মন্ত্রী চাওয়ার নতুন বছর | আলাপ | DW | 08.01.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

মন্ত্রী চাওয়ার নতুন বছর

বাংলাদেশে ২০১৮ আর ২০১৯ সাল যেন একাকার হয়ে গেছে৷ বছরের একদিন বাকি থাকতে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তারই প্রতিক্রিয়া চলছে নতুন বছরে৷ আর নতুন বছরে প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে ‘‘আমাদের এলাকায় মন্ত্রী চাই'’৷ 

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা হয়েছে, এলাকায় মন্ত্রী থাকলে উন্নয়ন বেশি হয়৷ এবার  বিরোধী দল পেয়েছে মাত্র ৭টি আসন৷ সরকারি দল বা মহাজোটময় পুরো দেশ৷ তাই পুরো দেশ থেকেই আওয়াজ উঠেছে যার যার এলাকার সংসদ সদস্যকে যেন মন্ত্রী করা হয়৷ কিন্তু বাস্তবে তো আর তা ঘটে না৷ কারণ, যত এমপি তত মন্ত্রী নয়৷ ফলে মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার হতাশা থাকবেই৷  আর এর সঙ্গে নতুন বছরে থাকছে দুর্বলতম বিরোধী দলের সংসদ, যা সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুখবর নয়৷ ২০১৪ সালের জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর ‘গৃহপালিত বিরোধী দল'-এর যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা হয়তো আরো ৫ বছর বাংলাদেশে অব্যাহত থাকবে৷ হয়তোবা ‘উপদ্রপহীন এবং শন্তিপূর্ণ' আরো  ৫টি বছর বাংলাদেশের নাগরিকদের দেখতে হবে৷ আর সত্যিকারের বিরোধী দল বিএনপি, তথা ঐক্যফ্রন্ট কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে ব্যাপারে মন্তব্য করার সময় হয়তো এখনো আসেনি৷ তবে এখন বাংলাদেশে প্রয়োজন জনপ্রত্যাশা পূরণের মতো শক্তিশালী বিরোধী দল৷ তবে সেটা চাইলেই কি পাওয়া যায়?

২০১৮ সাল ছিল নির্বাচন আর সামাজিক আন্দোলনের বছর৷ ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি'র চেয়ারপার্সন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান৷ এরপর আরো একটি মামলায় তাঁর দণ্ড হয়৷ তিনি এখনো কারাগারে আছেন৷ এ নিয়ে বিএনপি কোনো কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলকে ব্যর্থ হয়েছে৷ তবে দু'টি সামাজিক আন্দোলন শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বেরই দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়৷ সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দেলন চলে কয়েক মাস ধরে৷ তবে এই আন্দোলন তীব্র হয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ২০১৮ সালের এপ্রিলে৷ সরকার এই আন্দোলনে জড়িতের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালিয়েছে বলে অবিযোগ রয়েছে৷ তবে শেষ পর্যন্ত অক্টোবরে সরকার সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করে৷

অডিও শুনুন 03:00

‘এখানে উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু সুশাসন নেই’

নিরাপদ সড়কের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ২০১৮ সালে উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ৷ ২৯ জুলাই ঢাকার রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাস চাপায় নিহত হওয়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ওই আন্দোলন গড়ে তোলে৷ এই আন্দোলন নিস্ক্রিয় করতেও দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে৷ আরো অনেকের সঙ্গে তখন গ্রেপ্তার হন বরেণ্য আলোচিত্রী ড. শহীদুল আলম৷ ১০৮ দিন কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে ছাড়া পান৷ এই আন্দোলনের ফলে নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাশ হয়৷ আর তার বিরোধিতায় সড়ক পরিবহণ শ্রমিকরা আন্দোলনের নামে সারাদেশে ২-৩দিন ব্যাপক নৈরাজ্য চালায়৷ সাধারণ যাত্রী ও চালকদের মুখে পোড়া মোবিল মেখে দিয়ে ‘মোবিল সন্ত্রাস' প্রবর্তন করে৷ তার আগে নিরপদ সড়ক আন্দোলনের সময় পরিচিতি পায় ‘হেলমেট বাহিনী'৷ এরা সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়৷

মাদকবিরোধী অভিযানে ২০১৮ সালে ৪০০ লোক নিহত হন৷ আর বাংলাদেশে পাশ হয় বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, যাকে মুক্ত সংবাদমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতাবিরোধী বলে সমালোচনা করা হয়৷

কিন্তু এ বছরই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে আসার যোগ্যতা অর্জন করে৷ সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে৷ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, গড় আয়ূ বৃদ্ধি এবং ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির স্বীকৃতি পায়৷ স্বীকৃতি পায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়নের, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অধিক বিনিয়োগের৷ আর এই বছরেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো, মানে স্প্যান বসানোর কাজ শুরু হয়৷ তবে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে ছিল৷

অডিও শুনুন 03:45

‘গণতন্ত্রের কন্ঠ চেপে ধরলে উন্নয়ন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না’

নির্বাচনের বছর ২০১৮ সালে চমক ছিল ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট৷ ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জনের পর ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেই বিএনপি ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেয়৷ ফলে এবারের নির্বাচনে সব দল (৩৯টি নিবন্ধিত দল) অংশ নেয়৷ এটা বাংলাদেশে সবার অংশগ্রহনে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আলো দেখায়৷ নির্বাচনে ইস্যু ছিল গণতন্ত্র বনাম উন্নয়ন৷বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট মাত্র ৭টি আসন পায়,যা অনেককেই অবাক করেছে৷ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে তারা এরই মধ্যে নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দাবি করেছে৷ তারা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করেছে৷ ফলে সাধারণ মানুষ তাঁদের আশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণ দেখেনি৷ ঐক্যফ্রন্টের ৭ জন শেষ পর্যন্ত সংসদে যাবেন কিনা তা এখনো নিশ্চিত নয়৷ তবে আশার কথা, এবার ‘সত্যিকারের' বিরোধী দল হিসেবে সংসদে বসতে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি৷ তারা আসন পেয়েছে ২২টি৷ গত সংসদে তারা সরকারের মন্ত্রীসভায় থেকেই সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেছিল৷

আর এই অবস্থায় সোমাবার মন্ত্রিসভা শপথ নেয়৷ বাংলাদেশে এই প্রথম দেশের প্রায় সব এলাকা থেকে মন্ত্রী করার দাবি উঠেছে৷ এনিয়ে মিছিল- মিটিং ও সড়ক অবরোধের মতো ঘটনাও ঘটেছে৷ তবে সব এলাকা থেকে মন্ত্রী করা হয়নি৷ পুরোনোদের অনেকেই বাদ পড়েছেন৷

টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ৷ র্থ বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন শেখ হাসিনা৷ এটি বাংলাদেশে একটি রেকর্ড৷

নতুন বছরে নতুন সরকার নিয়ে আলোচনা আর প্রত্যাশার মাঝে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ধানের শীষে ভোট দেয়ায় এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় পুরো জাতি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে৷ আর ফরিদপুরে নৗকায় ভোট দেয়ার অপরাধে সংখ্যালঘু হিন্দুরা নির্যাতনের শিকার হন৷ অভিযোগ, যারা নির্যাতন করেছেন তারা একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোক৷ ওই স্বতন্ত্র প্রার্থী আবার আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারক পর্যায়ের এক নেতার আত্মীয়৷ খুলনা-১ আসনে ভোটের ফল ঘোষণা করতে গিয়ে হিসেবে গরমিল করেন সেখানকার জেলা প্রশাসক৷ আর তার খেসারত দিতে হয়েছে একজন সাংবাদিককে জেলে গিয়ে৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘উন্নয়নকে ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন গণতন্ত্র৷ আর তার জন্য প্রয়োজন সুশাসন৷ প্রয়োজন দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা৷ এখানে উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু সুশাসন নেই৷ একই অপরাধে সরকার দলীয় লোকজন পার পেয়ে যায়৷ কিন্তু সাধারণ মানুষ বা বিরোধী লোকজনকে ছাড়া হয় না৷ আইন সবার জন্য সঠিকভাবে প্রয়োগ হয় না৷ পুলিশ প্রশাসন নগরিকবান্ধব নয়৷ এখন এগুলো আমাদের দরকার৷''

তিনি গণতন্ত্র এবং শাসনব্যবস্থার প্রশ্নে বলেন, ‘‘এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে যে, আমরা একদলীয় ব্যবস্থায় চলব, নাকি বহুদলীয় ব্যবস্থায় চলব৷ এবারের নির্বাচনের যে ফল, তাতে বিরোধী দল বলতে ওই অর্থে আর কিছু নেই৷ যদি আমাদের সিদ্ধান্ত হয় প্রায় একদলীয় মডেলে উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে অনেকটা সমাজতান্ত্রিক স্টাইলে দেশ চলবে, তাহলে তো আর সমস্যা নেই৷ কিন্তু যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাই, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে হবে৷ বিরোধী দল থাকতে হবে৷''

আর মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘গতবছর যা দেখেছি, ২০১৯ সালে তা আর দেখতে চাই না৷ একটি অস্থিরতামুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ চাই৷ গণতন্ত্রের জন্য স্যাক্রিফাইস দরকার, সেটা যেন রাজনৈতিক নেতারা করেন৷ আর সমাজে ভয়ের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা যেন কেটে যায়৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘গণতন্ত্রের কন্ঠ চেপে ধরলে উন্নয়ন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না৷ উন্নয়ন মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে৷ তাহলেই প্রকৃত উন্নয়ন হবে৷''

তিনি নতুন বছরে আশার সঙ্গে আশঙ্কার কথাও বলেন৷ তিনি মনে করেন,‘‘যদি কোনো কারণে স্বৈরশাসনের কবলে দেশ পড়ে যায়, তাহলে অর্থনীতিতে ধস নামবে৷ মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠবে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমার কাছে খবর আছে অন্তত ৫০টি এলাকায় মিছিল, অবরোধ হয়েছে ওই এলাকার নির্বাচিত এমপিকে মন্ত্রী করার দাবিতে৷ সারাদেশেই এই দাবি এখন৷ এটা সাধারণ মানুষের দাবি নয়৷ দলীয় নেতা-কর্মীরা এই দাবি তুলছে৷ এর মানে হলো তারা আরো ক্ষমতা চায়৷ তারা আরো নিরঙ্কুশ আধিপত্য চায়৷ এটা ভালো লক্ষণ নয়৷''

প্রতিবেদনটি কেমন লাগলো? লিখুন আমাদের, নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন