যে আইনে হেফাজতে নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করলেন কার্টুনিস্ট কিশোর | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 14.03.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

যে আইনে হেফাজতে নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করলেন কার্টুনিস্ট কিশোর

নির্যাতনের শিকার আহমেদ কবির কিশোরের মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)৷ ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনের আওতায় মামলাটি করেন নির্যাতনের শিকার এই কার্টুনিস্ট৷

কিশোরের মামলায় মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ রবিবার আদেশ দেন৷ গত বছরের ৫ মে বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়৷ মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, তার তিনদিন আগে ২ মে বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে বাসা থেকে সাদা পোশাকধারী ১৬/১৭ জন লোক তাকে মুখোশ পরিয়ে, হাতকড়া লাগিয়ে, নির্জন অচেনা জায়গায় নিয়ে যায়৷ এরপর ২-৩ মে পর্যন্ত তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়৷ বিচারক পিবিআইকে দেয়া তদন্তের আদেশে লিখেছেন:

১. তদন্ত কর্মকর্তা হতে হবে পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার নিচে নয় এমন কোনো কর্মকর্তা৷
২. তিন সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে কিশোরের নাক, কান, গলা কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্যান্য জখমের বিষয়ে যথাযথ অনুসন্ধান করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে৷
৩. আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে পিবিআইকে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে৷

এই মামলায় কিশোরের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়াকে ফোনে পাওয়া না গেলেও তিনি তার ফেসবুক পোস্টে এই আদেশের বিষয়ে জানান৷ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর তাপস কুমার পালও আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘এই আইনটি একটি আন্তর্জাতিক আইন৷ ফলে এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে৷ কিশোরের মামলায় কাউকে নাম উল্লেখ করে আসামি করা না হলেও এখন তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব হচ্ছে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা৷ আর তিনি যে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন তা নিশ্চিত হতেও মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে৷ কারা তদন্ত করতে পারবে তাদের পদমর্যাদাও উল্লেখ করা হয়েছে৷’’

কী আছে আইনে
আইনটির শুরুতেই বলা হয়েছে, নিউ ইয়র্কে ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার অথবা দণ্ডবিরোধী একটি সনদ স্বাক্ষর হয়েছে৷ বাংলাদেশও ওই সনদের অংশীদার৷ তাই আইনটি করা হয়েছে৷

অডিও শুনুন 03:06

অভিযোগকারীকে মামলা প্রমাণ করতে হবে না: ইশরাত হাসান

আরো বলা হয়েছে, ‘‘যেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার ও দণ্ড মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং যেহেতু জাতিসংঘ সনদের ২(১) ও ৪ অনুচ্ছেদ নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর ব্যবহার ও দণ্ড অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করে নিজ নিজ দেশে আইন প্রণয়নের দাবি করে৷’’

বাংলাদেশে এই আইনে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি মামলার বিচারের উদাহরণ আছে৷ মামলাও হয়েছে অনেক কম৷ ২০১৩ সালে আইনটি পাশ হওয়ার পর ২০১৪ সালে মিরপুরের পল্লবী এলাকায় জনি নামে এক ব্যক্তি পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে মারা যান৷ তার পরিবার এই আইনে মামলা দায়ের করেন৷ ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আদালত পল্লবী থানার তখনকার এসআই জাহিদুর রহমান জাহিদ, এসআই রশিদুল ইসলাম এবং এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টুসহ এই তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন৷ তাদের দুইজন সোর্সকে দেয়া হয় সাত বছরের কারাদণ্ড৷

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, ‘‘এই আইনটির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলে যিনি ভুক্তভোগী বা অভিযোগকারী তাকে মামলা প্রমাণ করতে হবে না৷ তিনি অভিযোগ করার পর অভিযুক্তদেরই প্রমাণ করতে হবে তারা অপরাধী নন৷ প্রমাণে ব্যর্থ হলে তারা দোষী সাব্যস্ত হবেন৷’’

তার মতে, হেফাজতে নির্যাতন বা মৃত্যুর ঘটনা যেহেতু বাইরে ঘটে না তাই অভিযোগকারীর কাছে প্রমাণ সাধারণভাবে থাকে না৷ ফলে এই আইনের সুবিধা হলো অভিযোগকারীকে প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করতে হয় না৷ অন্যদিকে ডাক্তারি পরীক্ষাতেই নির্যাতন প্রমাণ হয়৷

এই আইনে সাধারণভাবে আদালতেই মামলা করতে হয়৷ আর পুলিশের কাছে করতে হলে সর্বনিম্ন এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তার কাছে করতে হবে৷ যদি এসপির বিরুদ্ধেই অভিযোগ হয় তাহলে তার উপরের কর্মকর্তার কাছে করা যাবে৷

শুধু পুলিশ নয়, হেফাজতে নেয়ার ক্ষমতাবান সরকারের যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেই মামলা করা যাবে, এমনকি সিভিল প্রশাসনের হলেও৷

তবে পুলিশ শুরু থেকেই এই আইনটির বিরোধিতা করে আসছে৷ আইন পাশের সময় তো করেছেই এমনকি প্রতিবছর পুলিশ দিবসে তারা এই আইনটি বাতিল বা সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছে৷ তাপস কুমার পাল বলেন, ‘‘হেফাজতে নির্যাতন এখানে একটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে৷ কাউকে আটকের সময় এবং আটকের পরে নির্যাতনের অনেক অভিযোগ পাওয়া যায়৷ সে কারণেই পুলিশ এই আইনটি চায় না৷’’

অডিও শুনুন 00:46

সাধারন মানুষ আইনটি সম্পর্কে জানেন না: তুহিন হাওলাদার

মামলা কেন কম?
প্রচারের অভাব এবং ভয়ের কারণে এই আইনে মামলার সংখ্যা খুবই কম৷ আবার অনেকেই এই আইনটির বিষয়ে জানেন না৷ তাই যারা মামলা করেন তারা দণ্ডবিধির অন্য ধারায় মামলা করেন, যাতে বিচার পাওয়া খুবই জটিল৷

মিরপুরের পল্লবীর ঘটনায় তিন পুলিশ কর্মকর্তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ার পর আইনটি কিছুটা আলোচনায় আসে বলে জানান অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর৷

অ্যাডভোকেট তুহিন হাওলাদার বলেন, ‘‘হেফাজতে মুত্যু বা নির্যাতনের যাতে ন্যায় বিচার মানুষ পায় সেই জন্যই এই আইনটি করা হয়েছে৷ কিন্তু সাধারণ মানুষ আইনটি সম্পর্কে জানেন না৷ এটা নিয়ে কোনো প্রচারের ব্যবস্থা নাই৷ এই ধরনের যে একটা আইন আছে সেটা অনেকে জানেনই না৷ আর পুলিশও শুরু থেকেই এই আইনটির বিরুদ্ধে থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে৷’’

মামলা করার পর পরই আদালত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও তাকে সুরক্ষার আদেশ দেবেন আইনে এমনটা বলা হয়েছে৷ আর এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণেরও বিধান আছে৷ বিচার কাজ শেষ করতে হবে ১৮০ দিনের মধ্যে৷ বিচার হবে দায়রা জজ আদালতে৷

গত ১০ মার্চ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশের আদালতে মামলার আবেদন করেন কার্টুনিস্ট কিশোর৷ আদালত তার জবানবন্দি গ্রহণ করে নথি পর্যালোচনা শেষে রবিবার আদেশের জন্য রেখেছিলেন৷

কিশোর গত ৪ মার্চ জামিনে মুক্তি পান৷ এখন তিনি চিকিৎসাধীন আছেন৷ একই সময়ে আটক লেখক মুশতাক আহমেদ কারা হেফাজতে মারা যান ২৫ ফেব্রুয়ারি৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়