মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, করোনা কি কেবল পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে ঢুকবে | বিশ্ব | DW | 11.05.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, করোনা কি কেবল পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে ঢুকবে

পেট্রাপোল বন্ধ থাকবে, গেদে-দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পণ্য পাঠাতে আপত্তি নেই পশ্চিমবঙ্গের। কেন্দ্রকে নতুন শর্ত জানালো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার।

করোনা কি সীমান্ত দেখে সংক্রমিত হয়? সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে এই প্রশ্নটি খুব গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, রাজ্য সরকার জানিয়েছে, পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি আছে, কিন্তু গেদে-দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ট্রেনে পণ্য পরিবহণে তাদের আপত্তি নেই।

সমস্যার সূত্রপাত গত বুধবার। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রসচিব পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবকে চিঠি দিয়ে জানতে চান, কেন পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পণ্য পরিবহণ করতে দিচ্ছে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার? এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে জানান তিনি। দ্রুত যাতে সীমান্ত খুলে দিয়ে বাণিজ্য শুরু করা হয়, সেই নির্দেশও দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব।

বস্তুত, গত বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে হাজার হাজার ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে ওই সীমান্তে। প্রতিটি ট্রাকেই রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী। অভিযোগ, আটকে থাকার কারণে বেশ কিছু পণ্য নষ্টও হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, যে সমস্ত ট্রাক বাংলাদেশে চলে গিয়েছিল, সেগুলিকেও পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে চরম অব্যবস্থা তৈরি হয়েছে এলাকায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুক্তি ছিল, সীমান্ত খুলে দিলে বাংলাদেশ থেকে করোনা সংক্রমণ পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়বে। এ হেন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের চিঠির উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার জানিয়েছে, গেদে সীমান্ত দিয়ে রেলপথে পণ্য পরিবহণে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সড়ক পথে আপত্তি আছে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছেন প্রবীণ সাংবাদিক মিলন দত্ত। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেছেন, ''করোনা কি কেবল সড়ক পথেই সংক্রমিত হয়? রেলে কি কোনও ছাড় আছে? না কি গেদে সীমান্তে করোনা কম হচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই বক্তব্যের কোনও যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না।'' মিলনবাবুর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গ দেশের অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে সীমানা বন্ধ করে দেয়নি। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহণ হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে যদি সমস্যা না থাকে, তা হলে বাংলাদেশ সীমান্তেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। নিছক সংকীর্ণ রাজনৈতিক কারণে পশ্চিমবঙ্গ এই কাজ করছে।

প্রায় একই বক্তব্য সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর। ডয়চে ভেলেকে তিনি জানিয়েছেন, ''রাজ্য জুড়ে অরাজকতা চলছে। করোনা পরিস্থিতি সামলাতে এই সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে রাজ্যেরই ক্ষতি হচ্ছে। এটাও তেমনই এক সিদ্ধান্ত।'' সুজনবাবু জানিয়েছেন, শুধুমাত্র পেট্রাপোল সীমান্তেই নয়, উত্তরবঙ্গের বহু সীমান্তবর্তী এলাকাতেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভুল নীতির কারণে সাধারণ মানুষ চরম সংকটে পড়েছেন। আইন মেনে কাঁটাতার পেরিয়ে যে সমস্ত চাষী ও পারে চাষ করতে যান, তাঁদের ফসল মাঠেই নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার লকডাউনের যুক্তি দেখিয়ে তাঁদের ফসল কাটতে যেতে দিচ্ছে না। এ নিয়ে বিডিও-কে ডেপুটেশন দিয়েও লাভ হয়নি। শুধু তাই নয়, বহু শ্রমিক খুলনায় কাজ করতে গিয়েছিলেন, তাঁদেরও ফেরানোর বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন রাজ্য সরকার। এমনই অরাজক পরিস্থিতি।

রাজ্যের স্বরাষ্ট্ররসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য আগেই জানিয়েছিলেন, পেট্রাপোল সীমান্তে কিছু আঞ্চলিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। রাজ্য সরকার সে বিষয়গুলিকে মাথায় রেখেই সীমান্তে পরিবহণ বন্ধ রেখেছে। কী সেই আঞ্চলিক সমস্যা? স্থানীয় কিছু মানুষ রাস্তা অবরোধ করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সীমান্ত খুললে করোনার সংক্রমণ বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে এমনিতেই করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে রাজ্য সরকার তথ্য 'গোপন' করেছে। এখন আসল চিত্র সামনে আসছে। গোটা বিশ্বে যেখানে করোনায় মৃত্যুর হার চার শতাংশের নীচে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে তা প্রায় ১০ শতাংশ। এর থেকেই প্রমাণিত হয়, রাজ্য সরকার করোনা প্রতিরোধে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ সীমান্ত আটকে রেখে রাতারাতি অবস্থার উন্নতি হবে না। বস্তুত বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, সীমান্ত বন্ধ রেখে যদি সত্যিই করোনা থেকে রক্ষা পাওয়া যেত, তা হলে প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সীমানাও বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পাঠাতেই হয়। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের আনা নেওয়া করতেই হয়। বাংলাদেশ সীমান্ত বন্ধ রেখেও আসলে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ব্যবসায়ীদের সমস্যায় ফেলা হচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভারতের সব চেয়ে বড় বাণিজ্যবন্ধু। বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা হয় দুই দেশের মধ্যে। এবং এর ফলে সব চেয়ে বেশি উপকৃত হন পশ্চিমবঙ্গের ছোট এবং মাঝারি ব্যবসায়ীরা। সীমান্তে অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীর পরিবহণ বন্ধ করে অকারণে সেই ব্যবসায়ীদের সমস্যায় ফেলছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ মনে করছেন এটা আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংকীর্ণ রাজনীতি। ঠিক যে কারণে তিনি তিস্তা জলবন্টন চুক্তি ঝুলিয়ে রেখেছেন, ঠিক সে কারণেই এখন পণ্য পরিবহণ বন্ধ করে রেখেছেন। তিস্তা চুক্তি ঝুলিয়ে রেখে তিনি উত্তরবঙ্গের এক অংশের মানুষের ভোট কিনতে চান। তাঁদের বোঝাতে চান, বাংলাদেশকে জল না দিয়ে তিনি আসলে পশ্চিমবঙ্গের উপকার করছেন। যদিও বিজ্ঞানী ও গবেষকদের অনেকরই বক্তব্য, এই যুক্তি বাস্তবসম্মত নয়। তিস্তার জল বাংলাদেশকে ছাড়লে রাজ্যের খুব বড় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। একই রকম ভাবে উত্তর ২৪ পরগনায় পণ্য পরিবহণ বন্ধ রেখে তৃণমূল সরকার স্থানীয় মানুষের ভোট কিনতে চাইছে বলে অনেকে মনে করছেন। দেখানোর চেষ্টা করছে, এলাকাবাসীকে নিয়ে তারা কতটা চিন্তিত। মনে রাখা দরকার, শেষ লোকসভা ভোটে ওই অঞ্চলে তৃণমূলের ফলাফল খুব ভালো হয়নি। ২০২১ সালে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন।

সংকীর্ণ রাজনীতি করতে গিয়ে সংকট আরও বড় না হয়ে যায়। পণ্য পরিবহণ নিয়ে বাংলাদেশ এখনও মুখ খোলেনি। কিন্তু চাইলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সামনে এনে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারে। মাত্র কয়েক মাস আগে পেঁয়াজ রপ্তানি নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে এই সংকট তৈরি করে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরিতা তৈরি হলে তা ভারতের পক্ষে মোটেই ভালো হবে না। ভালো হবে না পশ্চিমবঙ্গের জন্যও।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন