজিক পদ ভিন্ন হলে, অর্থাৎ কনের পরিবার কম সম্পদের অধিকারী হলে বরের পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে সাধ্যের বাইরে গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান করেন৷ কিন্তু এতে কি আদৌ বরের পরিবারে কনের সম্মান বাড়ে? নাকি বাবা যে বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে এই আড়ম্বর অনুষ্ঠান করলেন সেই আত্মগ্লানি মেয়েটিকে কুড়ে কুড়ে খায়?

এ সব বিয়েতে মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে কনের পরিবার বরের পরিবারকে কী কী উপহার দিল, বাড়ি, গাড়ি নাকি ব্যবসায় অংশীদারিত্ব? এই দেখানোর চলটা ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তের মানসিকতায় প্রবেশ করছে আজ৷ বাবা-মায়ের সামর্থ্য না থাকলেও এই দেখানোর প্রতিযোগিতায় কত পরিবার যে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে তার খবর রাখে কে? এর মাধ্যমে যে যৌতুককে উসকে দেয়া হচ্ছে, সেটাই বা মানতে চাইবে ক'জন? তাই এই ঘৃণ্য প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে আমাদেরই৷

পরিসংখ্যান কী বলছে?

নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালে যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতনের কারণে সারা দেশে ৬ হাজার ৬০৭টি মামলা হয়েছে৷ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং ‘আমরাই পারি' পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের-২০১৫ সালের বছরজুড়ে নারী নির্যাতনের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ১৯২ জনকে, যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হয়েছেন ১৭৩, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৭৪ জন৷ দেশের আদালতে যেসব নালিশি মামলা দায়ের হয় তার অন্তত ৫০ শতাংশ যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা৷

এছাড়া ‘ইউনাইটেড ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম'  বা ইউএনডিপি পরিচালিত ‘সিস্টেম অফ ডাওরি ইন বাংলাদেশ' বা বাংলাদেশের যৌতুক প্রথার ওপর ১০ বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শতকরা ৫০ শতাংশ বিবাহিত নারী যৌতুকের কারণে শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়৷ তাহলে বোঝাই যাচ্ছে সাদা চোখে আমরা হয়ত কেবল দরিদ্র পরিবারগুলোকেই যৌতুক নিতে দেখছি৷ কিন্তু অন্যান্য পরিবারগুলোও যে এই মানসিকতা থেকে বাইরে নয়, তার একটা মোটামুটি চিত্র কিন্তু এ থেকে বোঝা যায়৷

DW Bengali Redaktion (DW/P. Henriksen)

অমৃতা পারভেজ, ডয়চে ভেলে

কী আছে যৌতুক বিরোধী আইনে?

যৌতুক বন্ধে ১৯৮০ সালে ন'টি ধারা নিয়ে হয় যৌতুক নিরোধ আইন৷ এটাতে কাজ হলো না৷ এরপর ১৯৯৫ সালে হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান আইন করা হলো৷ এ আইনে কঠিন শাস্তির বিধান রাখা হলো৷ শেষ পর্যন্ত এটাও ব্যর্থ হলো৷ সর্বশেষ ২০০০ সালে হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন৷ এরপর এ বছর ‘যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৭'-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিসভায়৷ এর আওতায় কোনো নারীর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষের অন্য যেকোনো ব্যক্তি যৌতুকের জন্য কোনো নারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷ যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা (প্ররোচিত করে) করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, মারাত্মক জখমের জন্য যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড বা ন্যূনতম ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে৷

কী কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?

যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি শুধু নয়, মারণব্যধির মতো আমাদের সমাজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে৷ যৌতুক যে দেয় এবং যৌতুক যে নেয় দু'জনেই সমান অপরাধী-এই আইনের মূল মন্ত্র জানলেও ক'জন তা মানে? তাই শুধু আইন করে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়৷ এজন্য প্রয়োজন ঘর থেকে ঘরে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়া৷ এ ব্যাপারে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আরও নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত৷ ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যৌতুক বিরোধী প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে৷ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷ পাঠ্যপুস্তকে যৌতুক বিরোধী বিষয় এবং যৌতুক সংক্রান্ত আইনগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে৷ মানবাধিকার সংগঠন ও এনজিওগুলো যৌতুক বিরোধী প্রচারণা চালাতে পারে৷ গণমাধ্যমে যৌতুক বিরোধী প্রচারাভিযানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে৷

নারীরা কেন যৌতুকের বলি হবে? কেন তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে? এ সমস্যার সমাধান রয়েছে প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি ব্যক্তির সচেতন হয়ে ওঠার মধ্যেই৷ সবার মধ্যে যদি এই বোধ জন্ম নেয় যে যৌতুক এক ধরনের ভিক্ষাবৃত্তি, এর মাধ্যমে কোন সম্মান প্রাপ্তি হয় না, বরং নিজের সম্মানহানিই ঘটে-তাহলে হয়ত আমাদের সমাজ থেকে একদিন এই ভয়াবহ অভিশাপ দূর হবে৷

এ বিষয়ে আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়