মুমূর্ষুরে দিও না উড়ায়ে | বিশ্ব | DW | 14.04.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

মুমূর্ষুরে দিও না উড়ায়ে

ভোরে অফিসের উদ্দেশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি, শীতল ফুরফুরে বাতাসে মনের অজান্তেই গুন গুন করে গাইছিলাম ‘এসো হে বৈশাখ'৷ কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যে এসেই আটকে গেলাম৷ কেনো জানি কণ্ঠ দিয়ে আর সুর বের হচ্ছিলো না৷

গত বছরের (১৪২৬ বঙ্গাব্দ) নববর্ষের প্রস্তুতির ছবি৷

গত বছরের (১৪২৬ বঙ্গাব্দ) নববর্ষের প্রস্তুতির ছবি৷

গানটির দ্বিতীয় বাক্যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘তাপস নিঃশ্বাস বায়ে', ‘মুমূর্ষুরে' ‘উড়ায়ে' দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন৷ অর্থাৎ, নির্মল বিশুদ্ধ বাতাস যাতে সকল রোগ-শোক উড়িয়ে নিয়ে যায়৷ গানের এই অংশে আসতেই আমার চোখ পড়লো ঠিক বাসস্ট্যান্ডের পাশের একটি দর্জির দোকানে৷ জার্মানির অন্য সব দোকানের মতো এই দর্জির দোকানটিও বন্ধ৷ কিন্তু জানালায় বড় করে মাস্কের ছবি টানানো৷ নোটিশে লেখা রয়েছে ফোনে অর্ডার দিলে তারা হাতে মাস্ক তৈরি করে দিবেন৷

জার্মানির কোনো শহরেই এখন মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে না৷ ফার্মেসিগুলোতে প্রতিদিন এতো মানুষ মাস্ক খুঁজতে আসেন যে বিরক্ত হয়ে অনেক ফার্মেসির দরজাতেই ‘মুখোশ নেই' নোটিশও টানিয়ে রেখেছেন৷ হাসপাতালগুলোতে একবার ব্যবহার করার উপযোগী মাস্ক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বারবার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা৷

জার্মানি করোনা ভাইরাস সংক্রমণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশগুলির একটি হলেও মৃত্যুহার তুলনামূলক অনেক কম, সুস্থ হওয়া মানুষের সংখ্যাও বেশি৷ কিন্তু এখনও হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরা হাসপাতালগুলোতে লড়ছেন ভাইরাসের বিরুদ্ধে৷ ইটালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য়, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে লাখ লাখ মানুষ ভুগছেন শ্বাসকষ্টে৷ কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র- ভেন্টিলেটরের অভাব দেখা দিয়েছে৷

পরিস্থিতি এমন হয়েছে, কেউ পাশে এসে দাঁড়ালে মনের অজান্তেই ভয় করে৷ যদি নিঃশ্বাসে ভাইরাস ঢুকে পড়ে ফুসফুসে, বা যদি প্রশ্বাসে আমিই ছড়িয়ে দেই করোনা! কেমন একটা দমবন্ধ পরিস্থিতি৷

বাংলাদেশে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে৷ এরই মধ্যে শনাক্তের সংখ্যা ছুঁয়েছে হাজারের অংক৷ হাজার মাইল দূরে বসেও প্রিয়জনদের আতঙ্ক বুকের মধ্যে টের পাচ্ছি৷

এসব চিন্তা নতুনভাবে আমাকে ভাবাচ্ছে৷ ‘অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা' গান তো আমরা গাই৷ কিন্তু বাস্তবে কী করছি? পুরো পৃথিবীটাকে আমরা আক্ষরিক অর্থে অগ্নিস্নান করাচ্ছি৷ কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছি, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলিয়ে দিচ্ছি৷  বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন কোটি বছরের পুরাতন বরফ গলায় নতুন নতুন ভাইরাসের পুনর্জন্ম হতে পারে৷

HA Asien | Anupam Deb Kanunjna

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

‘যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি' বাক্যে ছিল অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান৷ আমরা কিন্তু এমনিতেও কখনও স্মৃতি মনে রাখি না৷ কেবল জমি দখলের উদ্দেশ্যে আমরা পৃথিবীর ফুসফুস আমাজন পুড়িয়ে দিয়েছি৷ কিন্তু সেটা আমাদের এখন মনে নেই৷ জমি দখলের জন্য বস্তি পোড়ানোও আমাদের কাছে এখন ডালভাত হয়ে গেছে৷ অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহ দাবানল আর পুড়তে থাকা আদরমাখা চোখের কোয়ালার স্মৃতি কি আমাদের মনে আছে?

এমনকি এসো হে বৈশাখ গানটাও আমরা কেবল পয়লা বৈশাখ গাওয়ার জন্যই গাই৷ কবিগুরু যা বলতে চেয়েছিলেন আমরা তার অন্তর্নিহিত অর্থ না মেনে আক্ষরিক অনুবাদ বাস্তবে করে দেখাচ্ছি৷ অফিসে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছিলাম প্রকৃতিও ঠিক একইভাবে এর জবাব দিচ্ছে রবিঠাকুরের গানেই৷ আমরা যদি প্রকৃতিবিরুদ্ধ প্রাণী হিসেবে নিজেদের বর্তমান অবস্থান না পালটাই তাহলে ‘মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক' বলে প্রকৃতি কি বাজাবে ‘প্রলয়ের শাঁখ'?

আমিই বরং দুলাইন কবিতা লিখে ফেলি- বিশের বছর বিষের জ্বালা, এর চেয়ে মোর সাতাশ ভালা৷ আজ থেকেই গ্রেগরিয়ান ২০২০ এর বিষক্ষয় শেষের শুরু হোক৷ ১৪২৭ বঙ্গাব্দে অন্তত মুমূর্ষুরা উড়ে না যাক৷ এ বছর আমি ভুলে যাওয়া গীতিই গাইতে চাই৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন