যেসব কারণে দেশি শিল্পীরা ‘ভিখারি’ | আলাপ | DW | 06.12.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

মতামত

যেসব কারণে দেশি শিল্পীরা ‘ভিখারি’

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কিংবদন্তি সংগীত শিল্পীদের সরকারি অনুদান পেতে দেখা যাচ্ছে৷ লাকি আখন্দ, আব্দুল জব্বার, সুজেয় শ্যাম, কাঙ্গালিনী সুফিয়া, সাবিনা ইয়াসমিন, কুদ্দুস বয়াতি, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলসহ অনেকের নামই এসেছে তালিকায়৷

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

গীতিকার, সুরকার আলাউদ্দিন খান এখনো চিকিৎসাধীন৷ শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতেও দেশে বিদেশে চলছে নানা উদ্যোগ৷

প্রচণ্ড ভালোবাসা অর্জন করে যারা দিনের পর দিন শ্রোতাদের মনে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হন, বয়সের সাথে সাথে কাজ কমে গেলে অথবা হঠাৎ অসুস্থ হলে তাদেরই আবার ভক্তদের কাছে চিকিৎসা সাহায্যের জন্য হাত পাততে হয়৷ অথচ পাশের দেশ ভারতেও যৌবনের সোনালি সময়ে তৈরি করা জনপ্রিয় শিল্পকর্মগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে থাকে শিল্পীর মৃত্যুর পরও৷ আর ডি বর্মণ, সলিল চৌধুরী, কিশোর কুমার, মান্না দের মতো শিল্পীদের মৃত্যুর পরও তাদের পরিবারের সদস্যরা পূর্বসূরির গানের রয়্যালটির টাকা পাচ্ছেন৷

প্রশ্ন আসে, আমাদের দেশে তার উল্টো চিত্র কেন? তবে কি আমাদের শিল্পীদের এত এত জনপ্রিয় সৃষ্টকর্ম বাণিজ্যিকভাবে সফল নয়? সব টাকা তারা অপচয় করেন? নাকি ডিজিটাল যুগে ফাঁকির মারপ্যাঁচে শিল্পীর উপার্জন চলে যাচ্ছে অন্য কারো হাতে? 

একজন শিল্পী হিসেবে সিনিয়র শিল্পীদের এই পরিণতি আমাকে মর্মাহত করে৷ আমি নিজে ২০০৬ সাল থেকে আমার অনেক গানের রয়্যালিটি থেকে বঞ্চিত হয়েছি৷ অধিকার আদায়ের জন্য যেমন মামলা করেছি, তেমনি দেশের গীতিকার, সুরকারদের অধিকার বাস্তবায়নে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থও হয়েছি৷ আমার বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করছি৷

বাংলাদেশে মেধাস্বত্ব ও কপিরাইট আইন

কপিরাইট অফিস ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়৷ প্রতিষ্ঠাকালে আঞ্চলিক কপিরাইট অফিস নাম থাকলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস নামকরণ করা হয়৷ শুরু থেকেই দেশে কপিরাইট আইন প্রচলিত আছে, যা ২০০৬ সালে সর্বশেষ সংশোধন করে যুগোপযোগী করা হয়

আইনটি পড়লে সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন সংগীতসহ সকল শিল্প কর্মের বিপণন ও মালিকানার বিস্তারিত বর্ণনা আছে৷ আইনে মূল মালিকানা গীতিকার, সুরকারের থাকলেও কণ্ঠশিল্পীরা পারফর্মিং রাইটস রাখেন৷ এই তিনজনের সাথে কোনো প্রতিষ্ঠান আর্থিক বা পরিবেশনার চুক্তিতে কপিরাইট অংশীদার হতে পারেন, কিন্তু গীতিকার, সুরকারের মেধার কোনো শেয়ার বা বিক্রি কখনোই হবে না৷ কপিরাইট আইনের অধ্যায় ৪-এর ১৯-এর ১ ধারায় সুস্পষ্ট বলা আছে,

১৯ স্বত্ব নিয়োগের ধরন (১) কোনো ( সংগীত)কর্মের কপিরাইটের স্বত্ব নিয়োগ বৈধ হইবে না, যদি তাহা স্বত্ব প্রদানকারী বা তাহার নিকট হইতে যথাযথভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি দ্বারা স্বাক্ষরিত না হয়৷

কপিরাইট অফিসের আয়োজনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীর অংশগ্রহণে আমরা সকল শিল্পী মিলে বারবার এই আইনটির প্রয়োগ ও জটিলতা নিরসনের চেষ্টা করেছি৷ আজকে যারা অনুদান নিচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগ শিল্পিই তখন সেই সভা সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছিলেন৷

অপরাধীচক্র এতটাই শক্তিশালী, আইন থাকলেও তাদের পেশীশক্তি আদালত পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় আজ পর্যন্ত একটি সংগীত মেধাস্বত্ব মামলারও রায় হয়নি৷ জেমস ও মাইলসের মামলা রায় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে অপরাধ জনসসক্ষে প্রকাশিত হবার আগেই আপোষ করে মিটিয়ে ফেলা হয়েছে৷ আমার মামলাটির আপোষ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে ৪ কোটি টাকা৷ ২০১৬ সাল থেকে তাদের সকল সংগীত বাণিজ্যে আমাকে অলিখিতভাবে বয়কট করা হয়েছে৷

বহুজাতিক মোবাইল অপারেটরদের প্রতারণা

বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের নিযুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পীর গানের ডিজিটাল বিপণন শুরু করে ২০০৪ সালে৷ ডাউনলোড, আরবিটি, সিবিটি, ডাব্লিউএপি, লাইভ স্ট্রিমিং, মোবাইল, রেডিওসহ প্রায় ১১টি মাধ্যমে গানগুলো তারা বিক্রি শুরু করেন৷ ধীরে ধীরে অডিও প্রযোজনা সংস্থা ও শিল্পীরা অভিযোগ শুরু করলে ব্যাক্তি বিশেষে সমঝোতা করলে তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে৷ মুলত কপিরাইট আইনের তোয়াক্কা না করে একজন শিল্পীর আইনত অনুমোদন ছাড়াই শিল্পীর স্বাক্ষর জালিয়াতি বা ভুয়া চুক্তি করে বিক্রি অব্যাহত রেখেছেন৷ 

আমার হিসেবে দেশের ৫ টি মোবাইল অপারেটর ও একশ'র বেশি দেশি-বিদেশি কন্টেন্ট প্রোভাইডার মিলে বছরে প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার সংগীতসম্পর্কিত ব্যবসা করেন৷ একটি টেলিভিশন প্রতিবেদনে কন্টেন্ট প্রোভাইডার সংগঠনের বর্তমান সভাপতি রাফিউর রহমান খান স্বীকার করেন সংগীতে দেশে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাজার রয়েছে৷

আমার কপিরাইট মামলার পর অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো তা তুলে নেয়ার আপোষপ্রস্তাবের আলোচনায় আসতে বলে৷ সম্প্রতি তারা প্রায় ৪০ হাজার গান তাদের লাইব্রেরি থেকে লুকিয়ে ফেলেছে, যা ২০০৬ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়েছে৷ এই টাকাগুলোর ৯০% কোনো শিল্পীর হাতে আসেনি৷

পেশিশক্তি ও হয়রানি

বহুজাতিক মোবাইল অপারেটরগুলোর বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ৷ দেশের শতাধিক তারকা ব্যারিস্টার তাদের অফিসিয়াল আইনজীবী৷ একজন সাধারণ শিল্পীর পক্ষে একঝাঁক দানবের বিরুদ্ধে নিজের আবেগবশত তৈরি করা সৃষ্টির অধিকার নিয়ে যুদ্ধে নামা সম্ভব হয় না৷

অন্যদিকে অডিও সিডি বাজার বিপন্ন হবার পর মোবাইল অপারেটরগুলোই ডিজিটাল মাধ্যমে দেশের ৯৯ ভাগ গানের বাজার ও রেডিও, টেলিভিশনের অধিকাংশ সংগীতানুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে৷ যখনই কোনো শিল্পী কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, তখনই ঐ শিল্পীর সকল ধরনের আয় বন্ধ হয়ে যায়৷   

বিচারহীনতা, ঘুস ও দুর্নীতি

মোবাইল অপারেটরগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি৷ এ পর্যন্ত কয়েকশত শিল্পী এই দুটো প্রতিষ্ঠানের মন্ত্রী ও সচিবদের কাছে একাধিকবার নানা পর্যায়ে সাক্ষাৎ করে অভিযোগ করেছেন৷ আমি নিজে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে প্রমাণসহ অভিযোগ করেছি৷ কিন্তু অজানা কারণে আজও সেই অভিযোগের কোনো উত্তর মেলেনি৷ গোপনে জেনেছি, মোবাইল অপারেটরগুলোর অর্থের দাপটের কাছে সব কর্মকর্তাই বিক্রি হয়৷ মন্ত্রী পরিবর্তন হয়, বিটিআরসির চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়, কিন্তু কোনো অভিযোগের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না৷

অসঙ্গতি

পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ডিজিটাল সংগীত প্ল্যাটফর্ম স্পটিফাই একটি গান বিক্রির টাকা থেকে শিল্পীদের রয়্যালিটি প্রদান করে ৭০ শতাংশ, ইউটিউব এতবড় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম মেন্টেন করে শিল্পীকে রয়্যালিটি প্রদান করে ৫৫ শতাংশ৷ 

Bangladesch | Sänger Pritom Ahmed

প্রীতম আহমেদ, সংগীত শিল্পী

অথচ বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটরগুলো প্রথমেই একটি গানের আয় থেকে ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ টাকা কেটে রাখে কমিশন হিসেবে৷ পৃথিবীর যে-কোনো দেশের শিল্পীদের কাছে এটা বিস্ময়কর৷ দেশের একমাত্র বড় ডিজিটাল সংগীত বিতরণমাধ্যম ঐ ৭০ শতাংশ রাখার পর অগ্রিম ১০% ট্যাক্স ও ৬.৫% আরডিটিএফ কেটে রেখে বাকি ৩০% বা ২৫% প্রদান করে সিপি নামে তাদেরি ঠিক করা একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে৷ এবার ৩০%-এর অর্ধেক চার ভাগে ভাগ করে নেন প্রযোজক, গায়ক, গিতীকার, সুরকার৷ অবশেষে দেখা যায়, ডিজিটাল মাধ্যমে একটি গান ১০০ টাকা বিক্রি হলে গানটির মূল মালিক গীতিকার, সুরকার ,গায়ক বা প্রযোজকরা প্রত্যেকে পান ২ থেকে ৩ টাকা৷ ফলে গান যতই জনপ্রিয় বা ব্যবসাসফল হোক, তার অধিকাংশই চলে যায় অপারেটর ও মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে৷ শিল্পীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে জাতীয় পুরষ্কার ও সরকারি অনুদান৷

অনুদান নয়, বরং অনিয়ম বন্ধ করার কার্যকর নির্দেশ প্রয়োজন৷ অন্তত একটি মামলার আদালতের রায় প্রয়োজন৷ অবৈধভাবে অনুমতিহীন গান বিক্রি বন্ধ করার নির্দেশনা প্রয়োজন৷ তাহলেই অপরাধীরা শিল্পীদের টাকা লুট করা বন্ধ করবে৷ দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে শিল্পীদের ৭০% রয়্যালিটি নিশ্চিত করতে হবে৷ তবেই একজন শিল্পী সুস্থ ও সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারবে৷

প্রিয় দর্শক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন