মোদী সরকার ৩৭০ অনুচ্ছেদ এখন বাতিল করলো কেন? | আলাপ | DW | 16.08.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

মতামত

মোদী সরকার ৩৭০ অনুচ্ছেদ এখন বাতিল করলো কেন?

স্থায়ী বাসিন্দা নির্ধারণে রাজ্যের অধিকার বাতিল করার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘কাশ্মীরের মুক্তি' বলে বর্ণনা করলেও, কাশ্মীর এখন এক অবরুদ্ধ জনপদ৷

ভারতে বিজেপি সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সম্বলিত সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিল, রাজ্যকে দুইভাগে বিভক্ত করে সেগুলোকে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনস্থ করা এবং সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নির্ধারণে রাজ্যের অধিকার বাতিল করার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘কাশ্মীরের মুক্তি' বলে বর্ণনা করলেও, কাশ্মীর এখন এক অবরুদ্ধ জনপদ৷

যেভাবে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে, এর সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন আদালতে উঠবে৷ কেননা জম্মু-কাশ্মীরের ‘গণপরিষদের' সম্মতি ছাড়া এই অনুচ্ছেদ বাতিল করা যায় না, গণপরিষদ বাতিল হয়েছে ১৯৫৭ সালে; কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধান পরিবর্তন করে রাজ্যের বিধানসভার অনুমতির কথা বলেছে কিন্ত বিধান সভাও এখন স্থগিত, সেখানে চলছে রাষ্ট্রপতির শাসন৷ ফলে কেন্দ্রের নিয়োগপ্রাপ্ত রাজ্যপালের সম্মতিকেই বলা হচ্ছে ‘সম্মতি'৷ এর আগে ১৯৫৯ সালে থেকে অন্তত চারবার উচ্চ আদালতে ৩৭০ ধারার প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিবারই আদালত বলেছে এই অনুচ্ছেদ অস্থায়ী নয়, স্থায়ী৷ ফলে যেভাবে এই অনুচ্ছেদ বাতিল করা হল তা বিজেপি এবং মোদী সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার প্রমাণ হয়ে উঠলো৷

এই অনুচ্ছেদগুলো, বিশেষ করে ৩৫এ অনুচ্ছেদ, বাতিলের ব্যাপারে মোদী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, এগুলো কাশ্মীরের উন্নয়নের পথে বাধা ছিলো৷ এই যুক্তির পেছনে ৩৫এ অনুচ্ছেদে কাশ্মীরে জমি কেনা, সরকারী চাকুরি পাওয়ার ওপরে রাজ্যের যে সব বিধিনিষেধ কার্যকর ছিলো তার কথা বলা হচ্ছে৷

কিন্ত এই যুক্তি ধোপে টেকেনা৷ কেননা মানব উন্নয়নের সূচকের বিবেচনায় ভারতের ১৮টি রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরের চেয়ে পিছিয়ে আছে; জম্মু-কাশ্মীরে দারিদ্রের হার – ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, জাতীয় হার হচ্ছে ২১ দশমিক ৯২ শতাংশ; ২১টি রাজ্যের অবস্থা কাশ্মীরের চেয়ে খারাপ৷ জমির ওপরে রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ যদি অনুন্নয়নের কারণ হবে তা হলে হিমাচল প্রদেশ – যেখানে জমির ওপরে বিভিন্ন ধরণের নিয়ন্ত্রণ আছে - কি করে অন্যদের চেয়ে ভালো করে? বিহারে এই ধরণের নিয়ন্ত্রণ নেই – অথচ সেখানকার অবস্থা সকলের জানা আছে৷ এ যুক্তির কারণ খুব সহজ – ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চায় উন্নয়নের নামে, প্রকৃতি বিধ্বংসী প্রকল্প হাতে নিয়ে তা ব্যক্তি পুঁজির হাতে তুলে দিতে৷ ইতিমধ্যেই রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কোম্পানীর প্রধান মুকেশ আম্বানী নতুন দুই ইউনিয়ন টেরিটরিতে বিনিয়োগ করার ঘোষনা দিয়েছেন৷

বিজেপি কখনোই একথা আড়াল করেনি যে তাঁরা ৩৭০ এবং ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিল করে চায়৷ ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যদিও ‘স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার' প্রতিশ্রুতি ছিলো, ২০১৯ সালের ইশতেহারে সেই শর্ত তাঁরা আর রাখেনি৷ কেন বিজেপি এই সব অনুচ্ছেদের বিরোধী তা বুঝতে কষ্ট হয়না৷ হিন্দুত্ববাদের আদর্শের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে এমন এক ভারত তৈরি করা যেখানে পরিচয়ের পার্থক্য যেন আর না থাকে – হিন্দুত্বের পরিচয় হয়ে ওঠে মুখ্য; তাঁদের লক্ষ্য ভারতের পরিচয় হোক বৈচিত্রে নয় – হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে৷ সেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের জম্মু ও কাশ্মীরের আলাদা পরিচয় পথের কাঁটা৷ গো-রক্ষার নামে মুসলিমদের ওপরে হামলা, জয় শ্রীরাম ধ্বনিকে অস্ত্রে পরিণত করা, তালিকা করার নামে নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেয়া এবং ৩৭০ অনুচ্ছদে বাতিল অভিন্ন উদ্দেশ্য প্রণোদিত৷ যুদ্ধংদেহী উগ্র-জাতীয়তাবাদের যে এজেন্ডা সেখানে কাশ্মীরের অবস্থান কী সেই বিষয়ে বিজেপি কখনোই রাখঢাক করেনি৷ পুলওয়ামায় হামলার পটভূমিকায় বিজেপি এবং আরএসএস ‘দেশপ্রেমের' নামে বিভক্তির রেখা টেনে দিয়েছে৷ একদিকে ‘দেশপ্রেমিক ভারতীয়', অন্যদিকে ‘ঘরের শত্রু' – আরএসএসের করা এই বিভাজন আজকের নয়৷ কাশ্মীরের  জনমিতি বা ডেমোগ্রাফি বদলে দেয়াই যে ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিলের লক্ষ্য তা বোঝাও দুষ্কর নয়৷

হিন্দুত্ববাদের আদর্শ এইসব পদক্ষেপের চালিকা শক্তি৷ কিন্ত প্রশ্ন করা যাতে পারে – কেন এখনই বিজেপি এই পদক্ষেপ নিলো?

দেশের ভেতরের এবং বাইরের কিছু ঘটনাপ্রবাহ এই পদক্ষেপের সময় নির্ধারনে ভূমিকা ফেলেছে বলেই বোঝা যায়৷ অভ্যন্তরীণ বিষয়ের অন্যতম হচ্ছে মে মাসে নির্বাচনে বড় ধরণের বিজয়ের পরে বিজেপি তার জনপ্রিয়তায় সামান্য রকমের আঁচড় লাগার আগেই এই পদক্ষেপ নিতে চেয়েছে৷ বিজয়ের আকার তাঁদেরকে এই ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণের সাহস যুগিয়েছে৷ কেননা মোদী, অমিত শাহ জানেন যে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে৷ কিন্তু বিজয়ের শক্তিতে বলিয়ান কট্টর সমর্থকদের কারণে তাঁরা তা উৎরাতে পারবেন বলেই মনে করেছেন৷ এই কট্টর সমর্থকদের চাঙ্গা রাখা, উত্তেজিত রাখা এবং এক ধরনের যুদ্ধংদেহী মনোভাবে রাখা বিজেপির দরকার, কেননা খুব শীগগিরই বাবড়ি মসজিদ-রাম জন্মভূমি বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় আসবে৷ এই শুনানি শুরু হয়েছে ৬ আগস্ট৷ সেই সময়ে এই গেরুয়া দেশপ্রেমের সমর্থকদের মাঠে নামানোর জন্যেই তাঁদেরকে এখন থেকেই প্রস্তুত করা হয়েছে এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে৷

কাশ্মীরের বিধান সভার আসন্ন নির্বাচন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেহতে প্রভাব ফেলেছে৷ অক্টোবরে এই নির্বাচন হবার কথা হয়েছে৷ বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কোনও অবস্থাতেই কাশ্মীরের বিধানসভা ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলে ‘সম্মতি' দেবে না৷ ৩৭০ ধারা বাতিলের পরে মোদী বলেছেন যে কাশ্মীরে বিধান সভা থাকবে, নির্বাচনও হবে৷ তা হলে সেই বিধান সভার ‘সম্মতির' অপেক্ষা করা হল না কেন?

Ali Riaz Politikwissenschaftler

আলী রিয়াজ, রাজনীতি বিশ্লেষক

বিরোধী দলগুলোর মধ্যকার অনৈক্য, বিশেষ করে কংগ্রেসের দিক-দিশাহীন অবস্থা ও নেতৃত্বের অভাব বিজেপির মধ্যে এই আস্থা তৈরি করেছে যে তাঁরা সহজেই এই অবস্থা মোকাবেলা করতে পারবে৷ এই অনৈক্যের কারনেই দেখা গেছে যে, অনেকগুলো বিরোধী দল যেমন বহুজন সমাজ পার্টি, আম আদমি পার্টি, বিজু জনতা দল, তেলেগু দেশম পার্টি এই পদক্ষেপে বিজেপিকে সমর্থন দিয়েছে৷ কংগ্রেসের নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া দল থেকে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন৷        

অভ্যন্তরীণ এই সব বিষয়ের পাশাপাশি আছে দেশের বাইরের ঘটনাপ্রবাহ৷ দোহায় তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে আলোচনা চলছে তাতে গত কিছুদিন যাবত অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে৷ যার অর্থ হচ্ছে আফগানিস্থান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার এবং কোনও না কোনও ভাবে তালেবানের হাতে কিছুটা হলেও ক্ষমতা হস্তান্তর৷ আফগানিস্থানে তালেবান যদি যুদ্ধে আর লিপ্ত না থাকে তবে তাঁদের পক্ষে অন্যত্র নজর দেয়া সম্ভব হবে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে, সেই রকম পরিস্থিতি তৈরি হলে আফগানিস্তানের তালেবান যোদ্ধারা পাকিস্তানের সহায়তায় কাশ্মীরে এসে উপস্থিত হতে পারে৷ তাঁরা সেই রকম পরিস্থিতির আগেই কাশ্মীরের বিষয়ে অবস্থান কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান নেবার পক্ষে ছিলো৷

দ্বিতীয় বৈশ্বিক কারন হচ্ছে সাম্প্রতিককালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য যে, মোদী কাশ্মীর বিষয়ে তাঁকে মধ্যস্থতা করা অনুরোধ করেছেন৷ ভারত এই ধরণের অনুরোধের কথা অস্বীকার করে৷ কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে আলোচনার পরে এই ধরণের মন্তব্য থেকে নয়াদিল্লী কাশ্মীর প্রশ্নের আন্তর্জাতিকীকরণের ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছে – ভারতের সব সরকার বলে এসেছে কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়৷ পাকিস্তানের দুর্বল অর্থনীতি সম্ভবত সিদ্ধান্তে একটি প্রভাবকের কাজ করেছে৷ মোদী সরকার এটা বিবেচনায় নিয়েছে যে, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের পক্ষে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে যাবার মতো অবস্থা নেই৷ পাকিস্তানের অর্থনীতি এতটাই ভেঙ্গে পড়েছে যে জুলাই মাসে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে কঠোর শর্তে ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে৷

অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের এইসব ঘটনা কাশ্মীর বিষয়ে মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ত্বরান্বিত করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়৷ কিন্তু এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হচ্ছে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আদর্শ, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং কর্তৃত্ববাদের সংমিশ্রন৷ তাঁদের লক্ষ্য এসবের মিশ্রনে এক ‘নতুন ভারত' প্রতিষ্ঠা; সেই যাত্রাপথে কাশ্মীর একটি স্টেশন, কিন্ত শেষ ষ্টেশন নয়৷

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন