ময়মনসিংহের কয়েকটি দর্শনীয় স্থান
‘হাওর-জঙ্গল-মইষের শিং, এই তিনে ময়মনসিংহ’ এভাবেই এক সময় পরিচয় করানো হতো ভারতবর্ষের বৃহত্তম জেলা ময়মনসিংহকে৷ ২০১৫ সালে দেশের অষ্টম বিভাগ হিসেবে ঘোষণা পাওয়া বিস্তীর্ণ এ জনপদ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্রের লীলাভূমি৷

আলেকজান্ডার ক্যাসেল
স্থানীয়ভাবে ‘লোহার কুঠি’ নামে পরিচিত প্রাসাদটি মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য্য ১৮৭৯ সালে নির্মাণ করেন৷ তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এম এস আলেকজান্ডারের স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি প্রাসাদটি শহরের কেন্দ্রস্থল কোট-কাচারি এলাকায় নির্মাণ করেন৷ বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লর্ড কার্জন, নবার স্যর সলিমুল্লাহসহ বরেণ্য ব্যক্তিরা সেখানে গিয়েছেন৷ বর্তমানে এটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে৷
মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ
ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এটি অবস্থিত৷ মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের ১৯ সদস্য প্রাণ হারান৷ তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়৷
শহিদ স্মৃতিসৌধ
মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে শহিদ স্মৃতিসৌধ বা স্মৃতিস্তম্ভ৷ শম্ভুগঞ্জে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর কাছে এ স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয় ২০১৩ সালে৷ ৫০ ফুট উঁচু স্তম্ভটি দাঁড়িয়ে আছে মশাল আকৃতিতে৷ সৌধটির চারদিকের চারটি দেয়ালে রয়েছে চার-রকমের প্রাচীরচিত্র৷ ভাষা আন্দোলন, ৬৬-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিমূর্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দেয়াল চারটিতে৷
কেওয়াটখালি ব্রিজ
ময়মনসিংহের তিনটি রেলব্রিজের অন্যতম হচ্ছে কেওয়াটখালি ব্রিজ৷ প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ এ ব্রিজটি ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ১৯১৫ সালে নির্মিত হয়৷ ময়মনসিংহের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও ভৈরবের রেল যোগাযোগের সুবিধার্থে এটি তৈরি করা হয়৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় বোমার আঘাতে সেতুর তিনটি খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ বর্তমানে সেতুর উপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই তিনটি আন্তঃনগর, দুটি মেইল, দুটি কমিউটার এবং আটটি লোকাল ট্রেন চলাচল করছে৷
ব্রহ্মপুত্র নদ
ময়মনসিংহের প্রাণ ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বনাম ছিল ‘লৌহিত্য’৷ উত্তরের কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে এ নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে ময়মনসিংহ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরববাজারের দক্ষিণে মেঘনায় পড়েছে৷ উৎপত্তিস্থল থেকে এ নদের দৈর্ঘ্য দুই হাজার ৮৫০ কিলোমিটার৷ বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদই সবচেয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে৷
শশী লজ
মুক্তাগাছার জমিদার বংশের উত্তরসূরি নিঃসন্তান মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরি তার দত্তকপুত্র শশীকান্তের নামানুসারে ময়মনসিংহ শহরে ‘শশী লজ’ নামে একটি দ্বিতল বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেন৷ প্রবেশ তোরণ ধরে প্রায় ৯ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত প্রাসাদটির দিকে যেতে থাকলে চোখে পড়বে মার্বেল পাথরে তৈরি একটি সুন্দর ভাস্কর্য৷ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ১৯৮৯ সালে এ ভবনটিকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণা করে৷
গার্লস ক্যাডেট কলেজ
ময়মনসিংহ-ভালুকা সড়কের সেহড়াতে অবস্থিত ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য স্থাপিত প্রথম ক্যাডেট কলেজ৷ ২৩ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হয় ১৯৮৩ সালে৷ স্বাধীনতাপূর্ব চারটি ক্যাডেট কলেজের সাফল্যের প্রেক্ষিতে আরও ছয়টি কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে এটি একটি৷ ১৯৮২ সালে ‘ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ফর গার্লস’কেই পরবর্তীতে ক্যাডেট কলেজে পরিণত করা হয়৷
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
কৃষি বিষয়ক উচ্চতর এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ময়মনসিংহ শহরে অবস্থিত৷ দেশের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬১ সালে ভেটেরিনারি কৃষি অনুষদ নামের দুটি অনুষদ নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে৷ বাউ-৬৩, বাউধান, কমলা সুন্দরী আলুর জাত, গবাদিপশুর ভ্রুণ প্রতিস্থাপন, ছাগল ও মহিষের কৃত্রিম প্রজনন, বিভিন্ন উন্নত কৃষিযন্ত্রসহ কৃষি গবেষণায় ঈর্ষণীয় অবদানের স্বাক্ষর রেখেছে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি৷
বিমূর্ত মুক্তিযুদ্ধ
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পেরোলেই এটি চোখে পড়বে৷ এর মাধ্যমে একুশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত বাংলাদেশে সংঘটিত সকল ঐতিহাসিক ঘটনার বিমূর্ত উপস্থাপন করা হয়েছে৷
মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি
শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে মুক্তাগাছায় এটি অবস্থিত৷ এটি ‘মুক্তাগাছা রাজবাড়ী’ নামেও পরিচিত৷ এতে দূর্গামন্দির, তোষাখানা, ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চ, শিবমন্দির, জোড়ামন্দির রয়েছে, যা তৎকালীন ঐতিহ্য বহন করে৷ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৯৩ সালে বাড়িটিকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণা করে৷
থানাঘাট মন্দির
ময়মনসিংহ শহরে অবস্থিত প্রাচীন একটি মন্দির এটি৷ মন্দিরটি শহরের জুবিলী ঘাট সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত৷ স্থানীয়দের মতে, মন্দিরটি প্রায় ১৩০ বছরের পুরনো৷
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ
ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়া এলাকায় অবস্থিত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল৷ প্রায় ৮৪ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই কলেজ ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়৷ কলেজে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা প্রায় ১,৪০০টি৷
সার্কিট হাউজ
ময়মনসিংহ শহরে অবস্থিত সার্কিট হাউজের মাঠ ময়মনসিংহের একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান৷ এর পাশেই রয়েছে আরও দুটি দর্শনীয় স্থান, ডিসি পার্ক এবং জুবিলী ঘাট সংলগ্ন বিপিন পার্ক৷
লালকুঠি দরবার শরীফ
আনুমানিক ১৯২২ সালে এটি নির্মিত হয়৷ ব্রিটিশ ডেভিড কোম্পানি কর্তৃক নির্মিত এ ভবনটি ছিল কোম্পানির পাটের অফিস৷ পরবর্তীতে বিভিন্ন ঘটনাক্রমে এই দরবার শরীফের উৎপত্তি৷ ময়মনসিংহ শহরের শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বপাড়ের এ দরবার শরীফে রয়েছে ইসলাম প্রচারক আল্লামা শাহ সুফী খাজা মোঃ সাইফুদ্দিন এবং তার স্ত্রী জেবুন্নেসা সাইফের মাজার৷
চকবাজার মসজিদ
ময়মনসিংহের সবচেয়ে বড় মসজিদ চকবাজার জামে মসজিদ, যা ময়মনসিংহের বড়বাজার এলাকায় অবস্থিত৷ এখানে প্রায় দশ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন৷ সুদৃশ্য এবং বহুতল বিশিষ্ট এ মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি মাদ্রাসাও রয়েছে৷