ভিসিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি আর শিক্ষা | বিশ্ব | DW | 21.01.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

ভিসিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি আর শিক্ষা

নিজের চোখে একটা ভিসিবিরোধী আন্দোলন দেখেছি৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শামসুন্নাহার হলে ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় সারা দেশ এমন আন্দোলনে নেমে পড়েছিল যে শেষ পর্যন্ত অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ বিদায়ে বাধ্য হন৷

উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আমরণ অনশন করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আমরণ অনশন করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

সেই আনোয়ারউল্লাহ, যিনি নিয়োগ পাওয়ার পর গভীর রাতে অফিস খুলে এমনভাবে চেয়ার দখল করেছিলেন যেন রাতের মধ্যেই চেয়ারের দখলটা না নিলে অন্য কেউ বসে যেতে পারে৷ চেয়ার আর অফিস ঠিকঠাক দখলে রাখতে পারার শক্তিই ভিসি পদে টিকে থাকার যোগ্যতা৷ পরের ২০ বছর বাংলাদেশ বদলেছে৷ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও বদলেছে৷ আর ভিসিরা বদলে বদলে এমন জায়গায় গেছেন যে তাদের হটানোর আন্দোলন বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের একরকম স্বাভাবিকতা৷ কেউ কেউ তাতে মাথা হেঁট করে যান৷ কেউ কেউ নিজেদের আরও ছোট করে রয়ে যান৷

যা বলছিলাম, সেই শামসুন্নাহার হলের ভিসিবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-শিক্ষক সবাই দাঁড়িয়েছেন৷ একজন সাবেক ভিসিও বিক্ষোভকারীদের কাতারে, একটা মানববন্ধনে হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়েছেন তার ছাত্রদের সঙ্গে৷ এক দুর্মুখ ছাত্র বলল, ‘স্যার আগে লোকে বলত, আপনি একাই খারাপ৷'

স্যারের লজ্জা পাওয়া বা রাগ করার কথা৷ তা না করে তুমুল উৎসাহে জানতে চাইলেন, ‘আর এখন কী বলছে?'

‘বলছে বাকিরা আপনার চেয়েও খারাপ৷'

স্যার মহাখুশি৷ তার চেয়ে অন্যরা খারাপ এমন সুসংবাদ শুনে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল যে স্লোগানে আরও জোরে গলা মেলালেন৷ এটা সেই সময়ের ছাত্রদের কাছে একটা মজার গল্প৷ কিন্তু গল্পে সামগ্রিক দূষণের একটা চিত্রও মেলে৷ এভাবে কেউ কেউ এমন জায়গায় গেছেন যে একটা পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ধরে ছাত্রীদের সম্পর্কে এমন ঢালাও মন্তব্য করে বসেন৷ আমরা তো জানতাম, এসব কথা অশিক্ষিতরা বলে৷ ভিসি বা শিক্ষক জাতীয় মানুষেরা তেমন বোধ প্রতিরোধ করেন৷ এখন তারাই বলছেন৷ অন্যরা ছি ছি করছে৷ ভিসিবিরোধী আন্দোলন হবে, আবার হয়তো থামবে, কিন্তু তাদের মান আর মানসিকতার এই যে ক্ষয় তাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞানচর্চার উপর ভরসাটাই উঠে যাচ্ছে৷ বা গেছেই হয়ত৷

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেন তেমন একজন মানুষ সেদিন বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে যে আমরা শিক্ষক হিসাবে দেখি সেটাই ভুল৷'

‘তাহলে কী হিসাবে দেখব?'

‘তারা তো আসলে রাজনীতির মাধ্যমে আসেন৷ রাজনীতির মাধ্যমে আসলে রাজনীতিরই লোক হবেন৷ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সরকারি দলের প্রধান মেনে নিলেই সব সমস্যার সমাধান৷'

‘বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সরকারি দলের প্রধান! কিন্তু পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো নির্বাচনের মাধ্যমে ভিসি প্যানেল হয়...'

‘নির্বাচন মানেই তো ভোট লাগবে৷ ভোট লাগলে তিনি ভোটের রাজনীতি করবেন৷ এমন তো না যে ভালো বা সেরা শিক্ষক হিসাবে কেউ নিয়োগ পান৷'

‘নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেই সুযোগ আছে৷ সরাসরি নিয়োগ দেয়া হয়৷'

‘এখানে তো সমস্যা আরও বেশি৷ সরাসরি বলে নিজেদের লোকদের নিয়োগ দেয়া হয়৷ যিনি আরও বেশি দলীয়৷ আরও বেশি অনুগত৷'

‘তাহলে উপায়?'

‘আপাতত কোনো উপায় নেই৷'

একভাবে দেখলে কোনো উপায় নেই৷ নির্বাচন হলেও ভোটের রাজনীতি, যোগ্যতাকে ছোট করেই যার অঙ্ক তৈরি হয়৷ আর সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রেই মূল নীতি হল, নিজের লোক৷ যোগ্য লোক কখনোই নয়৷

আচ্ছে, এরকমটা তো সবসময়ই ছিল৷ এই প্রক্রিয়াতেই নিয়োগ হত৷ তাহলে নিজেদের রাজনীতির সরাসরি সমর্থক না হওয়া মানুষেরা কীভাবে ভিসি হয়ে যেতেন! আবুল ফজলের লেখা পড়ে দেখছি, তিনি কেমন স্বাধীনভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর চেষ্টা করেছেন এবং বঙ্গবন্ধু সরকার তাঁর সেই ই”ছাকে সম্মান করে গেছে৷ সত্তর-আশি তো বটেই, এমনকি নব্বই দশকেও বোধহয় অবস্থাটা এত খারাপ ছিল না৷

ইয়াজউদ্দিন-মনিরুজ্জামান মিঞা-আজাদ চৌধুরী-আরেফিন সিদ্দিকিরাও সরকারি দলের সমর্থক ছিলেন তবু তারা বোধহয় আগে শিক্ষক ছিলেন৷ ভিসিত্বের জন্য অস্তিত্বকে পুরো বিলিয়ে দেননি৷ আর এই সমীকরণে সামনে আসে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি৷ সেই রাজনীতি বা সরকার বিশ্বাস করত, সব জায়গায় দল-দল করতে নেই৷ কিছু জায়গা রেখে দিতে হয়৷

আবার মাঝে মধ্যে ভাবি, এই যে তুচ্ছ ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুখোমুখি হয়ে যান এটা কি প্রজনগত যোগাযোগের ঘাটতি! সব সময়ই শিক্ষক-ছাত্ররা দুই প্রজন্মের মানুষ৷ চিন্তায়-বোধে ব্যবধান থাকবেই৷ তাহলে এখন সেই ব্যবধানটা এমন হয়ে যাচ্ছে কেন যে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়৷

প্রজন্মে-প্রজন্মে ব্যবধান সবসময়ই থাকে৷ তরুণ প্রজন্মের মনে হয়, পুরনো ধারণা সব বদলে নতুন করে সাজাতে হবে৷ আবার বয়স্করা ভাবেন, এরা সব অপরিণত, কিছুই বুঝতে পারে না৷ কিন্তু এখনকার সময়ের মতো দুই প্রজন্মের চিন্তায় অত ফারাক বোধহয় ছিল না৷ ই-দুনিয়া পরের প্রজন্মকে এমন সুযোগ দিয়েছে যে আগের মতো শিক্ষক মানেই যেকোনো কথা নির্বিচারে মেনে নেবে এই জায়গায় তারা নেই৷ একটা সময়, শিক্ষক-বড় ভাই এদেরকে ছোটরা শ্রদ্ধা করত এজন্য যে তিনি অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার কারণে তার চেয়ে বেশি জানেন৷ এখন অবারিত যুগে সে ভাবনাটা নেই৷ বরং তারা অনেক বেশি প্রযুক্তিমুখী বলে অনেক ক্ষেত্রে বই বা শিক্ষকের বাইরেও জানার জগত আছে৷ একে কম বয়স, সঙ্গে এরকম সুযোগে সবাইকে উড়িয়ে দেয়ার মানসিকতা তৈরি হতেই পারে৷ আর এখানেই এই সময়ের শিক্ষকদের চ্যালেঞ্জটা আরও বেশি৷ নিজেদের গুরুত্ব আর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে নিজেদের বোধ আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে৷ শিক্ষক পরিচয়ের কারণেই আমার সব চিন্তা সবাই চুপ করে মেনে নেবে, এই পুরনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে৷ এমনকি প্রযুক্তির যে শক্তিকে ছাত্রদের অনেকেই শেষ কথা ধরে নিচ্ছে, সেটার মধ্যে যে ফাঁক তাও শিক্ষকদেরই বোঝাতে হবে৷ কিন্তু অবশ্যই পরিচয়ের শক্তিতে নয়৷ নিজের বোধের ব্যাপ্তিতে৷ এবং এই নিয়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞ-সমাজ গবেষকদেরও ভাবতে হবে৷ ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের সেতুটা ভেঙ্গে পড়লে পুরো সমাজই পথে আটকে থাকে৷ কারোই আগানো হবে না৷

মোস্তফা মামুন, সাংবাদিক

মোস্তফা মামুন, সাংবাদিক

নিজে সিলেটের মানুষ বলে দেখেছি, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পুরো অঞ্চলে তুমুল উত্তেজনা৷ সিলেটের মানুষের মধ্যে নানান কারণে নিজেদের অঞ্চল নিয়ে গর্বটা একটু বেশি৷ বিশ্ববিদ্যালয় সেই গৌরবে যোগ করল  নতুন মুকুট৷ প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বলে এর মাহাত্ম্যও ছিল আলাদা৷ প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তৃতির সঙ্গে হোঁচটও কম  ছিল না৷ নামকরণবিরোধী আন্দোলন এর গৌরবে কালি ছিটিয়েছে৷ এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন নামকরা শিক্ষক উপাচার্যের কাণ্ড কীর্তিকেন্দ্রিক একটা উপন্যাস লিখেছেন৷ বলবেন, গল্প তো কল্পনার জিনিস৷ কিন্তু কল্পনা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই আসে৷ এখন কি সেই বাস্তবতাটাই আমরা দেখছি? আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে পিতৃত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনা ভিসিদের দায়িত্ব৷ অথচ পিতৃত্বের বদলে প্রায় শত্রুতা৷ নইলে কেন পুলিশ আসবে ছাত্রদের দমনে? হাত লাগাবে সরকারী ছাত্ররা! এরা যখন ভিসির রক্ষক হয়ে ওঠে তখন ভিসি আসলে স্রেফ একজন চেয়ারের মালিক৷ নিজের ছাত্রদের বিশ্বাসের মানুষ নন৷

নব্বই দশকের ক্যাম্পাস ছিল রাজনীতির হানাহানিতে চরম দূষিত৷ ছাত্রদের হলের গেট আটকে মিছিলে যেতে বাধ্য করা ছিল স্বাভাবিকতা৷ একদিন গেট আটকানো হয়েছে মিছিলের জন্য৷ পাতি নেতা জাতীয় কেউ একজন তত্ত্ববধানে৷ পরীক্ষা-ক্লাস বলেও কেউ ছাড় পাচ্ছে না৷ এর মধ্যে একজনকে সে নির্বিঘ্নে যেতে দিল৷

পেছন থেকে বড় নেতা বললেন, ‘এই নবাব কে-রে? এমনভাবে চলে গেল৷'

পাতি নেতা জিভ কেটে বলে, ‘টিচার৷ হাউস টিউটর৷'

নেতা বলে, ‘টিচার হয়েছে তো কী হয়েছে৷ মিছিল করলে হাউস টিউটর থেকে ভিসি বানিয়ে দেব৷'

আগেও বলেছি গল্পটা৷ মজার গল্প বলে মনে করে হাসতাম খুব৷ এখন অবশ্য আর ঠিক গল্প মনে হয় না৷ বরং কোথায় যেন বাস্তবতায় ছবি দেখা যায় এখানে৷

আর তাই মনে হলে মজাও লাগে না৷ দুঃখ লাগে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়