‘মরার ভয়ে কেউ এখন আসে না′ | আলাপ | DW | 06.08.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘মরার ভয়ে কেউ এখন আসে না'

করোনার মধ্যে কীভাবে চলছেন যৌনকর্মীরা? কেউ কি তাদের খোঁজ খবর নিচ্ছে? কেউ কি পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন? ডয়চে ভেলেকে এসবই জানিয়েছেন রাজবাড়ির দৌলতদিয়া পতিতা পল্লীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যৌনকর্মী।

ডয়চে ভেলে : করোনার এই কঠিন সময় কীভাবে পার করছেন?

পাংকি (ছদ্মনাম) : কিছু অনুদান পেয়েছি। নারী ঐক্যের সভানেত্রী ঝুমুর, মুক্তি মহিলা পরিষদ, কেকেএস, শাপলাসহ বিভিন্ন সংগঠন কিছু কিছু অনুদান দিয়েছে।

এই অনুদান কি সবাই পেয়েছে?

সবাই পেয়েছে। কিন্তু এবার কম পেয়েছে। ২০২০ সালে করোনার শুরুতে সবাই পেয়েছে। এবারও সবাই পেয়েছে। কিন্তু কম পেয়েছে। গত বছর ৪/৫ বার পাওয়া গেছে। এবার আর অত পাওয়া যায়নি। তখন গণস্বাস্থ্যও কয়েকবার দিয়েছে।

যে সহযোগিতা আপনারা পাচ্ছেন, তা দিয়ে জীবন চলছে?

না না, চলাই কষ্ট। মেয়েরা তো বাড়িওয়ালার ঘরভাড়া দিচ্ছে না, কারেন্ট বিল দিচ্ছে না। খাইতেই তো পারছে না। দিবে কীভাবে? কাস্টমার আসে না। চলাই তো খুবই কষ্ট।

তাহলে আপনারা চলছেন কীভাবে? 

ওই যে ধার-দেনা, পেট তো চালাতে হবে। খাইতে তো হবে।

এই দেড় বছরে কেউ কি আপনাদের কাছে এসেছে?

এমনি টুকটাক দু-একজন আসে। মেয়েদের পরিচিত আছে না? তারা আসে।

এই সময় নিজেদের কীভাবে সুরক্ষিত রেখেছেন?

আমরা মাস্ক ব্যবহার করি। যারা অনুদান দিছে, তারা মাস্কও দিছে, সাবানও দিছে। অনেক মেয়ে মাস্ক কিনেও নেয়।

আপনি কীভাবে চলছেন এই সময়ে?

আমারও চলা কষ্ট। স্বামীর-টাকা পয়সা আমরা রাখছি না, সেই টাকা ভেঙে খাচ্ছি, অনুদান পাচ্ছি, তারপরও বলবো, জমা টাকা ভেঙে খাচ্ছি।

অন্যদের অবস্থাও কী একই?

না না, অনেকের অবস্থা করুণ। সবাই তো আমার মতো স্বচ্ছল না। অনেকের দিন কামাই, দিন খাওয়া। 

অডিও শুনুন 09:14

খাইতেই তো পারছে না, বাড়িভাড়া দিবে কীভাবে: পাংকি

তারা কীভাবে চলছে?

তাদের খুবই কষ্ট।

কী ধরনের সহযোগিতা আপনারা পেয়েছেন?

অনেক সংস্থা থেকে টাকাও দিয়েছে। চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ, ডিম, শুকনো মরিচ, মানে রান্না করে খাইতে যা যা লাগে সব দিছে।

যারা বয়স্ক আছে, তাদের কীভাবে চলছে?

তাদেরই বেশি কষ্ট। যারা একটু অ্যাক্টিভ, বয়স কম, তারা একটু ভালো আছে। তাদের কাছে দু-একজন কাস্টমার আসে।  

বয়স্কদের কাছে তো এখন কেউ আসেও না, তাহলে তারা চলেন কীভাবে?

না, তাদের কাছে কেউ আসে না। তারা মাসীর কাজ করে। যেমন, মেয়েদের ঘর মোছা, রান্না করা, কাপড়চোপড় ধুয়ে দেয়া।

ভেতরে কী এই ধরনের কাজ করার সুযোগ আছে? 

জ্বী, জ্বী, জ্বী।

অনেক শিশুও তো আছে, তাদের কীভাবে সুরক্ষিত রেখেছেন?

এটা তো আমি সঠিক বলতে পারবো না। তবে এমএমএস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ছিল অনেক শিশু। আর পায়াক্ট নামে আরেক সংগঠনে আছে ১৮-১৯ জন। এই সংগঠনের পরিচালক আবু ইউসুফ চৌধুরী এই শিশুদের দেখাশোনা করেন।

শিশুদের খাওয়া -দাওয়া কীভাবে হচ্ছে?

যার প্রজেক্টে থাকে, সে-ই চালাচ্ছে। আবার মায়েরাও কিছু কিছু দিচ্ছে।

আপনাদের কি টিকার কোনো ব্যবস্থা হয়েছে?

জ্বী, জ্বী, জ্বী। আগামী ৭ তারিখ থেকে ইউনিয়ন অফিস থেকে দেবে। ভেতরে আমরাই মেয়েদের বলছি, ভোটার কার্ড থাকলেও দেবে, না থাকলেও দেবে। গণহারে টিকা দেওয়া হবে। যাদের ভোটার আইডি কার্ড বা জন্ম নিবন্ধনের কাগজ আছে, তারা নিয়ে যাবে।

এখানে যাদের বয়স ১৮ বছরের বেশি, সবার কি ভোটার আইডি কার্ড আছে?

প্রত্যেকেরই আছে। আবার অনেকে হারিয়ে ফেলেছে। এটাকে এরা গুরুত্ব দেয়নি। যারা গুরুত্ব না দিছে তাদের তো সমস্যা।

কীভাবে আপনাদের টিকার ব্যবস্থা হচ্ছে? 

ভেতরের মেয়েদের তো বিভিন্ন এনজিও সেবা দেয়। ইউনিয়ন অফিস থেকে এনজিও ওয়ালাদের ডেকেছিল। তারাই বলেছে, মেয়েদের তো টিকা দিতে হবে। তখন বলেছে, ইউনিয়ন অফিস থেকে ৭ তারিখ থেকে দেওয়া হবে।

আপনাদের পল্লীর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা কেমন?

মোটামুটি ভালোই। কারণ, কাস্টমার তো এখন ঢোকে না। এখানে ঢুকতে দেয় না পুলিশ।

কেন ঢুকতে দেয় না?

পুলিশ ঢুকতে দেবে কী, ভয়ে তো তারা ঢোকেই না। এতবড় একটা মহামারি রোগ, কেউ মরার জন্য ঢোকে নাকি, বলেন? মরার ভয়েই তো তারা কেউ আসে না।

আপনাদের মধ্যে কি কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে?

আমাদের এক আপার হয়েছিল। এখন তিনি যশোরের বাড়িতে হোম কোয়ারান্টিনে আছেন। তিনি বয়স্ক তো, হালকা জ্বর হলে বাড়ি চলে যান। পরে পরীক্ষা করে পজিটিভ ধরা পড়ে। তিনি বর্তমানে সুস্থ, বাড়িতেই আছেন।

এ পর্যন্ত একজনই কি পজেটিভ হয়েছে?

হ্যাঁ।

সরকারের তরফ থেকে কি আপনাদের খোঁজ-খবর নেওয়া হয়েছে?

অনুদানগুলো তো সরকারই দিচ্ছে। আমরা কোরবানিতে মাংস পেলাম। এছাড়া চাল, ডাল, তেল এগুলো তো আমরা রাজবাড়ির ডিসির মাধ্যমে পেয়েছি। সরকার থেকে তার কাছে এসেছে। পরে তিনি পাঠিয়েছেন। ডিআইজি হাবিবুর রহমানের দপ্তর থেকেও এসেছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, না সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা বেশি এসেছে?

সরকারের তরফ থেকেই বেশি এসেছে।

আপনাদের পল্লীতে কতজন মেয়ে থাকেন?

সঠিক হিসাব তো বলতে পারবো না। এক হাজার দুইশ' থেকে দেড় হাজার যৌনকর্মী হতে পারে।

করোনার কারণে পেশা ছেড়ে কি কেউ চলে গেছেন?

গেছে, আমার এক বান্ধবী গেছে।

উনি কেন চলে গেছেন?

করোনার মধ্যে চলবে কী করে? বয়স ৫০ হয়ে গেছে। তার এক ছেলে, এক মেয়ে। এভাবে কষ্ট করে থাকতে না পেরে চলেই গেছে। তার মেয়েটা প্রতিবন্ধী।

এখানে যারা থাকে, তাদের সবার কি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?

না, অনেকেরই নেই। অনেকেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। পরিবার তো এটা মেনে নেয় না। অনেকের আছে, অনেকের নেই।

এই অবস্থায় যাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, তারা কীভাবে টিকে আছে?

তারা নিজের মতো করে নিজেরা থাকছে। এরা তো আর এখন ছোট না, বড়। তারা তো বোঝে।

এখানে যারা আছে, তারা সবাই কি ১৮ বছরের বেশি বয়সের?

সবাই ১৮ বছরের বেশি। কম নেই।

অনেক সময় অভিযোগ আসে, ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদেরও এই ব্যবসায় আনা হয়েছে?

এগুলো পতিতার মেয়ে। এখন আমার যদি একটা মেয়ে থাকে, তাকে কোথাও রাখার জায়গা না পায়, সবখানে ধিক্কার, লাঞ্ছনা পায়, তখন সেই মেয়েটা কী করবে? তখন ১৫-১৬ বছর বয়সেও নাম দেয়। মেয়েরাই ইচ্ছে করে নাম দেয়। মায়েরা দেয় না। এ জায়গায়, ওজায়গায় আকাম-কুকাম করে তখন বাধ্যতামূলক তাদের নাম দিয়ে দেয়।  

এখানে যারা কাজ করেন, সবার রেজিস্ট্রেশন আছে?

জ্বী, জ্বী, জ্বী।

আপনাদের স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো দেখভাল করে কারা?

সরকারও দেখে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন, অসহায় নারী ঐক্য, এমএমএস, পায়াক্ট, কেকেএস, নারী মুক্তি, গণস্বাস্থ্য আছে, তারাও দেখে। বেশিরভাগই দেখে পায়াক্ট আর গণস্বাস্থ্য।

সংশ্লিষ্ট বিষয়