মালদহে বিচারকদের আটক রাখা, কঠোর শীর্ষ আদালত
২ এপ্রিল ২০২৬
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় একের পর এক সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশিত হচ্ছে। যেসব ভোটারের নাম তালিকায় থাকছে না, তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ।
কঠোর আদালত
মালদহের কালিয়াচকে বুধবার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জাতীয় সড়কে অবরোধ চলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয় সাতজন জুডিশিয়াল অফিসারকে। কোনওক্রমে তাদের উদ্ধার করে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। যখন পুলিশ উদ্ধার করছে, সেই সময়ে এক নারী বিচারকের অডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে তার আর্ত চিৎকার শোনা গিয়েছে (সত্যতা যাচাই করেনি ডিডাব্লিউ)।
এই ঘটনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সর্বোচ্চ আদালত। কালিয়াচকের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে তারা। পুলিশ-প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা বলে সিবিআই বা এনআইএ-কে দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মুখ্যসচিব, ডিজিপি ও পুলিশ সুপারকে শোকজ করা হয়েছে।
আদালত পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে বলেছে প্রশাসনকে। যেখানে জুডিশিয়াল অফিসাররা কাজ করবেন ও তাদের পরিবার বসবাস করবে, সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করতে হবে। ৭০০ জন বিচারক এসআইআরের কাজে যুক্ত রয়েছেন।
বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কঠোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্তের উদ্দেশে তিনি বলেন, "আপনি কি ভাবেন, এই ঘটনা কে বা কারা ঘটিয়েছে আমরা জানি না। আপনার রাজ্যে সব কিছু নিয়ে রাজনীতি হয়। আদালতের নির্দেশ মানার ক্ষেত্রেও রাজনীতি। সব রাজনৈতিক নেতার এই ঘটনার নিন্দা করা উচিত। এই ঘটনায় জুডিশিয়াল অফিসারদের উপরে খারাপ প্রভাব পড়বে। "
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি বলেন, "জুডিশিয়াল অফিসারদের নিরাপত্তা কমিশনের দায়িত্ব। তার জন্য যা করা দরকার, সেটা কমিশনকে করতে হবে।
বুধবার বিকেল পাঁচটা থেকে অফিসারদের আটক করে রাখা হল। নারী অফিসারদেরও আটকে রাখা হয়েছিল। তাদের জল-খাবার পর্যন্ত দেয়া হয়নি। এক মহিলা অফিসারের পাঁচ বছরের সন্তান কাঁদছিল।"
মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সর্বোচ্চ আদালত। এ নিয়ে তারা রিপোর্ট তলব করেছে। আগামী ৬ এপ্রিল এসআইআর মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে। রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্তাদের সেদিন শুনানিতে উপস্থিত থাকতে হবে। কেন কালিয়াচকের ঘটনা রোখা গেল না, সে ব্যাপারে কৈফিয়ৎ দিতে হবে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন জনসভায় বলেন, "মালদহের ঘটনার মাধ্যমে রাজ্যের বদনাম করার চেষ্টা হয়েছে। আমাদের হাতে আর পুলিশ নেই। যারা এটা করেছে তাদের প্রত্যেককে ধরা হোক। বিচারকদের গায়ে হাত দেবেন না। তাদের কাছে যাবেন না।"
বিজেপিকে তোপ দেগে তিনি বলেন, "এটা ওদের গেমপ্ল্যান। বিজেপি চায় এখানকার নির্বাচন বাতিল করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে।"
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার সংবাদমাধ্যমে বলেন, মালদার ঘটনার জন্য দায়ী তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের নেত্রী যে উস্কানি দিয়েছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে।"
রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের দাবি, পুরোটাই নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা। দলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার সংবাদমাধ্যমে বলেন, "রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসন এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। তারা একতরফাভাবে বিভিন্ন স্তরে আধিকারিকদের বদলি করেছে। মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব থেকে একেবারে নিচু স্তর অবধি। তাই অশান্তি থামাতে না পারার ব্যর্থতা কমিশনের।"
আইনজীবী জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমে বলেন, "এটা অবিশ্বাস্য যে সাতজন জুডিশিয়াল অফিসারের ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল। কারা বলছেন যে পুলিশ-প্রশাসন এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। আইন-শৃঙ্খলার এই দিকটা কিন্তু রাজ্য পুলিশ দেখবে। এখন যদি কোথাও খুন, ধর্ষণ বা ডাকাতি হয়ে যায়, তাহলে কি নির্বাচন কমিশন পুলিশকে শিখিয়ে দেবে যে, ওখানে গিয়ে তদন্ত করো।"
হাতে আর চার দিন
পশ্চিমবঙ্গের ৬০ লক্ষাধিক ভোটারের নথি যাচাইয়ে প্রক্রিয়া ৭ এপ্রিলের মধ্যে শেষ করা হবে। কলকাতা হাইকোর্ট এমনই রিপোর্ট দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় যাদের নাম থাকবে না, তারা আবেদন করবেন ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু এখনো ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করেনি।
ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের দেয়া হয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রশিক্ষণ শেষে তারা চলতি সপ্তাহে কাজ শুরু করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
তালিকা থেকে বাদ পড়া অর্থাৎ ডিলিটেড ভোটাররা কিন্তু সময় বেঁধে দিয়েছেন।
কালিয়াচকে বুধবার রাত প্রায় একটা নাগাদ বিক্ষোভ উঠে যায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তারা চার দিন সময় দিয়েছেন প্রশাসনকে। এর মধ্যে ডিলিটেড ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নইলে ফের শুরু হবে আন্দোলন।
যাদের নাম সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের আবেদন ট্রাইব্যুনালে বিচারের পর ফের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া নির্বাচনের আগে শেষ করা সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ভোট গ্রহণ করা হবে। ভোট গণনা ৪ মে।
শুধু মালদা নয়, বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ চলছে। এদিন মালদার যদুপুরে জাতীয় সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়িতে রাস্তা আটকে দেয় জনতা। এতে উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগ ছিন্ন হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
কালিয়াচকের ঘটনা প্রসঙ্গে সাবেক পুলিশ কর্তা নজরুল ইসলাম ডিডাব্লিউকে বলেন, "এটা পুরো পুলিশের ব্যর্থতা। পুলিশের ব্যর্থতা যদি নির্বাচন কমিশনের হয়, তাহলে রাজ্য সরকারেরও। ভোট ঘোষণার পরে নির্বাচন কমিশন পুলিশ-প্রশাসনের কাজ সুপারভাইজ করতে পারবে। যে কোনো অফিসারকে বদল করতে পারবে। নির্বাচন কমিশনের এই ক্ষমতা আছে। নির্বাচন কমিশনের এখানে একজন সিইও আছে। একজন সিইও-র পক্ষে সবকিছু দেখা কী করে সম্ভব? একদমই সম্ভব নয়।"
তার বক্তব্য, "রাজ্যের প্রশাসন, মুখ্যমন্ত্রী পদ, পুলিশমন্ত্রীর পদ বিলোপ হয়নি। অতএব তারা কাজ করছেন এবং তার জন্য বেতনও পাবেন। রাজ্য সরকারের অবশ্যই ভূমিকা আছে। রাজ্যপাল রাজ্য সরকারের ক্ষমতাগুলো কমিশনের অধীনে করে দেন। কেন্দ্রীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনের অধীনে করে দেন। তার মানে এখানে তো রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়নি। এখানে রাজ্য মন্ত্রিসভা বাতিল হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী আছেন, পুলিশমন্ত্রীও আছেন, সব মন্ত্রীরা কাজ করছেন, বেতন নিচ্ছেন। অতএব তাদের দায় নেই, এটা একদমই হতে পারে না।"রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী ডিডাব্লিউকে বলেন, "নারী কর্মকর্তা-সহ জুডিশিয়াল অফিসারদের সারারাত আটকে রাখা এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সহায়তায় তাদের উদ্ধারের সময় গাড়িতে ইট-পাটকেল ছোড়ার ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। বর্তমান আইনি প্রক্রিয়াগুলো সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি নির্দেশ ও পরিচালনায় ঘটছে, তাই এখানে নির্বাচন কমিশনকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। আইন মেনে চলা এই প্রক্রিয়
তার মতে, "সরকারের এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত ছিল। বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী যে দাবি করছেন যে কেউ তার কথা শুনছে না, তা ঠিক নয়। স্বয়ং প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন যে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তাকে যথাসময়ে পাওয়া যায়নি এবং পরিস্থিতির ওপর নজরদারির ক্ষেত্রেও ঘাটতি ছিল।"
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি শাসনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজাগোপাল। তিনি বলেন, "রাজনৈতিক প্রতিবাদের নামে রাস্তা আটকে বা জুডিশিয়াল অফিসারদের ঘেরাও করে কোনো গঠনমূলক সমাধান আসবে না। কোনো অভিযোগ থাকলে তা ট্রাইব্যুনাল বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জানানো উচিত ছিল। এই ধরনের বিশৃঙ্খলা ও আদালতের কাজে বাধা দেওয়ার কারণে সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশও করতে পারে, যার সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে।"