‘মেয়েদের ফুটবল শুরুর সময় মৌলবাদীরা হুমকি দিয়েছিল′ | আলাপ | DW | 03.07.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘মেয়েদের ফুটবল শুরুর সময় মৌলবাদীরা হুমকি দিয়েছিল'

অ্যাথলেটিক্সে অংশ নিলেও ফুটবল, ক্রিকেটে নারীদের অংশগ্রহণ সহজ ছিল না৷ কীভাবে যুদ্ধ করে তাঁদের মাঠে নামতে হয়েছিল, ডয়চে ভেলের কাছে স্মতির সেই ঝাঁপিই খুললেন ক্রীড়া সংগঠক কামরুন্নাহার ডানা৷

ডয়চে ভেলে: ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের পদচারণা শুরু হয় কখন থেকে?

কামরুন্নাহার ডানা: আমাদের যাঁরা বড় বোন ছিলেন, তাঁরা তো পাকিস্তান আমল থেকেই খেলেছেন৷ তখন তাঁরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করতেন৷ পাকিস্তান তো তখন নানাভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে দমিয়ে রাখত৷ তারপরও আমাদের বড় বোনেরা বিভিন্ন খেলায় অংশ নিতেন৷ আমি তাঁদের কয়েকজনকে স্মরণ করতে পারি৷ তাঁরা হলেন – প্রয়াত জিনাত আপা, রাবেয়া খাতুন তালুকদার, কাজী নাসিমা হামিদ, জাহেদা আলী এবং কাজী শামীমা৷ তবে ওনারা কিন্তু খেলেছেন আমাদের দেশ স্বাধীনের আগেই৷ স্বাধীনতার পর আমরা যাঁরা এসেছি, আমাদের পথটা তত মসৃণ ছিল না৷ আমরা তখন এটাকে পেশা হিসেবে দেখিনি৷ আমরা খেলাধুলাকে ভালোবেসেই এখানে এসেছি৷

প্রথম কোন খেলায় নারীরা অংশ নেন?

যদি পূর্ব পাকিস্তানের কথা বলি, তাহলে প্রয়াত জিনাত আপা, রাবেয়া খাতুন তালুকদার, কাজী নাসিমা হামিদ আপারা মূলত অ্যাথলেটিক্সে অংশ নিতেন৷ এরপর ব্যাডমিন্টন খেলাটা এলো৷ এটা অবশ্য শীতকালীন খেলা হিসেবে দেখা হতো৷ আমরা তো আমাদের সময় চিন্তাই করতে পারতাম না যে, আমাদের মেয়েরা ফুটবল, ক্রিকেট খেলবে৷ ২০০৩ সালের পর ফুটবলটা শুরু করলাম৷ পরে ২০০৬ সালে আমরা ক্রিকেটটা শুরু করলাম৷

ব্যাডমিন্টনে নারীরা কখন আসেন?

এটা স্বাধীনতার উত্তরকালে৷ তখন বাড়িতে বাড়িতেই এই ব্যাডমিন্টন খেলা হতো৷ অবশ্য প্রতিযোগিতাও হতো৷ আমরা এলাম সত্তরের দশকে৷ মূলত স্বাধীনতার পর নতুন দেশ...৷ তখন আমরা একটা নতুন পতাকা পেলাম, বিভিন্ন ফেডারেশন গঠন হলো, বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা তখন শুরু হলো৷ আমি ১৯৭৬ সাল থেকে খেলি৷

অডিও শুনুন 14:38

‘মৌলবাদীরা ফতোয়া দিল, মহিলা ফুটবল শুরু করা যাবে না’

আপনি যখন শুরু করেছেন তখন খেলাধুলাতে আসা কতটা কঠিন ছিল?

আমাদের সময়ে বিষয়টা এত কঠিন ছিল না৷ কারণ আমরা যাঁরা খেলাধুলায় এসেছি, তাঁদের পারিবারিক সাপোর্টটা ছিল৷ আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি৷ তবে সামাজিক ‘সাপোর্ট' খুবই কম ছিল৷ কারণ যাঁরা খেলতে আসতেন, তাঁদের খুব একটা ভালো চোখে দেখতেন না কেউ৷ এখন যেমন প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, স্কুল-কলেজে মেয়েরা খেলছে, তখন তো আর এত মেয়ে খেলত না৷ ফলে, খেলতে যাওয়াটা এত সহজও ছিল না৷ অনেকেই পরিবারের সঙ্গে ফাইট করেছে৷ আমি অবশ্য ভাগ্যবান, কারণ আমরা পরিবার ছিল সাংস্কৃতিকমনা৷ ফলে তাঁরা আমাকে সহযোগিতা করেছেন৷ তবে আত্মীয়স্বজনরা অন্যভাবে দেখতেন৷ পরে দেখা গেল আমরা যাঁরা খেলাধুলা করেছি, তাঁরাই ভালো আছি৷ আর যাঁরা মাঠে আসেননি, তাঁদের অনেকেই বিপথে গেছে৷

মেয়েদের শর্ট পোশাকে খেলা নিয়ে কি কোনো বাধা-বিপত্তিতে পড়তে হয়েছে?

আমি ব্যাটমিন্টনের কথাই বলি৷ ১৯৭৫ সাল থেকে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট শুরু হয়৷ আমি শুরু করি ১৯৭৬ সালে৷ তখন আমরা ট্রাউজার পরেই খেলতাম৷ ১৯৭৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন কিন্তু নিয়ম চালু করে যে, স্পোর্টস ড্রেস পরেই ব্যাডমিন্টন খেলতে হবে৷ তখন আমাদের শর্ট পোশাক পরে ব্যাডমিন্টন খেলতে হতো৷ এখন কিন্তু অনেককেই দেখি ট্রাউজার পরে ব্যাডমন্টিন খেলছে৷ তখন সরকারও চাইত খেলাধুলা খেলাধুলার পোশাকেই হোক৷ তাছাড়া আন্তর্জাতিক ফেডারেশনও তাই চাইত৷

ভিডিও দেখুন 01:21

ফুটবল খেলছে গ্রামবাংলার মেয়েরাও

মৌলবাদীদের বাধার কথা বলছিলেন... এটা কখন আর কোন খেলা নিয়ে?

আমরা খেলাধুলার পোশাক পরেই খেলছিলাম, সেটা বেশ ভালোভাবেই চলছিল৷ এমনকি সুইমিং কস্টটিউম পরেও ৮০ সালে আমেনা মোশারফ পুলে নেমেছেন৷ তাতেও খুব একটা সমস্যা হয়নি৷ তখন এটা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য ছিল না৷ কিন্তু ২০০৩ সালে যখন প্রথম মহিলা ফুটবল শুরু হলো, তখন হলো বিপত্তি৷ আমি তখন ফুটবল ফেডারেশনের মহিলা ফুটবল লীগের প্রধান ছিলাম৷ ২০০৪ সালে যখন আমরা প্রথম টুর্নামেন্টের ঘোষণা দিলাম যে, আগামী পরশু থেকে ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু, তখন বাধা এলো৷ তখন ৬টা দল ছিল৷ কারণ নারী ফুটবলার তো তখন তৈরিই হয়নি৷ তখন খেলা শুরু হওয়ার একদিন বা দু'দিন আগে শুক্রবার ছিল৷ তখন জুম্মার নামাজের পর মৌলবাদীরা বিরাট একটা জমায়েত করল৷ সেখানে তারা ফতোয়া দিল যে মহিলা ফুটবল শুরু করা যাবে না৷ তারা বলল, ফুটবল ফেডারেশন ঘেরাও করবে৷ পাশাপাশি খেলার দিন কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামও ঘেরাও করবে বলে জানালো তারা৷ এমনকি আমাকে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছিল৷ আমি নিজে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম৷ পরিবারও রাজনীতি করত৷ ফলে আমি সবার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম৷ সবাইকে বোঝালাম, তারা যেন বলে যাতে ফুটবল ফেডারেশন এই টুর্নামেন্টটা বন্ধ না করে৷ তাহলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে৷ কারণ ফিফা থেকে মেয়েদের জন্য যে বরাদ্দ দিত, সেটা তারা বন্ধ করে দেবে সেই ঘোষণা দিয়েছিল৷ পাশাপাশি ছেলেদের জন্য যে টাকা দিত, সেটাও কমিয়ে দেবে৷ আসলে তখন ওটা ওভারকাম করতে পেরেছি কারণ সরকার, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সবাই আমাদের সহযোগিতা করেছে৷ সেদিন আমরা ওই টুর্নামেন্ট শুরু করতে পেরেছিলাম বলেই আজকে মেয়েরা বিভিন্ন খেলায় অংশ নিচ্ছে এবং অনেকে এর থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে৷

খেলাধুলা থেকে উপার্জন শুরু হলো কবে থেকে?

এখানে খেলাধুলায় আগেও কিছু টাকা পাওয়া যেত৷ তবে সেটার পরিমাণ খুব বেশি ছিল না৷ এর জন্য আনসার ও ভিডিপির একটা বড় সহযোগিতা আছে৷ তাদের এই কৃতিত্বটা দিতেই হবে৷ যখন মেয়েদের ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হলো, তখন আনসার থেকে মেয়েদের চাকরি দিয়ে টিম বানানো হলো৷ বিশেষ করে পার্বত্য এলাকার মেয়েদের৷ কারণ ওই এলাকার মেয়েদের একটু হার্ডি কাজ করতে হতো৷ বিশেষ করে পাহাড়ে উঠতে হতো৷ এই কারণে ওদের স্ট্যামিনাও বেশি ছিল৷ ওদের যখন ফুটবল খেলার জন্য চাকরি দেয়া হলো, তখন কিন্তু একটা বড় পরিবর্তন হতে শুরু করল৷ এটা নিয়ে একটা বিপ্লব করতে হয়েছে৷ সেই বিপ্লবের সাক্ষী বা অংশীদার হলাম আমরা৷ কারণ আমরা কাজটা শুরু করেছিলাম৷ এখানে একটা গল্প বলি – তখন ফেডারেশনের সেক্রেটারি ছিলেন আনোয়ারুল হক হেলাল৷ আমি তাকে নিয়ে গ্রামীণফোন অফিসে যাই৷ কারণ গ্রামীণফোন তখন ক্রিকেটে অনেক বেশি বিনিয়োগ করছিল৷ আমরা সেখানে গিয়ে তাদের নারী ফুটবলে স্পন্সর করতে অনুরোধ করি৷ তখন তারা আমাদের জানায়, এখানে স্পন্সর করলে তাদের অফিসে মৌলবাদীরা হামলা চালাতে পারে, ভাঙচুর করতে পারে৷ ফলে তারা রাজি হয়নি৷ এই পরিস্থিতিতে আমরা শুরু করেছিলাম৷

ছেলেরা না পারলেও মেয়েরা এশিয়া কাপ জিতেছে, বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন?

ছেলেরা তো স্বাধীনতার আগেও খেলেছে, পরেও খেলেছে৷ তাদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি৷ এখানে ভারত ৬ বার এশিয়া কাপ জিতেছে৷ তারা কিন্তু ৫৫ বছর মহিলা ফুটবল খেলে৷ এটা আমাদের এক বিরাট প্রাপ্তি৷ তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, ছেলেরাও অনেক ভালো করছে৷ তারা এশিয়া কাপ দু'বার পেতে পেতে পায়নি৷ খুব অল্প রানের ব্যবধানে হেরেছে৷ গত ওয়ার্ল্ড কাপেও আমরা ভালো খেলেছি৷ মেয়েদের এই দলটাকে ধরে রেখে চুপচাপ বসে থাকলে হবে না৷ আমাদের পাইপ লাইনে অনেক বেশি খেলোয়াড় দরকার, যেটা নেই৷ এর জন্য ট্রেনিং প্রোগ্রাম বাড়াতে হবে৷

ছেলে ও মেয়েদের বেতন বৈষম্য নিয়ে কথা হচ্ছে, সেটা নিয়ে কিছু বলবেন?

এখানে দেখতে হবে ছেলেরা কতদিন ধরে খেলছে, কতজন খেলছে৷ সে হিসেবে আমাদের মহিলা ক্রিকেটের সময়কাল খুবই কম৷ তবে আমি আশা করব এখন যে ব্যাপক ব্যবধান আছে, বিসিবি সেটা কমিয়ে আনবে৷ তবে এখনই আমরা বলতে পারি না যে আজ আমরা এশিয়া কাপ জিতলাম বলে মেয়েদের বেতন সাকিব, তামিম, মাশরাফির সমান করে দিতে হবে৷ সেটা কিন্তু ঠিকও না৷

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছেলে-মেয়েদের বৈষম্য কীভাবে দূর করা যায়?

আমি আশা করব – আমাদের প্রতিটি ফেডারেশন ছেলে ও মেয়েদের সমানভাবে সুযোগ দেবে৷ মনে রাখতে হবে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী কিন্তু নারী৷ আমাদের অধিকারও সমান হওয়া উচিত৷ ছেলেরা যে সুযোগ-সুবিধা পায়, মেয়েরাও যেন সেটা পায়৷ অনেক সময়ই দেখা যায় আন্তর্জাতিক কোনো টুর্নামেন্টে দাওয়াত আসলে সেখানে শুধু ছেলেদের টিম যায়, মেয়েদের টিম যায় না৷ এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক৷

কামরুন্নাহার ডানার সাক্ষাৎকারটি কেমন লাগলো? জানান আমাদের, নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন