ভুল গন্তব্যে রাইড শেয়ারিং? | বিশ্ব | DW | 11.06.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

ভুল গন্তব্যে রাইড শেয়ারিং?

বাংলাদেশে অ্যাপের মাধ্যমে যেসব প্রতিষ্ঠান রাইড শেয়ারিং করে তাদের কারুরই নিবন্ধন নেই। বিআরটিএ-তে আবেদনের ভিত্তিতেই তারা চলছে। আর নগরবাসীর গণপরিবহণ সমস্যার মুখে তাদের চাহিদা বড়লেও যাত্রী হয়রানি আর অনিয়মের অভিযোগও বাড়ছে।

রাইড শেয়ারিং-এ প্রাইভেট কার ও মটরবাইক ছাড়াও এখন যুক্ত হয়েছে, সিএনজি অটো রিকশা, মাইক্রোবাস। তবে সংখ্যায় বেশি মটর সাইকেল। ঢাকার জনবহুল এলাকার সড়কের মোড়ে মোড়ে বা বিপনি বিতানের সামনে  দেখা যায় রাইড শেয়ারিং-এর মটর বাইকের জটলা। আর এখন তাদের অনেকেই চুক্তিতে যাত্রী নেন৷ অ্যাপ ছাড়া যাত্রী তোলা নিয়মের পরিপন্থী। ফলে ওই সব এলকায় গিয়ে কেউ দাড়ালেই শুনতে হয়,‘কই যাবেন ভাই?' মটর বাইক আরোহী রাফসানজানি বিরক্ত অন্য কারণে। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন,‘কোথাও হেলমেট পড়ে মটর সাইকেল নিয়ে দাড়ালেই শুনতে হয়, মামা যাবেন নাকি?' তার মতে,‘এ্যাপের বাইরে চুক্তিতে যাত্রী নেয়ার প্রবণতার কারণে'এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

আর চালকদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেক চালকই আছেন যারা মাত্র ড্রাইভিং শিখে রাইড শেযারিং-এর গাড়ি বা মটর বাইক চালানো শুরু করেছেন। এমনও ঘটেছে যে গ্রামে ছোটো মুদি দোকান চালাতেন। সেটি বিক্রি করে ঢাকায় এসে মটর বাইক কিনে রাইড শেয়ারিং করছেন। এরকমই একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,‘শুধু আমি না আমার মতো আরো অনেকেই আছেন আগে গাড়ি বা মোটর সাইকেল চালাতেন না। এখন এটাকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছেন। আর ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া কোনো কঠিন কাজ না, টাকা হলেই জোগাড় করা যায়। কোম্পানিগুলোতো আর চালানোর দক্ষতা দেখেনা। শুধু লাইসেন্স দেখে।'

অন্যদিকে এখন অনেকেই গাড়ি কিনে ড্রাইভার রেখে রাইড শেয়ারিং-এ দিচ্ছেন। গাড়িটিই কেনা হয় রাইড শেয়ারিং-এর ব্যবসার জন্য। 

কত গাড়ি

এমন নয় যে ব্যক্তিগত গাড়িটি অবসরে রাইড শেয়ারিং-এ দেয়া হয়। ফলে ঢাকায় প্রাইভেট কার ও মটর সাইকেল আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। ট্রাফিক জ্যাম বেড়েছে। ফুটপাত আরো বেশি করে মটর বাইকের দখলে চলে গেছে।

ঢাকায় এখন এক লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি রাইড শেয়ারিং-এর গাড়ি আছে। এরমধ্যে মোটরসাইকেল আছে ১ লাখ ৪ হাজার ৩৮৯ এবং  কার ১৮ হাজার ২৫৩টি। আর ঢাকা ও চট্টগ্রামে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ার কোম্পানি আছে ১৬টি যারা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিতে(বিআরটিএ) নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। কিন্তু উবার, পাঠাও সহজ, ওভাইসহ আরো দু-একটি প্রতিষ্ঠান অপারেশনে আছে।

অডিও শুনুন 05:29

নানা রকম হয়রানির শিকার হই: লিনা

এক নারীর অভিজ্ঞতা

লিনা দিলরুবা শারমিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গত বছর রোজার সময় ইফতারের আগে রাইড শেয়ারিং-এর  তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তিনি জানান ডয়চে ভেলেকে। তিনি বলেন,‘আমি কল ক্যান্সেল করার পরও মটর বাইক চালক এসে তার বাইকে চড়তে হবে বলে গো ধরেন। আমি রাজি না হলে খারাপ ব্যবহার করেন। একপর্যায়ে বলেন, টাকা লাগবে না আমার বাইকের পিছনে একবার হলেও বসেন। আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন,‘ওই কার চালক এতই অনভিজ্ঞ ছিলেন যে, আমাকে নেমে সিগন্যাল দিতে বলেছিলেন। আর আমার এক বান্ধবী একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা নেয়। এরপর সে আমার বান্ধবীকে ফোন করে অনবরত থ্রেট দেয়। শুধু তাই নয় আমরা নারীরা ফেসবুক এবং ফোনে রাইড শেয়ারের চালকদের নানা রকম হয়রানির শিকার হই।'

তিনি আরো বলেন,‘সব প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ নেয়ার ব্যবস্থা নেই। তাদের ফোনে পাওয়া যায়না। অ্যাপ-এর মাধ্যমে অভিযোগ করলে কাজ হয়না। পুলিশের ৯৯৯ -এর সহায়তা নিতে বলা হয়। সার্ভিস দেবে আর অভিযোগ নেবে না এটাতো হয়না।

তবে এ নিয়ে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন,‘নীতিমালার আওতায় আমরা এগুলো সলভ করার চেষ্টা বরছি। ৯৯৯ আমাদের অ্যাপেই রাখার ব্যবস্থা করছি যাতে  অভিযোগ করা যায়। আর চালদের নিরপত্তার বিষয়টিও আমাদের দেখতে হচ্ছে।'

বাড়ছে রাইড, যাচ্ছে কোথায়

ঢাকা শহরে এখন প্রতিদিন ৩০ হাজারেরও বেশি রাইড শেয়ারিং হয়। গত বছর এর অর্ধেকও ছিলো না। রাইড শেয়ার কোম্পানিগুলোর সাথে কথা বলে জানা যায়, একবছরে রাইড শেয়ারিং-এর প্রবৃদ্ধি শতকরা ১০০ ভাগেরও বেশি। আর এটা বাড়ছেই। কিন্তু এর যে মূল উদ্দেশ্য ছিলো যানজট কমানো তা কিন্তু  হচ্ছেনা। উল্টো নতুন নতুন গাড়ি ও মোটর সাইকেল যোগ হয়ে যানজট আরো বাড়াচ্ছে।

অধুনা বন্ধ হয়ে যাওয়া রাইড শেয়ারিং কোম্পানি চলোডটকম-এর প্রধান নির্বাহী দেওয়ান শুভ বলেন,‘রাইড শেযারিং-এর ধারণাটি হল ব্যক্তিগত গাড়ি অবসরে আমি শেয়ার করবো৷ কিন্তু বাংলাদেশে যেটা হচ্ছে সেটা হলে এখানে ইরভেস্টররা নতুন গাড়ি কিনে ব্যবসার জন্য এখানে যোগ দিচ্ছেন। কারুর ১০টি গাড়িও আছে। যেগুলো সারাদিনই রাইড শেয়ার করে। ফলে নতুন গাড়ি আসছে। যানজট বাড়ছে। মূল নীতির জায়গায় থাকলে ব্যক্তিগত গাড়ি যেগুলো আছে সেগুলোই রাইড শেয়ার করতো। তাতে বরং যানজট কমতো।  বিনিয়োগকারীরা ট্যাক্সি ক্যাবের ব্যবসা না করে এখন অনলাইন প্লাটফর্মে ব্যবসা করছে। এটা ট্যাক্সিক্যাব ব্যবসার নতুন রূপ ছাড়া আর কিছুই না।'

অডিও শুনুন 05:37

ট্যাক্সিক্যাব ব্যবসার নতুন রূপ: শুভ

তিনি আরো বলেন,‘গ্রাহকেরা অভিযোগ জানাতে গিয়েও নানা অসুবিধায় পড়েন বা প্রতিকার পাননা। কারণ তাদের কাস্টমার কেয়ার সেন্টার নেই কারুরই। কল সেন্টারও নেই। আমার মনে হয় এই ব্যবসার একটি মনিটরিং থাকা দরকার। বিআরটিএর সেই দায়িত্ব পালন করা উচিত।'

নিবন্ধন নেই কারো

২০১৬ সালে উবার বাংলাদেশে প্রথম অ্যাপস-এর মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং শুরু করে। কিন্তু এরপরই বিআরটিএ এই ব্যবসাকে অবৈধ বা বেআইনি ঘোষণা করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। কিন্তু চাহিদার মুখে তাদের এই সিদ্ধান্ত কাজে আসেনি। তাই ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিআরটিএ রাইড শেয়ারিং-এর একটি নীতিমালা প্রকাশ ও কার্যকর করে। আর এই নীতিমালা অনুযায়ী রাইডশেয়ারিং প্রতিষ্ঠান এবং ওই প্রতিষ্ঠানের অধীনে গাড়িগুলোর আলাদা নিবন্ধনের বিধান করা হয়েছে। আর এই নীতিমালার অধীনে এপর্যন্ত ১৬টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে।'

বিআরটিএর পরিচালক মাহবুব ই রাব্বানি ডয়চে ভেলেকে বলেন,‘আমরা আবেদনের ওপর কাজ করছি। যেসব কোম্পানি আমাদের নীতিমালা মানতে পারবে তাদের আমরা ‘এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট' দেব। তখন এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা নীতিমালা অনুযায়ী চলতে বাধ্য করতে পারব।তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিতে পারব। এখন তারা নিবন্ধিত না হওয়ায় তা পারছিনা।'

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন,‘আমরা এরইমধ্যে পুলিশ, র‌্যাব ও আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছি। আমরা প্রথমেই যাত্রী নিরাপত্তা এবং ভাড়াকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আর নিরাপত্তার জন্য তাদের পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশের আওতায় বিভাবে আনা যায় তা নিয়ে কাজ করছি। পুলিশ যাতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে পারে সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। এসওএস বাটন থাকতে হবে। তাদেরও কিছু বক্তব্য আছে। সেগুলোও আমরা দেখছি।'

নীতিমালায় বলা হয়েছে একটি গাড়ি একটি প্রতিষ্ঠানেই নিবন্ধন করা যাবে। চালকও একটি কোম্পানিতে নিবন্ধিত হতে পারবেন।  ব্যক্তিগত গাড়ি কিনে নিবন্ধন নেয়ার পর এক বছর হলে তবে রাইড শেয়ারিং-এ দেয়া যাবে। আর এই নীতিগুলো নিয়ে আপত্তি আছে রাইড শেয়ার কোম্পনিগুলোর এবং চালকদের। রাইড শেয়ারিং-এর একজন চালক আলমগীর হোসেন বলেন,‘একাধিক কোম্পানিতে নিবন্ধন না করলে আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দি হয়ে যাবে।'

আর ওভাই এর সহকারি ম্যানেজার তমাল কর্মকার বলেন,‘গ্রাহকদের আমরা আরামদায়ক যানবাহন দিতে চাই। তাই নিবন্ধনের এক বছর পর রাইড শেয়ারিং-এর শর্ত গ্রাহকদের  সুবিধার বিপরীতে যায়।'

রাইড শেয়ারিং-এর বিরুদ্ধে বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ আছে। তাই ভাড়াও নির্ধারণ করে দিতে চায় বিআরটিএ। কিন্তু তমাল কর্মকারের কথা হল,‘ভাড়া নির্ভর করে চাহিদার ওপর। পিক আওয়ারে যেমন ভাড়া বেশি হয়। তেমনি অফ পিকে ভাড়া অনেক কম হয়। কখনো কখনো এটা রিক্সার চেয়েও কম হয়।'

তবে  রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন,‘নীতিমালা না থাকায় এখন সবাই চালক হচ্ছেন। প্রশিক্ষণ ঠিক মত নেই। দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। ব্যবহারও পেশাদার নয়। এটা একটা বড় জটিলতা সৃষ্টি করছে।ঢাকার বাইরের গাড়ি ঢাকায় চলে আসছে। অনেক চালক আছেন পথ ঘাটও চেনেন না।'

অডিও শুনুন 01:20

ব্যাক্তিগত লাইসেন্সে কমার্শিয়াল অপারেশন: রাব্বানি

ট্যাক্সি ক্যাব ও রাইড শেয়ারের মধ্যে পার্থক্য

মূল উদ্দেশ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থা। তাই বিআরটিএর পরিচালক মাহবুব ই রাব্বানির কাছে প্রশ্ন ছিলো রাইড শেয়ারিং আর ট্যাক্সি ক্যাবের মধ্যে পার্থক্য কী? তিনি জবাবে বলেন,‘ট্যাক্সি ক্যাব কমার্শিয়াল লাইসেন্স-এর আওতায় যাত্রী পরিবহণ করে। আর রাইড শেয়ারিং হল ব্যাক্তিগত লাইসেন্সে কমার্শিয়াল অপারেশন।'

এখানেই সমস্যা। বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, এর ফলে অনেকেই এখন রাইড শেয়ারকে ট্যাক্সিক্যাব ব্যবসা হিসেবে নিয়েছেন। আগে ব্যক্তিগত লাইসেন্সে কমার্শিয়াল ভাবে গাড়ি ব্যবহার করা যেত না। কিন্তু এখন সেটা যায়। কিন্তু এটা যদি শুধু ব্যবসার  উদ্দেশ্যে হয় তাহলে ব্যক্তিগত গাড়িই লাইসেন্স করা হচ্ছে পুরোপুরি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। ফলে অনেক গাড়ি আসবে। যানযট বাড়বে। হচ্ছেও তাই। আর সেকারণেই গাড়ি কিনেই রাইড শেয়ারিং-এ না দেয়ার নীতি প্রয়োজন। আর আর এক ব্যক্তি একটার বেশি গাড়ি রাইড শেয়ারিং-এ দিতে পারবেন না এরকম নিয়ম প্রয়োজন। বাইড শেয়ারিং-এর উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক হওয়া উচিত নয়। রাইড শেয়ার করে অর্থ পাওয়া যাবে। কিন্তু সেটা বাণিজ্যিক অপারেশনের চেয়ে কম হবে। অথবা বাণিজ্যিক কারণে ওই গাড়ি কেনা হবে না।

মূলনীতির বাইরে নয়

বাংলাদেশে চাহিদা আছে বলেই রাইড শেয়ারিং বাড়ছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্টের অভাব, ট্রাক্সিক্যাব ও অটোরিকশার ভাড়ার মিটার মেনে না চলা এবং সহজে পাওয়া না যাওয়ায় রাইড শেয়ারিং জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু এটাকে নিয়মের মধ্যে রাখতে হবে। যাত্রী নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আর রাইড শেয়ারিং-এর মূল নীতি অক্ষুন্ন রাখতে হবে। তাহলে এটা যাত্রীবান্ধব হবে। যানজট কামতেও ভূমিকা রাখবে। নয়তো এটাই আরেকটা আপদে পরিণত হতে পারে।

রাইড শেয়ারিং নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন