‘মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’ | আলাপ | DW | 30.12.2021

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

‘মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’

২০২১ সালের বিদায় আর ২০২২ সালের আগমনী-ক্ষণের ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এই দুটি লাইন মনে পড়ে যাচ্ছে বার বার৷

২০২১ সালটা খুব ভালো কেটেছে, বলার উপায় নেই৷ বছরটা শুরু হয়েছিল সারা বিশ্বকে থমকে দেয়া সার্স কোভিড-১৯ ভাইরাসজনিত অতিমারীর দ্বিতীয় ঢেউকে সঙ্গে নিয়ে৷ আগের বছরের ধাক্কা সামলে নিয়ে আমরা তখন কেবল ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছি৷ সারা বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতোই আমাদেরও আশাবাদী করে তুলেছে অভূতপূর্ব দ্রুততার সঙ্গে উদ্ভাবিত করোনার টিকা৷ বছর ঘোরার আগেই সব প্রক্রিয়া শেষ করে একটি-দুটি নয়, অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা টিকা তখন বাজারে আর অন্য অনেক দেশের আগে বাংলাদেশে বেশ গোছানো একটি প্রক্রিয়ায় তা প্রয়োগের ব্যবস্থাও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে৷ কোভিড অতিমারিকে পেছনে ফেলে এবার এগিয়ে যাওয়ার সময় এলো, তখন এমনটাই মনে হচ্ছিল৷ কিন্তু বছরের শুরুতেই এই ভাইরাসের এক নতুন রূপ এসেছিল নতুন ধাক্কা হয়ে; সবকিছু স্বাভাবিক পথে ফেরানোর চিন্তা শিকেয় তুলে রেখে বাংলাদেশকে দ্বিতীয়বারের মতো হাঁটতে হয়েছিল লকডাউনের পথে৷

তারপর অবশ্য ঠিকই ঘুরে দাঁড়ানোর সময়টা এসেছে, বিশেষ করে অক্টোবরে এসে প্রায় দেড় বছর পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া, সীমিত পরিসরে হলেও এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণ আমাদের আশার আলো দেখিয়েছে৷ কিন্তু ২০২২ যখন কড়া নাড়ছে দরজায়, তখন আবার কোভিডের নতুন এক রূপ চোখ রাঙাচ্ছে আমাদের৷ উন্নত বিশ্বের কোনো কোনো দেশকে বেশ নাড়া দিয়ে ওমিক্রন ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশেও, যদিও এখন পর্যন্ত খুব ভয়ঙ্কর কিছু হয়ে ওঠেনি সেটা৷

অতিক্ষুদ্র, প্রায় অদৃশ্য এই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইটা এখনো চলছে৷ সন্দেহ নেই, এই লড়াইয়ে আমাদের ক্ষতির পরিমাণ অনেক৷ কিন্তু, লাভও কি হয়নি? গত দুই বছরে ঘরবন্দী জীবন আমাদের তো এক রকম ডুবতে ডুবতে সাঁতার শেখার জন্য ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দেয়ার মতো করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে প্রযুক্তির মুখোমুখি৷ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা আমরা মুখে বলছি বটে অনেক দিন ধরে; কিন্তু শামুকের গতিতে এগিয়ে চলা সেই রূপকল্পে আমাদের বিরাট একটা লাফ দিয়ে এক ধাপে অনেক দূর এগিয়ে যেতে হয়েছে কোভিড-১৯ অতিমারির প্রভাবেই৷ ঘরবন্দী থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে অফিস-আদালত-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবকিছু সীমিত পরিসরে হলেও কীভাবে চালানো সম্ভব, সেই শিক্ষা একেবারে হাতে-কলমে পেয়েছি আমরা৷ বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে এটা আমাদের বিরাট এক সুযোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে৷ ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়ার ব্যাপারটি ২০২০ সালেই শুরু করেছিলাম আমরা; ২০২১ সালে অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থাও হাঁটি হাঁটি পা পা করে প্রচলিত হতে শুরু করেছে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে৷

সন্দেহ নেই, এই ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছি৷ অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই অনলাইনে পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা চালু করেছে বটে; কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুবিধা গ্রহণ থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে রয়েছি৷ এর পেছনের মূল কারণ কিন্তু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা নয়; বিশ্বায়নের যুগে এসে প্রযুক্তির ব্যবহারের সুযোগ আসলে অনেকটাই উন্মুক্ত৷ সমস্যার জায়গাটি ভাবনায়, দর্শনে৷শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োগ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে হলে আসলে বদলাতে হবে ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষা দর্শন৷ একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই- বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২১ সালে শিক্ষার্থীদের কোর্স ফাইনাল পরীক্ষা গ্রহণ করেছে অনলাইনে৷ কিন্তু সেই পরীক্ষাটি আসলে ছিল দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পরীক্ষারই একটি সংস্করণমাত্র, যেখানে মুখস্ত প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীর মেধার মূল্যায়ন করা হয়৷ কিন্তু তারচেয়েও ভালো হতো, যদি মূল্যায়নের পদ্ধতিটি বদলানো হতো, পরীক্ষার বদলে শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট বিষয়ে মনোগ্রাফ রচনা কিংবা অর্জিত জ্ঞানের প্রায়োগিক ব্যবহারভিত্তিক টেক-হোম অ্যাসাইনমেন্ট রচনার দায়িত্ব দিয়ে কাজটি করা হতো৷ বিশ্বের অনেক দেশে অনেক আগে থেকেই এই পদ্ধতি প্রচলিত, ফলে এই অতিমারিকালে অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতির ব্যবহারে তাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি৷ অতিমারি আমাদের সামনে সম্ভাবনার নতুন এক দূয়ার খুলে দিয়েছে, আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এক ধাক্কায় পানিতে পড়ে সাঁতার শেখার মতো করেই জুম ও গুগল ক্লাসরুমের মতো লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছে, এগুলো ব্যবহার করতে শিখেছে৷আমাদের দেশেও এ ধরনের সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে৷ আশা করি করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন ২০২২ সালকেও ২০২১ সালের মতো থমকে দেবে না, খুলে যাওয়া স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আর বন্ধ হয়ে যাবে না; কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও সত্যি, স্বশরীরে ক্লাসে ফেরা শিক্ষার্থীরা এই দুই বছরে প্রযুক্তির যে জ্ঞান হাতে কলমে অর্জন করেছে, তাদের সেটা ভুলে যেতে দেয়া উচিৎ হবে না৷

তাছাড়া এই দেড় বছরের থমকে থাকা সময়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে, সেটাও তো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে! নতুন বছরের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে অতিমারিতে হারিয়ে ফেলা সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া, সেশনজটকে যতোটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে আনা৷ সেজন্য অনলাইন ও অফলাইন দুই পদ্ধতিতেই শিক্ষা দান অব্যাহত রাখার কোনো বিকল্প নেই৷ গত দেড় বছরে অনলাইনে শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে শহর আর গ্রামে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সে অসমতা ছিল, নতুন বছরে আশা করি সেই ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ দূর করার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে৷ সে জন্য সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন, কিন্তু আমরা, যারা শিক্ষাঙ্গনে কাজ করছি, তাদের কাছেও প্রত্যাশা কম নয়৷২০২১ সালে যে সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে, আমার বিশ্বাস, ২০২২-এ সেটাকে কাজে লাগানোর সত্যিকারের একটা পথ আমরা বের করতে সক্ষম হবো৷

Bangladesch Khademul Haq

এ কে এম খাদেমুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

শিক্ষা-ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দায় আসলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি৷ নানা কারণে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে একটা বিরাট সুযোগ, বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের মহাস্রোতে শামিল হওয়া৷ সেই পথে আমাদের যাত্রা কিন্তু থেমে নেই৷২০২২ সালে এ রকম বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবে রূপ পাওয়ার কথা৷ স্বপ্নের পদ্মা সেতু, ঢাকার মেট্রো রেল ব্যবস্থা আর নদীর তলদেশ দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম টানেলপথ কর্ণফুলী টানেলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা এই বছরে৷ কিন্তু এই প্রকল্পগুলোয় কারিগরী সহায়তার জন্য আমাদের সম্পুর্ণরূপে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে৷ শুধু তা-ই নয়, শুনতে পাই ঢাকার অনেক বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বড় বড় পদগুলোও নাকি বিদেশি কর্মীদের দখলে৷ আমাদের অদক্ষ শ্রমিকেরা বিদেশে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন, তার বেশ বড় একটা অংশ চলে যায় এই বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা হিসেবে৷ এর কারণ, আমাদের দেশে দক্ষ কর্মীর অভাব৷ রাতারাতি এই অবস্থার পরিবর্তন তো আর সম্ভব নয়, ২০২২ সালেই পরিস্থিতি পুরো পাল্টে যাবে, এমন আশা করা উচিৎ হবে না৷ তবে শুরুটা তো হতে পারে! আশা করি এই বছরে আমরা অন্তত সঠিক পথটাকে চিহ্নিত করতে পারবো, যেন আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ডিগ্রিধারী বেকার তৈরি না করে সত্যিকারের দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারে৷

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যাত্রা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে, তার ঢেউ এসে লাগতে শুরু করলে আমাদের শ্রম-ঘন অর্থনীতির অবস্থা কী হবে, তার একটা অনুমানভিত্তিক পরিসংখ্যান তো অন্তত থাকা উচিৎ! সেই অনুমান এবং তার ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণের কাজটুকু অন্তত শেষ হবে, আমরা সেই অনুযায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর অন্তত শুরু করবো, এটাই প্রত্যাশা৷

তার মানে কিন্তু এই নয় যে আমাদের নতুন প্রজন্মকে কেবলই প্রযুক্তির জ্ঞান বা দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করতে হবে৷শিক্ষার আরেকটি উদ্দেশ্য মানুষকে মানবিক করে গড়ে তোলা৷ ২০২১ সালের বাংলাদেশে এই জায়গাতেও যথেষ্ট ঘাটতি চোখে পড়েছে; পূজোর মণ্ডপে ভাঙচুর, জেলে-পাড়ায় আগুন দেয়ার মতো অমানবিক ঘটনা ঘটতে দেখেছি, দেখেছি কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতায় লঞ্চডুবি বা লঞ্চে-কারখানায় আগুন লেগে মানুষের নির্মম মৃত্যুর ঘটনা৷ আশা করি ২০২২ সালে আমরা এমন মানবিক ও দায়িত্ববান হয়ে ওঠার সুযোগ পাবো, যে এই সব অমানবিক ঘটনার কোনো জায়গা থাকবে না আমাদের চোখের সামনে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়