যে দেশে ‘ভিআইপিদের’ চাপে সাধারণের চলা দায় | বিশ্ব | DW | 12.03.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

যে দেশে ‘ভিআইপিদের’ চাপে সাধারণের চলা দায়

কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে মাইক্রোবাসে বসে আছি৷ সিরিয়ালে সামনের দিকে অবস্থান৷ রাতে ফ্লাইট৷ তাই, সামনের দিকে থাকায় দ্রুত ঢাকা পৌঁছানোর ব্যাপারে খানিকটা স্বস্তি কাজ করছিল৷ চালকও কয়েকবার বললেন, ছয়টা গাড়ি নিলেও আমাদেরটা যাবে৷

কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই খেয়াল করলাম চালকের ধারণায় ভুল ছিল৷ যে ফেরিটি এসেছে, সেটি বেশ ছোট৷ ফেরিটি থেকে গাড়ি নামার পরেই ঘাটের কর্তৃপক্ষ জানালো আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের গাড়ি তোলা হবে না৷ কোনো এক ‘ভিআইপি' যাবেন সে ফেরিতে৷ মুহূর্তেই আমাদের অনেক পেছন থেকে সেই ভিআইপি তাঁর গাড়িবহর নিয়ে ফেরিতে উঠে গেল৷ ফেরিতে জায়গা থাকা সত্ত্বেও আর কোনো গাড়ি না নিয়েই সেটি ঘাট ছাড়লো৷

আমার ভাড়া করা গাড়ির চালককে জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কী হলো! তিনি বললেন, শুধু ‘ভিআইপিরা' এরকম সুবিধা পান৷ খানিকটা মন খারাপ করলাম৷ কিন্তু, ঘাটে থাকা একজন আস্বস্ত করলেন, পরের ফেরিতে আপনাদের নিশ্চয়ই জায়গা হবে৷

পরের ফেরি আসতে অবশ্য খুব একটা দেরি করেনি৷ আগেরটার চেয়ে বড় ছিল সেটি৷ কিন্তু এবার সামনের কয়েকটি গাড়ি ওঠার পর আমারটা যখন উঠবে, ঠিক তখন আবারো বাধা৷ ফেরিঘাটের দু'জন এসে জানালেন, আমাদের গাড়ি এখন উঠতে পারবে না৷ কারণ, আরেক ভিআইপি আসছেন৷ তিনি ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের' কর্মকর্তা৷ তবে, তাঁর গাড়িবহর ওঠার পর জায়গা থাকলে আমাদের উঠতে দেয়া হবে৷

আমি তখন যথেষ্টই বিরক্ত৷ আমার চালক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে দুই পুলিশ সদস্য আমাদের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গেছেন৷ ফলে আমাদের ফেরিতে ওঠার পথ বন্ধ৷ চালক জানালেন, আগের ফেরিতে নাকি ‘গণভবনের' এক কর্মকর্তা গেছেন৷ গণভবনে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঠিক কতজন চাকরি করেন আমি জানিনা৷ তবে, তাঁদের সবাই যদি এরকম ‘ভিআইপি মর্যাদা' নিয়ে চলাফেরা করেন, তাহলে পরিস্থিতিটা যে সাধারণ মানুষের জন্য তেমন একটা সুখকর নয়, সেটা অনুধাবন করতে পারছিলাম৷

যাহোক, ভিআইপি'র গাড়িবহর ওঠার পর দেখলাম তাঁর বহরে থাকা পুলিশ ফেরির ব়্যাম্প বা পাটাতন তুলে দিতে বলছেন৷ অন্যদিকে ঘাটের একজন এসে বললেন, দেখলেন ফেরিতে আরো তিনটা গাড়ি তোলার সুযোগ ছিল৷ কিন্তু ভিআইপির দরজা খুলে বের হতে সমস্যা হবে বলে পুলিশ আর গাড়ি তুলতে দেবে না৷

আমি তখন গাড়ি থেকে বের হয়ে পুলিশের এক সদস্যকে জানালাম যে আমি একজন সাংবাদিক৷ আমারও ঢাকা যাওয়া জরুরি৷

পুলিশের সঙ্গে অল্প কথাতেই পরিস্থিতি বদলে গেল৷ ভিআইপির বহরের একটি গাড়ি কিছুটা সরিয়ে ফেরিতে আমার গাড়ি তোলা হলো৷ সঙ্গে সম্ভবত আরো দুয়েকটি গাড়ি ওঠার সুযোগ পেয়েছিল৷ কিন্তু আমার তখন খারাপ লাগছিল এই ভেবে যে সাধারণভাবে যে সুযোগটা আমার প্রাপ্য ছিল সেটা নিতে হলো নিজের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে৷

শুধু ফেরিঘাটে নয়, বাংলাদেশে চলাফেরা করলে এরকম অসংখ্য ‘ভিআইপির' দেখা মেলে৷ এই যে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে এত কথা হচ্ছে, আমি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে একাধিকবার দেখেছি ক্ষমতাসীন দলের ‘বড় নেতারা’ কোনো রকম নিরাপত্তা তল্লাশির ধার না ধেরে হেঁটে চলে যাচ্ছেন৷ এমনকি তাঁদের সহকারীরাও সঙ্গে চলে যান৷ ওখানকার নিরাপত্তা প্রহরীরা তাঁদের গায়ে হাত দিয়ে পরীক্ষার সাহসও করেন না৷ এমনকি এমন ভিআইপিদের জন্য অভ্যন্তরীণ বিমানের উড়ালে বিলম্বও ঘটানো হয়৷  

Arafatul Islam Kommentarbild App

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় হচ্ছে ভিআইপিরা যেমন কারণে অকারণে নানা সুবিধা পান, তেমনি জরুরি হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন এমন রোগীদের নিয়ে এম্বুলেন্স ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়৷ এম্বুলেন্সে সাইরেন বাজা সত্ত্বেও চলতি রাস্তাতে কোনো গাড়িকে দেখি না সেটিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে৷ অথচ সবার উচিত এধরনের ক্ষেত্রে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়া৷  

জানি, দেশে যাঁরা থাকেন, তাঁদের কাছে হয়ত বিষয়গুলো চোখ সওয়া হয়ে গেছে কিংবা এগুলোই স্বাভাবিক৷ আর আমি একযুগ ধরে বাইরে বলে হয়ত একটু বেশিই দেখি সেসব৷ এক্ষেত্রে, জার্মানির অভিজ্ঞতা না জানালেই নয়৷ এখানে গাড়ি চালানোর সময় একটি নিয়ম খুব কঠোরভাবে পালন করতে হয়৷

শহরের মধ্যে জরুরি সাইরেন বাজিয়ে এগিয়ে আসা এম্বুলেন্স, পুলিশ কিংবা দমকল বাহিনীর গাড়িকে জায়গা করে দিতে অবশ্যই রাস্তা ফাঁকা করে দিতে হবে৷ এধরনের ক্ষেত্রে সাধারণ গাড়ির চালকরা তাদের গাড়ি রাস্তার ডানে বা বামে একদিকে পুরোপুরি সরিয়ে নিয়ে রাস্তার মাঝখানটা খালি করে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, যাতে সাইরেন বাজানো গাড়িটি দ্রুত চলে যেতে পারে৷

আর শহরের বাইরে, মানে মহাসড়কে সবসময় একটি লেন ফাঁকা রাখা হয় জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য৷ সেই লেন শুধুমাত্র কোনো গাড়ি বিপদে পড়ে দাঁড়ালে কিংবা অন্যান্য জরুরি সেবাদাতারা প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন৷ আর এদেশে সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা আইনপ্রণেতারা সড়ক, মহাসড়কে ভিআইপি হিসেবে আলাদা কোনো মর্যাদা পান না৷ এমনকি খোদ চ্যান্সেলরেরও নিজের বাজার নিজে করেন৷

তবে, একান্ত বড় কোনো সম্মেলন যদি হয়, যেখানে বিশ্বের বড় বড় দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানরা আসছেন, তখন রাস্তাঘাটে চলাচলের ক্ষেত্রে সীমিত সময়ের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয় বটে তবে সেটা আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে করা হয়৷ আগে থেকে না জানিয়ে সাধারণ জনতাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে কোনো ভিআইপিকে সেবা দেয় না জার্মান কর্তৃপক্ষ৷

এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি বলেই বাংলাদেশে গেলে হয়ত অনিয়মগুলো একটু বেশিই চোখে পড়ে৷ মনের অজান্তেই জার্মানির সঙ্গে নিজের দেশকে তুলনা করে ফেলি৷ আশা করি, আমাদের দেশেও সাধারণ মানুষের গুরুত্ব বাড়বে৷ ‘ভিআইপি' তকমা দিয়ে কিছু মানুষকে হঠাৎ সমাজের উঁচু শ্রেণিতে তুলে দেয়া হবে না৷

লেখকের মতো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কেউ হয়েছেন? থাকলে লিখুন মন্তব্যের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন