মানবাধিকার কর্মীদের দৃষ্টিতে আনিস হত্যা ও তদন্ত | বিশ্ব | DW | 24.02.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

মানবাধিকার কর্মীদের দৃষ্টিতে আনিস হত্যা ও তদন্ত

ছাত্রনেতা আনিস খানের মৃত্যুকে ঘিরে এখনো উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ। আনিসের পরিবার এখনো সিবিআই তদন্তের দাবিতে অনড়৷ পুলিশে আস্থা নেই তাদের৷ মানবাধিকার কর্মীরা কীভাবে দেখছেন প্রতিবাদী এক তরুণের রহস্যজনক মৃত্যুকে?

কলকাতার রাজপথে আনিস হত্যার প্রতিবাদ

কলকাতার রাজপথে আনিস হত্যার প্রতিবাদ

আনিসের পরিবার শুরু থেকেই বলছে, পুলিশই দায়ী৷ শুক্রবার গভীর রাতে পুলিশই গিয়েছিল আমতার বাড়িতে, তারাই ছাদ থেকে ফেলে দেয় ২৮ বছর বয়সি আনিসকে৷

তীব্র দাবির মুখে ঘটনা তদন্তে রাজ্য পুলিশের বিশেষ তদন্ত দল (সিট) গঠন করা হয়েছে৷ ১৫ দিনের মধ্যে তাদের রিপোর্ট দেওয়ার কথা। তবে আনিসের বাবা সালেম খানসহ তাঁর পরিবারের সদস্যরা শুরুতেই তুলেছিলেন সিবিআই তদন্তের দাবি৷ সিট গঠন, পর এক সিভিক পুলিশ ও এক হোম গার্ডকে গ্রেপ্তারের পরও সালেম খান নিজের অবস্থানে অনড়৷  তিনি আবার জানিয়েছেন, যে পুলিশের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, সেই পুলিশের তদন্ত প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত  করবে তা তিনি বিশ্বাস করেন না৷ অন্যদিকে রাজ্যের শিক্ষার্থীরাও আনিস হত্যার প্রতিবাদ ও সিবিআই তদন্তের দাবিতে সোচ্চার৷

আনিস হত্যায় প্রতিবাদমুখর পশ্চিমবঙ্গ

আইনের শাসন, নাকি শাসকের আইন?

মানবাধিকার কর্মী রঞ্জিত শূর ডয়চে ভেলেকে বলেন, "আমতার পাশাপাশি আমরা বাগনানের পুলিশকেও সন্দেহ করছি। আনিসের বাগনান এলাকাতেও কর্মকাণ্ড ছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো পুলিশ আধিকারিককে অপসারণ করা হয়নি। সবাইকে নিজের নিজের জায়গায় রেখে দিয়ে কীভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত হতে পারে? সন্দেহ রয়েছে।”

কার্টুন মেইলে পাঠানোয় এক সময় গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন অম্বিকেশ মহাপাত্র৷ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক ও মানবাধিকারকর্মী বলেন , "এ রাজ্যের পুলিশ বিরোধীদের কণ্ঠ রোধ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই এক্ষেত্রে তদন্ত ঠিকঠাক হবে না- বলাই যায়। পুলিশের জেলে পোরা, মিথ্যে মামলা দেওয়া থেকে বোঝা যায় পুলিশ দলদাস হিসেবে কাজ করে। আমার ক্ষেত্রে দেখেছি। ভোটপরবর্তী হিংসায় হাইকোর্ট কিছু ক্ষেত্রে যথার্থ পর্যবেক্ষণ করেছে, এ রাজ্যে আইনের শাসনের বদলে শাসকের আইন কাজ করছে।”

তদন্ত কমিটিতে সেই জ্ঞানবন্ত সিং!

রাজ্যের বিশেষ তদন্তকারী দল সিটের নেতৃত্বে থাকা পুলিশকর্তা জ্ঞানবন্ত সিংয়ের বিরুদ্ধে আঙুল তুলছেন মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীরা। মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র বলেন, "বাম আমলে রিজওয়ানুরের ক্ষেত্রে ও বহু ক্ষেত্রে জ্ঞানবন্ত সিং মানবাধিকার লঙ্খন করেছেন। যে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে অতীতের, তাকেই দায়িত্ব দেওয়ার কী অর্থ?” রঞ্জিত শূরের বক্তব্য, "অতীতে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এমন পুলিশ আধিকারিককে দায়িত্ব দিলে তদন্ত ঠিকঠাক হবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ জাগবেই। এছাড়া এই ঘটনায় শাসকদলের যোগ থাকলে তিনি আড়াল করবেন কিনা সেটাও আমরা জানি না।”

এ রাজ্যের পুলিশ বিরোধীদের কণ্ঠরোধ রোধ করার কাজে ব্যবহৃত হয়: অম্বিকেশ মহাপাত্র

গ্রেপ্তার ‘চুনোপুঁটি'

তদন্তকারীরা বুধবার এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এক হোম গার্ড, ও এক সিভিক ভলেন্টিয়ারকে গ্রেফতার করেছে। মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, এরা সব চুনোপুঁটি, আড়ালে আছে রাঘববোয়ালরা।

ময়নাতদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

পুলিশ যেভাবে ময়নাতদন্ত করেছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সুজাত ভদ্র বলেন, "নিয়ম অনুযায়ী পরিবারের সদস্যের উপস্থিতিতে ময়নাতদন্ত করতে হয়। এক্ষেত্রে অতি দ্রুত ময়নাতদন্ত করা হয়েছে, তাহলে কি পুলিশ কোনো তথ্য গোপন করার জন্য একাজ করেছে?” ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখনো সামনে আসেনি। তদন্তকারীরা দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের আরজি রেখেছিলেন মৃতের পরিবারের কাছে। যদিও সালেম সাবির জানিয়েছেন সিআইডিকে ময়নাতদন্ত করতে দেবেন না, একমাত্র সিবিআই দ্বিতীয়বার ময়না তদন্ত করতে পারে

সেই মমতা, এই মমতা

আনিসের মৃত্যুর পরও বারবার উঠে আসছে রিজওয়ানুর রহমানের মৃত্যুর প্রসঙ্গ। ২০০৭ সালে রিজওয়ানের মৃত্যুর পর উত্তাল হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ। সেই সময় তৎকালীন বাম সরকারের বিরুদ্ধে পুলিশের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। তখন বাম সরকার ছিল পুলিশি তদন্তের পক্ষে আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাস্তায় নেমেছিলেন সিবিআই তদন্তের দাবিতে৷ মানবাধিকার কর্মী রঞ্জিত শূর বলেন, "২০০৭ সালে যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে দেখেছি, আজ ২০২২ সালে সেই জায়গায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবর্তন হলো কোথায়?” মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রঞ্জিতের অভিযোগ, "আনিসের বাড়িতে মুখ্যমন্ত্রীর যাওয়া উচিত ছিল। একজন সদ্যমৃত জোয়ান ছেলের বাবাকে মুখ্যমন্ত্রী নবান্নে দেখা করতে বলেছেন। এটা কি মানবিক সরকারের কাজ? তিনি কি আনিসের বাড়ি যেতে পারতেন না? উপরন্তু আনিসের পরিবারকে টাকা ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়েছেন।” মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, শোকার্ত ছাত্ররা যখন স্মারক জমা দিতে যাচ্ছিলেন, পুলিশ পিটিয়েছে তাদের, গ্রেপ্তার করেছে। এটা কোনোভাবেই আইনসম্মত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়৷

সবাইকে নিজের জায়গায় রেখে দিয়ে কীভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত হতে পারে: রঞ্জিত শূর

আনিসের চরিত্র হননের চেষ্টা

আনিস খান বরাবর পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের বিরোধী রাজনীতি করে এসেছিলেন। কখনো সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের পক্ষে, কখনোবা ভোটের আগে তৈরি হওয়া ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফের হয়ে।

যদিও আনিসের সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, তিনি নির্বাচনে তৃণমূলকে সহযোগিতা করেছিলেন। তার সঙ্গে নাকি শাসকদলের যোগাযোগ ছিল। আনিসকে ‘আমাদের ফেভারিট ছেলে' তকমা দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। সালেম খান মমতার এই দাবি খারিজ করে বলেছেন, ‘‘আনিস বরাবর তৃণমূলের বিরুদ্ধে রাজনীতি করেছে। সে সিএএ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকলেও তৃণমূলের পতাকা হাতে নেয়নি।'' মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে আনিসের ‘রাজনৈতিক চরিত্র হনন' আখ্যা দিয়েছেন রঞ্জিত শূর। তিনি বলেন, "মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য যেমন আনিসের রাজনৈতিক চরিত্র হনন করেছে, তেমনি পুলিশের তার বিরুদ্ধে নানা কেস দেওয়াতে তার ব্যক্তিগত চরিত্র হনন হয়েছে। এটা পুরোটাই একটা ‘ছক', যাতে জনমানসে আনিসের ভাবমূর্তি নষ্ট করা যায়।”

সিবিআই তদন্তে সমাধান?

ইতিমধ্যে কলকাতা হাইকোর্ট আনিস হত্যায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা গ্রহণ করেছে। সিবিআই তদন্ত হবে কিনা তা আদালত ঠিক করবে। তবে মানবাধিকার কর্মীদের কেউ কেউ চাইছেন, কর্মরত কোনো বিচারপতির অধীনে তদন্ত হোক। আনিসের পরিবার সিবিআই তদন্ত চাইলেও তার উপর আস্থা নেই কোনো কোনো মানবাধিকার কর্মীর। সুজাত ভদ্র তাদেরই একজন৷ তিনি  বলেন, "ভিখারি পাসওয়ান বা রিজওয়ানুরের মামলার কী হাল? কোনো ন্যায়বিচার পাওয়া যায়নি। সিবিআই ব্যর্থ।”

নির্বাচিত প্রতিবেদন