যে ভাষায় স্রোত নেই, সে মরা ভাষা | আলাপ | DW | 05.03.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

যে ভাষায় স্রোত নেই, সে মরা ভাষা

সংস্কৃতির এলিটিসম চালাতে গিয়ে আমরা ভাষার জানলা-দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি৷ এতে ক্ষতি হচ্ছে সংস্কৃতিরই৷

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে হিমালয়৷ দার্জিলিং জেলা৷ সেই হিমালয়ের ঠিক পাদদেশে বিস্তীর্ণ তরাই অঞ্চলের নাম ডুয়ার্স৷ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্জিলিং চায়ের জন্মস্থান৷ চা বাগান ছাড়া ডুয়ার্স বিখ্যাত একাধিক অভয়ারণ্যের জন্য৷ এ হেন ডুয়ার্সে প্রায় দুইশো বছর আগে এসে পৌঁছেছিল ব্রিটিশ পল্টন৷ চীন থেকে আনা চায়ের চারা এখানে পুঁতলে যে মিরাকল হয়ে যাবে, তা অনেক আগেই বুঝেছিল তারা৷ ফলে শুরু হলো চা বাগান৷

চা বাগান করতে হলে শ্রমিক দরকার৷ জঙ্গল এলাকা ডুয়ার্সে তত মানুষ নেই৷ ফলে ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে নিয়ে আসা হলো সাঁওতাল, ওরাও, মুন্ডা শ্রমিকদের৷ এককথায় আদিবাসী মানুষদের৷ অন্যদিকে, নেপাল এবং দার্জিলিং থেকে আনা হলো নেপালি এবং লেপচা শ্রমিকদের৷ স্থানীয় রাজবংশীদের একাংশও কাজ পেলেন৷ কেরানি হিসেবে আনা হলো দক্ষিণবঙ্গের বাঙালিদের৷ তৈরি হলো এক নতুন কমিউনিটি৷ বহু ভাষা, বহু মত, বহু সংস্কৃতির একত্র যাপন৷ যার নাম হলো চা বস্তি৷ গত দুইশ বছর ধরে একসঙ্গে থাকতে থাকতে এক নতুন ভাষার জন্ম দিয়েছে এই গোষ্ঠী৷ যার নাম সাদ্রি৷ অলচিকি, হিন্দি, বাংলা, রাজবংশী, নেপালি মিলে এক আশ্চর্য মেলবন্ধনের ভাষা৷ গোটা ডুয়ার্স দীর্ঘদিন ওই ভাষায় কথা বলেছে৷ ওই ভাষায় প্রেম করেছে, গালি দিয়েছে, খাবার চেয়েছে৷ কিন্তু পড়াশোনা করেনি৷ কারণ, পশ্চিমবঙ্গের মূলস্রোতের সংস্কৃতি ওই ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়নি কোনোদিন৷ ডুয়ার্সের স্কুলে মূলস্রোতের বাংলা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ স্কুলে শেখানো তাদের ‘মাতৃভাষা’ বাংলা৷ যে বাংলার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কার্যত কোনো সম্পর্ক নেই৷ থাকার কথাও নয়৷

ভাষা আসলে এক রাজনীতি৷ যে রাজনীতি অপেক্ষাকৃত দুর্বলের উপর সবলের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়৷ হ্যাঁ, সংস্কৃতিই৷ কারণ, ভাষার ব্যবহারে বিভাজিত হয়, গ্রাম-শহর, সমাজের নানা মানদণ্ডে তৈরি হওয়া বিবিধ শ্রেণি, শিক্ষিত-অশিক্ষিত এবং জাত৷ তাই সুন্দরবনের নিম্নবর্গের ডায়লেক্ট কলকাতায় মান্যতা পায় না৷ সংখ্যালঘু মুসলমানের ‘পানি’ সংখ্যাগুরু হিন্দুর পশ্চিমবঙ্গে জায়গা পায় না৷ সাঁওতালের অলচিকির মূলস্রোতের সংস্কৃতিতে দাম নেই৷ ক্ষমতাবানের সংস্কৃতি সবসময়ই চেষ্টা করে, আরো অনেক কিছুর মতোই এক ধরনের হোমোজেনিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার৷ ভাষা তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র৷ সম্ভবত সে কারণেই, এক শতক আগে বিবেকানন্দ মনে করেছিলেন, বাংলা ভাষার একটি গ্রহণযোগ্য ভার্সন হওয়া দরকার৷ যা সকলে মেনে চলবে৷ বিবেকানন্দ কলকাতার বাংলাকে সেই গ্রহণযোগ্য পথ বলে মনে করেছিলেন৷ দিন যত গড়িয়েছে, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির নানা উত্থানপতনে কলকাতা আর ঢাকার বাংলা আলাদা হয়েছে৷ নিজ নিজ অঞ্চলে নিজেদের মতো করে ভাষা তার সংস্কৃতির প্রতাপ বিস্তার করেছে৷

অথচ ঠিক উল্টোটাই হওয়ার কথা ছিল৷ পৃথিবীর সমস্ত দেশের অধিকাংশ ভাষাবিদই মনে করেন, ভাষা নদীর মতো৷ যতক্ষণ স্রোত আছে, ভাষাও ততক্ষণ বেঁচে আছে৷ সেখানে নানা ডায়লেক্ট, নানা বিদেশি শব্দ মিশবে, তবেই না তা কল কল করে বইবে! যে বাংলায় আমরা কথা বলি, তাতে যে পরিমাণ ফার্সি, পর্তুগিজ, ডাচ, ইংরেজি এবং ফরাসি শব্দ আছে, ভারতের বহু ভাষাতেই তা নেই৷ বাংলায় উর্দুর প্রভাব আছে, হিন্দিরও আছে৷ এই প্রভাব ভাষাকে পিছিয়ে দেয়নি, বরং এগিয়ে দিয়েছে৷ এই বাংলার বৈষ্ণব পদকর্তাই বাংলা আর মৈথিলির মিশেলে ব্রজবুলি ভাষায় একের পর এক অবিস্মরণীয় পদ লিখে গেছেন৷ কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেননি৷ গতিশীলতা আছে বলেই বাংলা ভাষা এখনো আগ্রাসী হিন্দি সংস্কৃতির সঙ্গে লড়াই করতে পারে৷

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সেই গতি হারিয়ে ফেলছে৷ বেনীআসহকলার রামধনুকে সেকুলার করতে গিয়ে আমরা 'রংধনু’ করছি একদিকে, অন্যদিকে, আসমানি, পানি, আব্বা, আম্মির মতো শব্দকে চ্যালেঞ্জ করছি সংকীর্ণ হিন্দু প্রাদেশিকতা থেকে৷ আর এ সব করতে গিয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি, এই বাংলাতেই ফারসি আর সংস্কৃত শব্দ পাশাপাশি বসে তর তর করে এগিয়ে চলে৷ আমরা সাদ্রিকে ভুলে যাচ্ছি, ডায়লেক্টকে জলাঞ্জলি দিচ্ছি৷ রেডিওর ভাষাকে বাংলিশ বলছি, মজুরের ভাষাকে পাতে নিচ্ছি না৷ বাংলা ভাষা বিশ্বজনিনতা হারাচ্ছে৷

মোহনার কাছে নদীর স্থবির স্রোত চরা তৈরি করে৷ আমাদের ভাষাও সেই চরায় আটকে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত৷ মনের জানলাগুলো খুলে না দিলে সেই স্থবিরতা কাটার কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন