মানসিক স্বাস্থ্যে করোনার প্রভাব | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 15.10.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

মানসিক স্বাস্থ্যে করোনার প্রভাব

প্রযুক্তি নির্ভরতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, প্রতিনিয়ত নিজের এবং আপন মানুষগুলোর আক্রান্ত হওয়ার আশংকা আমাদের মধ্যে মারাত্মক উদ্বেগ, ভয় ও অসহায়ত্বের জন্ম দিয়েছে। এর সাথে সাথে ভবিষ্যত নিয়ে আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অনিশ্চয়তা।

করোনা ভাইরাসে সারা বিশ্বে এ পর্যন্ত প্রায় ২২কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় অর্ধ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২০ সালের শুরু থেকেই আমরা করোনার ভয়াবহতা লক্ষ্য করেছি। এই ভয়াবহতা আমাদের করেছে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। যত দিন যাচ্ছে আমরা অনুধাবন করতে পারছি যে, করোনা ভাইরাস আমাদের শারীরিকভাবে না যতটা প্রভাবিত করেছে তার চেয়েও বেশি প্রভাবিত করেছে মানসিকভাবে। শারীরিকভাবে আমরা এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছি প্রায় ২২ কোটি মানুষ কিন্তু মানসিকভাবে প্রভাবিত হয়েছি পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষ। পৃথিবীর এমন কোনো প্রান্ত নেই যেখানে করোনা ভাইরাস তার ছোবল দেয়নি।

করোনা ভাইরাস আমাদের এতদিনের অভ্যস্ত জীবনযাত্রাকে বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। পরিবর্তন করতে হয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে, আমাদের সামাজিক জীবনযাত্রা, কর্মজীবন ও আমাদের পারিবারিক জীবনকেও। এই সকল পরিবর্তন আমাদের সম্মুখীন করেছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। সামজিক দুরত্ব বজায় রাখার মত একটি অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যবিধি আমাদের দীর্ঘদিন মেনে চলতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। বার বার হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজ করার মত আচরণগত পরিবর্তনের সাথে আমাদের অভ্যস্ত হতে হয়ে হয়েছে। এর ফলে আমাদের গতানুগতিক সামাজিক সংযোগ যেভাবে ব্যাহত হয়েছে তেমনি ব্যহত হয়েছে আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনও। এর সাথে সাথে করোনা আমাদের প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীলতাকে তরান্বিত করেছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে প্রযুক্তিগত এই নির্ভরশীলতা হয়ত অচিরেই আমাদের নিতে হত। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে আমরা কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায়ই এই বিরাট পরিবির্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। শিল্প বিপ্লবের এই যে ট্র্যাঞ্জিশনের মধ্যে দিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি তা আমাদের মধ্যে তৈরি করেছে মানসিক কিছু ইস্যু। অবধারিত প্রযুক্তি নির্ভরতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, প্রতিনিয়ত নিজের এবং আপন মানুষগুলোর আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আমাদের মধ্যে মারাত্মক উদ্বেগ, ভয় ও অসহায়ত্বের জন্ম দিয়েছে। এর সাথে সাথে ভবিষ্যত নিয়ে আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অনিশ্চয়তা।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে আমাদের প্রত্যেকেরই প্রতিনিয়ত নানা রকমের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এবং হচ্ছে । অফিস করেছি অনলাইনে, মিটিং করেছি অনলাইনে, ক্লাস করেছি অনলাইনে, ডাক্তার দেখিয়েছি অনলাইনে এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানও করেছি অনলাইনে। এর সাথে সাথে কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা ইত্যাদি সবকিছুই করতে হয়েছে অনলাইনে। এগুলো কিন্তু আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ছিল না। এর জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের নতুন কিছু শিখতে হয়েছে এবং নতুন কিছুর সাথে খাপ খাওয়াতে হয়েছে। এই নতুন শেখা এবং খাপ খাওয়ানো আমাদের সম্মুখীন করেছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের। আর মানুষ যখনই চ্যালেঞ্জের সম্মূখীন হয় তখনই তার নিজস্ব ডিফেন্স মেকানিজমগুলো অবচেতনভাবেই কাজ করা শুরু করে। যারা আমরা নিজস্ব ডিফেন্স মেকানিজম ব্যবহার করে চ্যালেঞ্জের সাথে খাপ খাওয়াতে পেরেছি তারা তো এ যাত্রায় উতড়ে গিয়েছি। যারা পারিনি তাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে রাগ, বিরক্তি, অস্থিরতা, ভয়, হতাশা ইত্যাদি।

আমাদের পারিবারিক জীবনেও পরিবারের সদস্যদের সাথে এতটা নিরবচ্ছিন্ন সময় বোধহয় এর আগে আমরা কাটাইনি। এই অদৃশ্য ভাইরাস আমাদের বাধ্য করেছে পরিবারের সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে সময় কাটাতে। প্রথম প্রথম ভালোই লাগছিল সবার। কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা রিপোর্ট পেতে শুরু করলাম যে অনেক পরিবারে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের হার বেড়ে গেছে। শিশু এবং নারীদের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এর ফলে ধীরে ধীরে পারিবারিক সম্পর্কগুলোর উপর একধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করল। মানুষের নিজের জীবনের অস্থিরতা, ক্ষোভ, বিরক্তি ইত্যাদির বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর এক নিরাপদ স্থান হিসেবে পরিবারের সদস্যদের উপর সহিংসতা বাড়তে শুরু করল।

এর সাথে সাথে আমরা লক্ষ্য করলাম যে সাধারণ মানুষ তার কর্মক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাটাই প্রক্রিয়া শুরু করল। সকল লেভেলের কর্মীদের ছাটাই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। যারা ছাটাইয়ের শিকার হননি তারাও আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পর্যবসিত হল। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসায় লস হওয়ার কারণে কর্মীদের বেতন এবং অন্যান্য সুবিধাদি কমিয়ে দিতে বাধ্য হল। ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাতে না পেরে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হল। এর ফলে এর সাথে জড়িত লাখ লাখ মানুষ এবং তাদের পরিবার এক মারাত্মক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হল। এই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আমাদের মত সাধারণ মানুষদের এক চরম মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে দিল। আমাদের মত দেশগুলোতে যেখানে একজন মানুষের সামাজিক সুরক্ষা বলয় বা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা নেই সেখানে এই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আমাদের মধ্যে জন্ম দিল মানসিক উদ্বেগ ও মানসিক চাপ। যার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পেয়েছি মানুষের আচরণে। মানুষের অল্পতেই রেগে যাওয়া, অস্থিরতা, মনোসংযোগে ব্যাঘাত, আক্রমনাত্মক আচরণ করা ইত্যাদি তার মানসিক চাপ ও উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।

কর্মক্ষেত্রে আমরা আরেকটি বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। তা হলো নতুন নতুন কাজের উৎপত্তি। পুরোনো অনেক কাজ বিলুপ্ত হয়ে কাজের বাজারে খাবার ডেলিভারি, খাবারে ছবি তোলা, অনলাইন ট্রেইনার, অনলাইন টিচিং ইত্যাদি নতুন কিছু কাজ তৈরি হল, । এগুলোর সাথে সাথে বেশ কিছু কাজ বিলুপ্তির মুখে পতিত হল। নতুন জবের সাথে অভ্যস্ত হওয়া এবং পুরোনো জবের বিলুপ্তি দুটোই মানুষকে মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মুখে ফেলে দিল যার প্রভাব আমরা তাদের আচরণের মধ্যে লক্ষ্য করেছি।

Selim Hossain Dhaka Universität

মোঃ সেলিম হোসেন, সহকারী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পারিবারিক, সামাজিক ও কর্মজীবনের প্রভাব ছাড়াও করোনা ভাইরাস আমাদের স্বাস্থ্য বিষয়ক দুশ্চিন্তাকে প্রকট আকার ধারণ করাতে বাধ্য করেছে। সবসময় নিজের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাতো আছেই তার সাথে সাথে নিজের কারনে যদি পরিবারের অন্য কারও আক্রান্ত হতে হয় সেজন্য সবসময় অবচেতন মানসিক চাপের মধ্যে আমাদের থাকতে হয়েছে। আমার দ্বারা যেন আমার পরিবারের শিশু বা বয়স্করা কেউ আক্রান্ত না হয় সেজন্য আমাদের সবসময় অতিমাত্রায় সতর্ক থাকতে হয়েছে। দীর্ঘসময় এই অতিসতর্ক থাকার ফলে আমাদের মন এবং শরীর অবচেতনভাবেই হাইপার ভিজিলেন্ট (অতি সতর্ক) হয়ে পড়েছে। এর ফলে আমাদের শরীর ও মন খুব অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। আমাদের নিয়মিত ঘুমের ব্যঘাত ঘটেছে। আমরা অনেকের কাছ থেকেই  রিপোর্ট পেয়েছি যে তাদের ঘুমের পরিমাণ এবং কোয়ালিটি দুটোই ব্যহত হয়েছে।

এছাড়াও যেসকল পরিবার এই সময়ে করোনা আক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে যেতে হয়েছে আরো মারাত্মক মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে। প্রথমত, নিজের মধ্য আক্রান্ত হওয়ার জন্য গিল্টি ফিলিং তৈরি হয় এবং এর সাথে সাথে প্রতিবেশীদের নেতিবাচক আচরণের কারণে নিজের আত্ম-মর্যাদায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এবং এই নেতিবাচক আত্ম-মর্যাদাবোধ অনেকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকে। দ্বিতীয়ত, করোনার চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে শুরু থেকেই আমাদের এখানে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। যদিওবা চিকিৎসা পাওয়া যায়, তার জন্য খরচ করতে হয় অনেক অর্থ। এই অর্থ যোগান সবার জন্য সহজ নয়। এমন অনেক পরিবার আছে যারা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে যেয়ে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছেন। এই অর্থনৈতিক চাপ আমাদের মারাত্মক মানসিক চাপের মধ্যে ফেলেছে যার থেকে আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা ও এক ধরনের অসহায়ত্বের অনুভুতি।

তদুপরি আমাদের সকল পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ এক দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করেছে। কোন পক্ষ থেকে সঠিক কোন দিক নির্দেশ না পেয়ে তারা হয়ে পড়েছে হতাশ। পড়াশোনা শেষ করা চাকরীপ্রার্থীরা বেকার জীবনযাপন করে হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে। এরকম হতাশা থেকে অনেকেই হয়ে পড়েছে মাদকাসক্ত। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায়ও কিশোর ও তরুণ বয়সীদের মাদকাসক্তির হার বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গিয়েছে। আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মানসিক সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ভুমিকা রেখেছে সুস্থ বিনোদনের অভাব। আমরা বিগত দুই দশক ধরেই লক্ষ্য করছি যে, আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণেরা বিনোদনের জন্য ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। খেলার মাঠের অভাব, সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ কমে যাওয়া, স্কুলের পড়ার চাপ ইত্যাদি আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণদের করেছে বাক্সবন্দি। এর ফলে তাদের বিনোদন প্রায়শই হয়েছে একমুখী ও নিষ্ক্রিয়। সক্রিয় ও দ্বিমুখী বিনোদন থেকে বঞ্চিত হয়ে আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণেরা ধীরে ধীরে বিভিন্ন মানসিক সমস্যার মধ্যে পর্যবশিত হচ্ছে। আর করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এই হার ত্বরান্বিত হয়েছে বেশ জোরালোভাবেই। তাদের সামাজিক যোগাযোগের যে দক্ষতা সেখানেও ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

এরকম একটি অবস্থায় প্রশ্ন আসতেই পারে যে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সৃষ্ট মানসিক সমস্যা প্রতিরোধে আমরা কি করতে পারি। আমরা বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামতে যে বিষয়টা লক্ষ্য করছি তা হচ্ছে ব্যক্তিনির্ভর কিছু সমাধান। ব্যক্তির পারিবারিক বন্ধন দৃঢ়করণ, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা, সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো, বিনোদনের সক্রিয় মাধ্যমের দিকে জোর দেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে এই মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এটাও সত্য যে এ ধরনের ব্যক্তিনির্ভর সমাধান প্রস্তাব করে আমরা আসলে এই মানসিক সমস্যার দায় ব্যক্তির উপরেই চাপিয়ে দিচ্ছি। ব্যক্তিনির্ভর সমাধান দিয়ে আমরা যে এই সমস্যাকে সাসটেইনেবল উপায়ে মোকাবেলা করতে পারব তা কিন্তু নয়।

বড় যে পরিবর্তন দরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা মনে হচ্ছে এখনো অদৃশ্যের হাতে নিজেদের ছেড়ে দিয়েছি। ভালো হলে ক্রেডিট প্রতিষ্ঠানের আর খারাপ হলে ব্যক্তির। তাই এর টেকসই সমাধানে মানসিক স্বাস্থ্যকে শুধুমাত্র মাইক্রো লেভেল থেকে দেখলে এই সমস্যার সমাধান হবে না। মানসিক স্বাস্থ্যকে ম্যাক্রো লেভেল থেকে দেখতে হবে। আমার সামাজিক, অর্থনৈতিক, ও বিনোদনের দায় রাষ্ট্রকে, সমাজকে, ও কমিউনিটিকে নিতে হবে। তাহলেই এই সমস্যা থেকে আমরা দীর্ঘমেয়াদে বের হয়ে আসতে পারব।

সংশ্লিষ্ট বিষয়