মেলা আজও আছে, তবে প্রাণ নেই | আলাপ | DW | 16.10.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

মেলা আজও আছে, তবে প্রাণ নেই

বাংলাদেশে প্রতিবছর পাঁচ হাজারের বেশি মেলা বসে৷ বৈচিত্র্য আর নানা আয়োজন এইসব মেলাকে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা৷ কিন্তু তারপরও মেলার সেই জৌলুস এখন আর নেই৷ ঐতিহ্যবাহী ও লোকজ মেলার জায়গা কেড়ে নিয়েছে শহুরে বাণিজ্যিক মেলা৷

ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়নের উভাজানি গ্রামের রাধা চক্করের মেলা ৫০০ বছরের পুরনো৷ কথিত আছে, বৈশাখ মাসে আউশ-আমন ধানের চাষ দেয়ার জন্য মাটিতে যেন উর্বরতা থাকে সেজন্য বৃষ্টি প্রার্থনা করা হত৷ আর সেই সময়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা রাধা-গোবিন্দ বিগ্রহ স্থাপন করেন৷ শুরু করেন রাধা চক্করের মেলা৷ প্রতিবছর বৈশাখের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার শুরু হয়ে মেলা চলত এক সপ্তাহ৷ মেলায় পূজার্চনার পাশাপাশি ছিল নাগরদোলায় চড়া ও সার্কাস দেখার ব্যবস্থা৷ ছিল স্থানীয়ভাবে তৈরি মিষ্টান্ন-আমেত্তি, জিলাপি, চমচম, রসগোল্লা, রাজভোগ, কালোজাম, দই, ঘি, ও সন্দেশের দোকান৷ তাছাড়া তুলা, তামা, কাসা, মাটির তৈরি বিভিন্নরকমের তৈজসপত্র বিশেষ করে, শিশুদের খেলনার জন্য মাটির তৈরি দুলদুল, ঘোড়া, টমটম ইত্যাদি বিক্রি হত৷ গ্রামীণ কারুশিল্পীদের তৈরি অসংখ্য উপকরণ, হরেক রকমের খাদ্যসম্ভার, চিনির সাজ, কদমা, বাতাসা, বিন্নি খই, মুড়ি, ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের নানারকমের পণ্যসামগ্রী মেলায় উৎসবের আবহ ছড়িয়ে দিত৷

অডিও শুনুন 02:09
এখন লাইভ
02:09 মিনিট

‘‘হিন্দু পরিবার আছে মাত্র কয়েক ঘর’’

মেলা কমিটির সদস্য গোবিন্দ নন্দি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যাঁরা মেলা করতেন তাঁরা বংশপরম্পরায় চলে গেছেন৷ হিন্দু পরিবার আছে মাত্র কয়েক ঘর৷ লোকজন নাই৷ আগে সাত দিন মেলা হত৷ এখন হয় দুই দিন৷ আগের মতো আর লোক আসেনা৷ তেমন আয়োজনও থাকেনা৷ আর আশপাশে কয়েকটি বাণিজ্যিক মেলা হওয়ায় এই ঐতিহ্যবাহী মেলাটি দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে৷'' তিনি বলেন, ‘‘আগে সারাদেশে এই মেলার পরিচিতি ছিল৷ সারাদেশ থেকে লোক আসতেন৷ আসতেন সাধু-সন্নাসীরা৷ এসবই এখন অতীত৷''

বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নীলমেলাও হারিয়ে গেছে৷ মূলত বৈশাখী মেলাই ওই অঞ্চলে নীল মেলা নামে পরিচিত ছিল৷ গ্রামীণ এই উৎসবকে আরো রঙিন করে তুলতে মেলা, গৃহস্থ বাড়ির উঠোন কিংবা হাটবাজারে নাচতো নীল নাচের দল৷ কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এ দলগুলো হারিয়ে গেছে৷ নীল নাচও নেই, নেই নীল মেলাও৷

প্রতিটি নীল নাচের দলে ১০-১২ জন রাধা, কৃষ্ণ, শিব, পার্বতি, নারদসহ সাধু পাগল (ভাংরা) সেজে সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি নীল নাচ গান পরিবেশন করত৷ চৈত্র সংক্রান্তি মেলার শেষ দিনে নীল পূজা শেষ হত এ নীল নাচের মধ্য দিয়ে৷ নীল পূজা মূলত হিন্দু ধর্মীয় উৎসব হলেও চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবের সঙ্গে মিলে তা সার্বজনীন এক উৎসবে পরিণত হয়৷

মঠবাড়িয়ার সাংবাদিক দেবদাস মজুমদার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘নীল মেলা প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো৷ মঠবাড়িয়ার কাছিছিড়া গ্রামের বেপারী বাড়ির মাঠে ঐতিহ্যবাহী এ নীল পূজার শুরু৷ তারপর প্রতিটি ইউনিয়নে নীল পূজা আর নীল মেলা ছড়িয়ে পড়ে৷ কিন্তু এখন আর গ্রামে গ্রামে নীল মেলা হয়না, সীমিত হয়ে পড়েছে৷ এর প্রধান কারণ খোলা মাঠ নাই, পুকুরগুলোও নাই৷ একসময় বড় পুকুরের পাড়েও নীল মেলা হত৷''

বাংলা একাডেমির ফোকলোর জাদুঘর ও মহাফেজখানা বিভাগের সহ-পরিচালক ড. সাইমন জাকারিয়া ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে আগে বছরে ১২শ' লোকমেলা হত৷ এখন সেই মেলা হাতে গোনা৷ ওই সব মেলায় লোকসংগীত শিল্পীরা গান গাইতেন৷''

গবেষকরা বলছেন, লোক মেলা বাংলাদেশের মেলা সংস্কৃতির একটি ধারা মাত্র৷ আরো অনেক ধরণের মেলা আছে৷ আর তার সংখ্যা পাঁচ হাজারের কম হবে না৷

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলার শিক্ষক এবং লোক সংস্কৃতির গবেষক অধ্যাপক কামাল উদ্দিন কবির ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মেলা বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে৷ আবহমানকাল থেকে চৈত্র সংক্রান্তি থেকে শুরু করে ১২ মাসই মেলা আছে৷ আর একেক এলাকার মেলার বৈশিষ্ট্য একেক রকম৷ চৈত্রসংক্রান্তির মেলা টাঙ্গাইলের গ্রামে যেমন হয়, বিক্রমপুরে তার থেকে আলাদা৷ চৈত্রসংক্রান্তি যেমন আছে তেমনি শ্রাবণসংক্রান্তিও আছে৷ হয়তো শ্রাবণসংক্রান্তির মেলা সব জায়গায় হয়না৷ মনষামঙ্গল বা পদ্মা পূরাণকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও এক মাস ধরে গীত বাদ্যের আয়োজন করা হয়৷''

বাংলাদেশের মেলা' নামক নিবন্ধে ড. সাইমন জাকারিয়া লিখেছেন চরিত্র বিচারে বাংলাদেশে প্রচলিত মেলাগুলোকে মোটামুটি সাত শ্রেণিতে ভাগ করা যায়৷

অডিও শুনুন 03:31
এখন লাইভ
03:31 মিনিট

‘‘নীল মেলা প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো’’

১. ধর্মীয় উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলা

২. কৃষি উৎসব উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলা

৩. ঋতুভিত্তিক মেলা

৪. সাধু-সন্তের ওরস উপলক্ষে ফকিরি মেলা

৫. জাতীয় জীবনের বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তি যেমন কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ইত্যাদির স্মরণোৎসব উপলক্ষে স্মারক মেলা

৬. জাতীয় দিবসসমূহ উদ্যাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃৎতিক মেলা

৭. বাণিজ্যিক সামগ্রী প্রদর্শনী ও বিক্রয় মেলা

তিনি আরো লিখেছেন, ‘‘গবেষকদের ধারণা, বাংলায় নানাধরনের ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠান ও উৎসবের সূত্র ধরেই মেলার উৎপত্তি হয়েছে৷ সেদিক দিয়ে বাংলাদেশের মেলার প্রাচীনত্ব হাজার বছরেরও অধিক পুরনো৷ এদেশের প্রাচীন পর্যায়ের উৎসব ও কৃত্যানুষ্ঠানকেন্দ্রিক মেলাগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে জীবনধারণের আহার্য কৃষিশস্য এবং বিশেষ করে কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রোদ ও মেঘের কথা৷ রোদ মানে সূর্য৷ প্রাচীন বাংলার মানুষ চাঁদ ও সূর্যকে ‘বুড়া-বুড়ি' নামে যেখানে পূজা করেছে, সেখানে পূজা উৎসবে পূজারিরা সমবেত হতে থাকলে একসময় ধীরে ধীরে ‘বুড়া-বুড়ির মেলা' প্রবর্তিত হয়৷ এর সঙ্গে আসে মেঘের জন্য বরুণ বা বারুণী৷ উল্লেখ্য, বুড়া-বুড়ির মেলাটি পরে সূর্য মেলা, সূর্য ঠাকুরের ব্রত, চৈত্রসংক্রান্তির ব্রতের মেলা, চড়ক মেলা, শিবের গাজনের মেলায় রূপ নিয়েছে৷ অন্যদিকে মেঘের দেবতা বরুণ-বারুণী স্নানের মেলা হিসেবে রূপ গ্রহণ করে৷ বাংলাদেশে প্রচলিত প্রতিটি মেলা আয়োজনের পেছনে কোনো না কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে৷'' 

অডিও শুনুন 05:27
এখন লাইভ
05:27 মিনিট

‘‘বাজিতপুরের কামালপুরেও এরকম একটি মেলা বসে’’

ড. সাইমন জাকারিয়া জানান, ‘‘একটি জরিপে জানা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রথযাত্রা উপলক্ষে ৬২টির মতো মেলা বসে৷ তার মধ্যে ঢাকার ধামরাইয়ের রথের মেলাটি প্রাচীন ও জাঁকালো৷ সনাতন ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গোৎসবকে উপলক্ষ করেই এ দেশে সর্বোচ্চসংখ্যক মেলা বসে থাকে, যার সংখ্যা ৭৩টির অধিক৷ সর্বজনীন দুর্গাপূজা সনাতন ধর্ম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ও বর্ণাঢ্য ধর্মীয় উৎসব৷ ফলে দুর্গোৎসব উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলাগুলো ছড়িয়ে আছে সারা বাংলাদেশে৷ মুসলমান সম্প্রদায়ের উৎসবকেন্দ্রিক মেলার মধ্যে মহররমের মেলাগুলোই অধিক বর্ণাঢ্য৷ শিয়া মতবাদী মুসলিমরা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণ করে শোভাযাত্রা বা তাজিয়া মিছিল বের করে এবং মেলা বসে৷''

এর বাইরে দেশের গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে ‘ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা', ‘পর্যটন করপোরেশন', ‘বাংলা একাডেমি' এবং ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে'র পরিকল্পিত আয়োজনে বৈশাখী মেলা নতুন মাত্রা পেয়েছে৷

বাংলাদেশে এমন মেলাও হয় যেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছু পাওয়া যায়৷ অধ্যাপক কামাল উদ্দিন কবির বলেন, ‘‘মাগুরা অঞ্চলের বরোলিয়া গ্রামে মাঘের শেষে একটি মেলা হয়৷ ওই মেলাটি আমার দেখা সবচেয়ে বড় মেলা যেখানে আমাদের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু পাওয়া যায়৷ বাজিতপুরের কামালপুরেও এরকম একটি মেলা বসে৷ ওই মেলার জন্য এলাকার লোকজন সারাবছর অপেক্ষা করে থাকেন তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য৷''

অডিও শুনুন 05:38
এখন লাইভ
05:38 মিনিট

‘‘বগুড়ার ধুনট এলাকায় আগে নৌকার মেলা হত’’

বাংলাদেশে বৈশাখী মেলা ছাড়াও মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র এই তিন মাসেই মেলা বেশি হয়৷ মাঘ মাসে রাজশাহীর বারুণীর মেলা, ললিতনগরের মেলা, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলের কাতিহার মেলা, যশোরের সাগরদাঁড়ির মধুমেলা, বিক্রমপুরের রামপালের মেলা, বগুড়ার কেলুয়ার জগদীস গোসাই মেলা, ফরিদপুরের তাড়াইলের মাঘী পূর্ণিমার মেলা, বরিশালের সূর্য মনির মেলা, কালীতলার মেলা; পঞ্চগড়ের আটোয়ারীর নিরাশীর মেলা; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের সাতমোড়ার মেলা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য৷ ফাল্গুন মাসের উলেখযোগ্য মেলা শরীয়তপুর জেলার নড়িয়ার সুরেশ্বর মেলা, দিনাজপুরের গোরখাই মেলা, বগুড়ার ধুনটের বকচরের মেলা, নরসিংদীর মনোহরদীর শাহরাণীর মেলা, হবিগঞ্জের বোলেশ্বরী ইত্যাদি৷

বগুড়া জেলার গাবতলীর মহিষবাথান এলাকায় পোড়াদহের মেলা বসে৷ সন্ন্যাস পূজা উপলক্ষে মেলাটি হতো বলে একসময় এর নাম ছিল ‘সন্ন্যাস মেলা'৷ এখন এর নাম পোড়াদহের মেলা৷ এই মেলাটি মূলত মাছের মেলা৷ মেলায় বড় বড় মাছ ওঠে৷ আর মেলার সময় ওই এলাকার জামাইরা বেড়াতে আসেন৷ মাছের বড় ক্রেতা হলেন শ্বশুরবাড়িতে আসা এই জামাইরা৷ এরা পছন্দসই মাছ কিনে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যান৷ প্রতিবছর মাঘের শেষ বুধবার ও ফাল্গুনের প্রথম বুধবার এই মেলা হয়৷ বগুড়ার সাংবাদিক হাসিবুর রহমান বিলু ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘আমরা ছোটবেলা থেকেই এই মেলা দেখে আসছি৷

এই মেলা ২০০ বছরের বেশি পুরনো৷ আগে বিশাল আকৃতির মাছই ছিল এই মেলার প্রধান আকর্ষণ৷ কিন্তু এখন আর আগের মত বড় মাছ আসেনা৷ আগের মত জৌলুসও নাই মেলার৷'' তিনি বলেন, ‘‘এই মেলা শেষ হওয়ার পরই হয় বউ মেলা৷ নারীরা মাছের মেলায় যেতে পারেন না৷ তারা বউ মেলায় যান৷''

সাংবাদিক হাসিবুর রহমান বিলু আরো জানান, ‘‘বগুড়ার ধুনট এলাকায় আগে নৌকার মেলা হত৷ কিন্তু সেই মেলাও হারিয়ে গেছে৷ মহাস্থানগড়ের মাসব্যাপী ঐতিহাসিক মেলা এখন ছোট হয়ে গেছে৷ এখন হয় সাত দিনের মেলা৷''

গবেষকরা বলছেন বাংলার এই মেলাগুলো যেমন এখানকার সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে তেমনি এই মেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পণ্যের পসরা বসে৷ আর গ্রামীণ জনপদে নামে উৎসবের ঢল৷ এর একটি বড় অর্থনৈতিক দিকও আছে৷

মেলা একদিকে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে তেমনি শহুরে মেলার নতুন আয়োজন আসছে৷ আর অনেক মেলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ইন্টারনেট লিংক

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন