মাসুদের গ্রেপ্তারের পর যেসব বিষয় আলোচনায়
২৪ মার্চ ২০২৬
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবই সম্ভব৷ এখানে কোন সরকার ক্ষমতায় তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করে৷ ওয়ান-ইলেভেনের একটা প্রেক্ষাপট আছে৷ ৫ আগস্টের একটা প্রেক্ষাপট আছে৷ সুতরাং একসময় ৫ আগস্ট নিয়েও একই ধরনের কথা হতে পারে৷ ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে বিদেশিরা ছিলেন৷ ৫ আগস্টের সঙ্গেও বিদেশিরা ছিলেন৷ বাংলাদেশতো বিদেশিদের একটা ফুটবল খেলার মাঠ৷ আমরা তো নিজেদের শক্তিতে খেলি না৷ ভবিষ্যতে বিদেশিদের আরো খেলা হতে পারে৷’’
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘‘... এখন যদি ওয়ান ইলেভেনের ভূমিকার বিচার হয় তাহলে ভবিষ্যতে আরো কিছু হতে পারে৷ রাজনীতিতে সবই সম্ভব৷ রাজনীতি ঘুরে গেলে ৫ আগস্টের কুশীলব বিষয়টিও সামনে আসতে পারে৷’’
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘‘... আমরা কোনো ঢালাও দায়মুক্তির বিরোধী- এক-এগারোর যেমন দায়মুক্তি নয়, তেমনি ৫ আগস্টেরও দায়মুক্তি নয়৷ ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছে৷ কিন্তু পুলিশ হত্যা, থানা পোড়ানো, লুটপাটের যদি বিচার না হয় তাহলে আবার একসময় এর বিচারের প্রশ্ন সামনে আসবে একইভাবে৷’’
সোমবার দিবাগত রাতে ঢাকার বারিধারার ডিওএইচএস-এর বাসা থেকে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে৷ মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে৷
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কে ছিলেন?
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল৷ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটনাটি এক-এগারো নামে পরিচিত৷ ঐ ঘটনায় সময় সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী৷
পরে সেনাসমর্থিত একটি সরকার গঠিত হয়েছিল৷ ঐ সরকারের সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক করা হয়৷ পদোন্নতি দিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল করা হয়৷ ওই কমিটির অধীনে তখন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছিল৷
ঐ অভিযানের সময় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাসহ অনেক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ গ্রেপ্তার করা হয় খালেদা জিয়ার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে৷ রাজনৈতিক নেতাদের পরে ছেড়ে দিয়ে নির্বাচন দেওয়া হলেও তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে জামিন দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়৷
তার আগে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে৷ সেই সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডিআইজি প্রিজন্স মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের সময় তিনি পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন৷ কিন্তু রিমান্ডে নেয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ এরপর পুরো সময়ই তাকে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে রাখা হয়৷ তার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিলো যে তিনি ঠিক মতো হাঁটাচলা করতে পরতেন না৷ তিনি একবার কারাগারে হাঁটতে গিয়ে পড়েও যান৷ তাকে পরে জামিন দিয়ে সরাসরি দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷’’
১৭ বছর পর তারেক রহমান দেশে ফেরেন গত ডিসেম্বরে৷ আর আরাফাত রহমান কোকো দেশের বাইরে মারা যান৷
এক-এগারোর সময় সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মইন ইউ আহমেদ৷ আর সরকারের প্রধান ছিলেন ফখরুদ্দিন আহমেদ৷ তারা দুইজনই বর্তমানে দেশের বাইরে বসবাস করছেন৷
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে৷ এরপর তিন দফায় তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়৷ অবসর গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় রেস্তোরাঁ এবং জনশক্তি রপ্তানিসহ একাধিক ব্যবসায় যুক্ত হন৷
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়নে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ফেনী-৩ আসনের (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) সংসদ সদস্য হন৷
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ফরম কিনে জমা দিয়েছিলেন৷ পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন৷ দলটির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ পান৷ জাপার মনোনয়নে নির্বাচন করেন৷
মাসুদের বিরুদ্ধে ১১ মামলা
মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এক ব্রিফিং-এ জানান, তার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানবপাচার, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে৷ এরমধ্যে ফেনী জেলায় তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা আছে৷ বিচার চলাকালে তিনি পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে৷
ফেনী ছাড়াও ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় আছে পাঁচটি মামলা৷ ঢাকার পল্টন, বনানী, মিরপুর, কোতয়ালী ও হাতিরঝিল থানায় মামলা আছে৷
তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক অভিযোগের এখন তদন্ত চলছে৷ তাকে পল্টন থানায় মানবপাচার মামলায় ৫ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেয়া হয়েছে৷
দেশে থাকার পরও এতদিন তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ডিবি প্রধান জানান, ‘‘আসলে তিনি পলাতক ছিলেন৷ তাকে গ্রেপ্তারের জন্য এর আগেও আমরা একাধিকবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাকে পাইনি৷ তার অবস্থান সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারছিলাম না৷ যখন নিশ্চিত হতে পেরেছি যে তিনি তার বারিধারার বাসায় অবস্থান করছেন তখনই তাকে গ্রেপ্তার করেছি৷’’
এক-এগারোর কুশীলব হিসাবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছি কী না, কিংবা ওই বিষয়ে তদন্ত হবে কী না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘না, আমরা তো সুনির্দিষ্ট মামলা নিয়ে তদন্ত করি৷ সুনির্দিষ্ট মামলায়ই তাকে গ্রেপ্তার করেছি৷ ওই মামলার বিষয়েই তদন্ত হবে৷ আমরা তদন্ত করছি৷ সিআইডি মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত করছে৷ দুদক দুর্নীতির মামলার তদন্ত করছে৷ এই মামলাগুলো আগেই হয়েছে৷’’
আরেক প্রশ্নের জবাবে ডিবি প্রধান বলেন, ‘‘এক-এগারোর কুশীলব বা তার নেতৃত্বে অন্যায়ভাবে আটক, নির্যাতনের কোনো ধরনের তথ্য পাওয়া গেলে তাহলে তা আমরা দেখব৷ অন্যায়কারী কেউ পার পাবে না৷’’
এক-এগারোর ভূমিকার কারণে গ্রেপ্তার?
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম মনে করছেন, ‘‘মাসুদ উদ্দিনকে হয়ত ওয়ান-ইলেভেনের ভূমিকার কারণে আটক করা হয়েছে৷ তার বিরুদ্ধে মামলা আছে৷ কিন্তু এতদিনতো গ্রেপ্তার হননি৷ তার মাধ্যমে হয়ত ওয়ান ইলেভেন বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কাজ শুরু হবে৷ আমার কাছে সেরকমই মনে হচ্ছে৷’’
‘‘ওয়ান ইলেভেনের সময় মাসুদ উদ্দিন ছিলেন নাইন ডিভিশনের জিওসি৷ এই ডিভিশনটি সেনাসদরের সবচেয়ে কাছে হওয়ায় এর গুরুত্ব অনেক বেশি৷ তিনি ছিলেন ক্ষমতার চূড়ায়৷ ওয়ান ইলেভেনের পরিবর্তন তার উদ্যোগ বা সমর্থন ছাড়া সম্ভব ছিলো না,’’ বলেন তিনি৷
সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘‘তিনি গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধানও ছিলেন৷ ওই সময় রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তারসহ দুর্নীতির অভিযোগে আরো যত আটক হয়েছে তা তার নেতৃত্বেই হয়েছে৷ অনেক ঘটনাও তখন ঘটেছে৷ এইসব ঘটনার সাথে তার সংশ্লিষ্টতার কথা বাজারে আছে৷’’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘‘কে গ্রেপ্তার হবে আর কে হবে না তা নির্ভর করে সরকারের ওপর৷ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে হয়তো তার সম্পর্ক ভালো ছিলো তাই তখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি৷ আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী নেতা সবাইকেই তো গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ জাতীয় পার্টির মনে হয় কেউ গ্রেপ্তার হয়নি৷’’
‘‘যেহেতু তার বিরুদ্ধে মামলা আছে, এখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করেছেন, নির্যাতন করেছেন সে ব্যাপারে তো কোনো মামলা হয়নি৷ তবে আমার মতে, তার তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে সেই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করলে ভালো হতো৷ তাহলে মানুষের মনে এই প্রশ্ন উঠত না যে, আগে তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি,’’ বলেন তিনি৷
এদিকে, মাসুদকে আগে গ্রেপ্তার না করে এখন গ্রেপ্তার করায় প্রশ্ন তুলেছেন সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স৷ তিনি বলেন, ‘‘তার বিরুদ্ধে যদি আদম পাচারসহ অন্য মামলা থাকে তাহলে তাকে এতদিন কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি৷ কারুর বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে তাহলে গ্রেপ্তার করা যায়৷ কিন্তু পুলিশতো এখনো ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে তারা কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বলেনি৷’’
সেনাবাহিনীর জন্য বার্তা?
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘‘এক-এগারোর সময় তার (মাসুদ) যে বিতর্কিত এবং গণতন্ত্রবিরোধী ভূমিকা, একটি নির্বাচনকে বানচাল করে একটি সেনাসমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠা করে জরুরি অবস্থা জারি করে দেশে বিশৃঙ্খলা এবং গণতন্ত্রের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিলো তার খেসারত এখনো জাতিকে দিতে হচ্ছে৷ সেই কুশীলবদের মধ্যে তিনি একজন, অন্যতম ব্যক্তি৷ ফলে যারা নির্বাচন ও গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে সাধারণ মানুষ মনে করে৷’’ আর ‘‘এই ধরনের অপরাধের বিচার হলে হয়ত সেনাবাহিনী ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখবে,’’ বলেও মনে করছেন তিনি৷