ভারতে মধ্যবিত্তকে লড়তে হচ্ছে একা | আলাপ | DW | 03.07.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

ভারতে মধ্যবিত্তকে লড়তে হচ্ছে একা

ভারতে চাকরি হারিয়েছেন কয়েক কোটি মধ্যবিত্ত৷ তবু তাঁদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না সরকার৷

লকডাউনের ফলে কর্মহীন হয়ে মুম্বইয়ের রাস্তায় সবজি বিক্রি করছেন বলিউডের অভিনেতা জাভেদ হায়দার৷ করোনার ফলে ক্রিকেট মাঠে বল গড়াচ্ছে না৷ লিগ বাতিল৷ জেলায় খেলা হচ্ছে না৷ পারিশ্রমিক দিতে পারছে না ক্লাব৷ তাই ইস্টবেঙ্গলের উঠতি ক্রিকেটার মিনাজুর রহমান চাষ করতে শুরু করেছেন৷  মধ্যপ্রদেশে তিরিশ বছর ধরে কাজ করার পর একটি অন্যতম প্রধান ভারতীয় সংস্থার দুই উচ্চপদস্থ অফিসার ধীরেন্দ্র মিশ্র ও বিজয় সাভারকরকে বলা হয়েছে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিজে ইস্তফা না দিলে ছাঁটাই করা হবে৷ তাঁরা শ্রম দফতর থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সকলের কাছে আবেদন জানিয়েছেন৷ কোনো ফল হয়নি৷

এঁরা সকলেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ৷ করোনা ও লকডাউনের ফলে হঠাৎ চাকরি বা রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে৷ করোনাকালে নতুন চাকরি পাওয়াটা লটারি জেতার মতোই মহার্ঘ৷ সেটাই বা ক'জনের ভাগ্যে জোটে! আর তাঁদের পাশে সরকারও দাঁড়ায়নি৷ যেসব চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত তাঁদের কর্মসংস্থানটা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছেন, তাঁদের বেতন কমেছে বেশ খানিকটা৷ ফ্ল্যাট বা গাড়ি অথবা মোটরসাইকেলের লোনের টাকা পরিশোধ করে কীভাবে সংসার চালানো যায় সেটাই তাঁদের প্রথম ও প্রধান চিন্তা৷ জাভেদ, মিনাজুর, ধীরেন্দ্র বা বিজয় হলেন এই বিপুল মধ্যবিত্ত শ্রেণির কয়েকজন প্রতিনিধি, যাঁরা হঠাৎ কর্মসংস্থান হারিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন এবং তাঁদের পাশে সরকার নেই৷

যাঁরা সরকারি কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষক, তাঁদের কিছু হয়নি৷ কিন্তু যাঁরা বেসরকারি খাতে চাকরি করেন, বিপাকে পড়েছেন তাঁরা৷ হয় বেতন কমেছে, না হয় চাকরি গিয়েছে৷   

সরকার শুধু গরিব এবং বিত্তবান কারখানার মালিকদের নিয়ে চিন্তিত৷ লকডাউনের পর গরিবদের জন্য ভারতে প্রচুর ঘোষণা হয়েছে৷ হওয়া উচিতও৷ হাতে কাজ নেই, কবে কাজ আসবে, তার নিশ্চয়তা নেই, এই অবস্থায় সরকার পাশে না দাঁড়ালে তো তাঁদের না খেয়ে মরতে হবে৷ ফলে নরেন্দ্র মোদী যখন লকডাউনের পর ২৯ কোটিরও বেশি জনধন অ্যাকাউন্টে ৫০০ টাকা করে দেন, তখন সকলে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন৷ তারপর গরিবদের জন্য বিনা পয়সায় চাল-গম এখন নভেম্বর পর্যন্ত দেওয়া হবে৷ সেই রেশন মাঝপথে চুরি না হয়ে যদি গরিবদের কাছে পৌঁছায়, তাহলে দেশের ৮০ কোটি লোক ভাত বা রুটি খেয়ে অন্তত বাঁচতে পারবেন৷ কৃষকরা আগে থেকেই বছরে ছয় হাজার টাকা করে সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন৷

বিত্তবানরাও সরকারের সুবিধা পেয়েছেন৷ যাঁদের কারখানা আছে, তাঁরা কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন৷ তার জন্য জামিনের দরকার নেই৷ অন্তত ঘুরে দাঁড়ানোর একটা বিকল্প তো তাঁদের সামনে খোলা থাকল৷ কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যিনি চাকরি হারিয়েছেন, তাঁর জন্য কী রইল? একরাশ হতাশা, দিনগত পাপক্ষয়ের জন্য বাড়তি সংগ্রাম এবং মধ্যবিত্ত থেকে পিছলে গিয়ে গরিব হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা৷

জুন মাসের মাঝামাঝি নাগাদ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী একটা টুইট করে বলেছিলেন,''সরকার যদি এখনই অর্থনীতিতে টাকা ঢালতে শুরু না করে, তা হলে গরিবরা নিশ্চিহ্ন হবে, মধ্যবিত্তরা হবে নতুন গরিব, আর ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টরা দেশকে কিনে নেবে৷'' রাহুলের কথায় সরকার অবশ্য কান দেয় না৷ তাঁকে হামেশাই 'রাহুলবাবা' বা 'পাপ্পু' বলে বিদ্রুপ করা হয়৷ কিন্তু তাঁর একটা কথার সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা একমত৷ মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটা অংশ কাজ হারিয়ে গরিব হয়ে যেতে পারেন৷

মে মাসের গোড়ার এক সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, ভারতে ১২ কোটি ২০ লাখ লোক কাজ হারিয়েছেন৷ তার মধ্যে ৭৫ শতাংশ গরিব৷ দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে যাঁরা কাজ করেন বা একেবারে ছোট দোকানদার৷ লকডাউন শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা আবার কাজ পেয়েছেন বা অনিয়মিত পাচ্ছেন৷ আরেকটি সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, লকডাউন শিথিল হওয়ার পর চাষের মরসুম শুরু হয়ে যাওয়ার এবং রাজ্যগুলি ১০০ দিনের কাজ শুরু করে দেওয়ায় গরিবদের মধ্যে কর্মহীনতা কমেছে৷ কিন্তু তিন কোটি বা তার কাছাকাছি সংখ্যায় মধ্যবিত্ত কর্মহীন হয়েছেন৷ তাঁদের চাকরি ফিরে পাওয়া তো দুষ্কর৷

নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিজনেস এডিটর জয়ন্ত রায়চৌধুরি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ''অনেক দেশই সংস্থাগুলিকে বলেছে, কর্মীদের ওয়েজ রোলের টাকাটা সরকার দিয়ে দেবে৷ তারা কাউকে ছাঁটাই করতে পারবে না৷ কারো বেতনও কাটবে না৷ ভারতেও সরকারের ভিতরে এই দাবি উঠেছিল৷ কিন্তু ভারত সরকার তা মানেনি৷ সরকার তো সরকারি কর্মীদের বেতন কমানোর কথা পর্যন্ত ভেবেছিল৷ কিন্তু সিভিল সার্ভিসের মধ্যে থেকে প্রবল বিরোধিতা আসায় তা সম্ভব হয়নি৷ শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্তদের জন্য কোনো ব্যবস্থা সরকার নেয়নি৷''

প্রধানমন্ত্রী মোদী লকডাউনের শুরুতে কাউকে ছাঁটাই না করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন৷ তবে তাঁর কথায় সংস্থাগুলি কান দেয়নি৷ তারা নির্বিচারে ছাঁটাই করেছে৷ তা সে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান হোক বা বড় কর্পোরেট৷ তারপরও সরকার মধ্যবিত্তদের জন্য কিছু করে না কেন? এই শ্রেণিতে  তো ৩০ থেকে ৩৫ কোটি লোক পড়েন৷ সংখ্যাটা নেহাত ফেলনা নয়৷

অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও পরিকল্পনা বিশারদ অমিতাভ রায় ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ''সরকারের ইচ্ছেই নেই৷ রাজনৈতিক ইচ্ছের অভাবের জন্য এটা হয়৷ গরিবদের তুলনায় মধ্যবিত্তরা সংখ্যালঘু৷ তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা যায়৷ তাই তাদের দিকে সরকারের নজর কম৷''

প্রবীণ সাংবাদিক জোসেফ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ''আমি সম্প্রতি অর্থ প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম৷ সেখানে তিনি দাবি করেছেন, অর্থনীতি আবার ছন্দে ফিরছে৷ আগামী বছর আবার ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে বলে আমরা মনে করছি৷ তখন সকলেই আবার চাকরি ফিরে পাবেন৷'' এখান থেকে সরকারের মনোভাব পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে৷'' 

জয়ন্ত বলেন, ''মধ্যবিত্তদের কোনো সংঘবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম নেই৷ রাজনৈতিক ভয়েস নেই৷ আর এখন ভোট নেই৷ যাঁরা সব চেয়ে বেশি চাকরি হারিয়েছেন, সেই তথ্যপ্রযুক্তির মতো শিল্পে কোনো ইউনিয়ন নেই৷ ফলে কে তাঁদের হয়ে লড়বে?''

তাই চাকরি হারানো মধ্যবিত্তের অবস্থা সব চেয়ে খরাপ৷ হঠাৎ করে নেমে আসা সংকট তাঁদের বিপর্যস্ত করে দিয়েছে৷ কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, কেন্দ্রীয় সরকার ৮০ কোটি লোকের জন্য রেশনে ফ্রিতে চাল-গম দিচ্ছে৷ বিপর্যস্ত মধ্যবিত্তদের জন্য অন্তত দুই টাকায় গম, তিন টাকায় চাল দিতো৷ তাহলে অন্তত তাদের চিন্তা কিছুটা কমত৷ এই মুহূর্তে তাদের উদ্ধারকর্তা হিসাবে কাউকে দেখা যাচ্ছে না৷ তাদের সামনে পড়ে আছে অন্তহীন লড়াই, যা তাদের নিজেদেরই লড়তে হবে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন