ভারতে ছাত্র রাজনীতি ছিল, আছে, থাকবে | আলাপ | DW | 03.12.2021

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

ভারতে ছাত্র রাজনীতি ছিল, আছে, থাকবে

ছাত্র রাজনীতিকে অপ্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা যত বাড়ছে, ভারতে ছাত্র রাজনীতি তত দম পাচ্ছে৷ অতীতেও তেমনই ঘটেছিল৷

বছর দেড়েক আগের কথা৷ অগ্রজ সহকর্মী গৌতম হোড়ের সঙ্গে স্টোরি করতে গিয়েছি দিল্লির সিংঘু সীমানায় তখন অবস্থান শুরু করেছেন কৃষকরা৷ সম্প্রতি যাদের কাছে নতি স্বীকার করে কৃষি আইন বাতিল করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷

আন্দোলন তখন সবেমাত্র শুরু হয়েছে৷ দুপুর রোদে অবস্থানরত কৃষকদের ক্যাম্পে পৌঁছে আলাপ হলো ঝকঝকে পাঁচ-ছয় তরুণীর সঙ্গে৷ তারা সকলেই ওই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত৷ ক্যাম্প করে তারাও বসে আছেন৷ কথায় কথায় জানতে পারলাম সকলেই দিল্লির বিভিন্ন কলেজের ছাত্র-ছাত্রী৷ একজনই কেবল সদ্য কলেজ পাশ করে একটি কর্পোরেট সংস্থায় ইন্টার্নশিপ শুরু করেছে৷ ক্যামেরার সামনেই তিনি জানিয়ে দিলেন, অফিসে বলে এসেছেন, আন্দোলন চালিয়ে যাবেন৷ তার জন্য চাকরি চলে গেলেও তিনি কিছু মনে করবেন না৷

বামমনস্ক এমন হাজার হাজার ছাত্র দেখেছিলাম কৃষক আন্দোলনের মাসছয়েক আগে শেষ হওয়া সিএএ আন্দোলনে৷ গোটা দেশ থেকে আন্দোলনরত নারীদের পাশে দিন-রাত বসে ছিলেন তারা৷ মিছিল করেছেন৷ অবস্থান বিক্ষোভ করেছেন৷ গ্রেপ্তারও হয়েছেন৷ কিন্তু আন্দোলন থেকে সরে যাননি৷

কলকাতার মানুষ হিসেবে এই দৃশ্য অধমের কাছে খুব অস্বাভাবিক নয়৷ সরকারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখেই বড় হয়েছি৷ অগ্রজদের কাছে শুনেছি খাদ্য আন্দোলন থেকে নকশাল আমল, ট্রামভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ থেকে সিলেবাস মুভমেন্ট-- মাইলস্টোন আন্দোলনের সামনে সবসময়েই থেকেছেন ছাত্ররা৷ আন্দোলন করতে গিয়ে মৃত্যুও হয়েছে তাদের৷ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন নিজের চোখে দেখা৷ কীভাবে সে সময় ছাত্ররা কৃষকদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, আজ তা ইতিহাস৷

ঠিক যেমন ইতিহাস হয়ে যাবে সাম্প্রতিককালে করোনা এবং লকডাউন আবহে বাম ছাত্র-ছাত্রীদের রেড ভলান্টিয়ার্স৷ নিঃস্বার্থে এখনো তারা মানুষের সেবা করে যাচ্ছে৷ এ-ও কম বড় আন্দোলন নয়৷ নয় কম বড় বিপ্লব৷ হয়ত সে কথা মাথায় রেখেই ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে একাধিক ছাত্রনেতাকে সামনে নিয়ে এসেছে সিপিএম এবং বামপন্থি দলগুলি৷ জেএনইউ-র ছাত্র নেতা ঐশী ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গ এসএফআই-এর সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যরা গুরুত্বপূর্ণ আসন থেকে এবার ভোটে লড়াই করেছেন৷ হেরেছেন৷ কিন্তু তা-ই বলে হারিয়ে যাননি৷ আগামীর মূলস্রোতের রাজনীতিতে তারা থেকে যাবেন৷ জমিও তৈরি করবেন নিশ্চয়৷

স্বাধীনোত্তর ভারতের সাত দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্ররা বরাবরই গুরুত্ব পেয়েছেন৷ বাম, অতি বাম, মধ্য বাম এবং দক্ষিণপন্থি রাজনীতিতে অসংখ্য ছাত্র নেতা তৈরি হয়েছেন, পরবর্তীকালে যারা মূলস্রোতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছেন৷ রেখাপাত করেছেন৷ প্রকাশ কারাত, সীতারাম ইয়েচুরি থেকে শুরু করে দক্ষিণপন্থি অরুণ জেটলি, নির্মলা সীতারমন, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, সুব্রত মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অতি বামপন্থি অসীম চট্টোপাধ্যায়-- সকলেই ছাত্র আন্দোলনের ফসল৷ পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন৷ পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান যুবনেত্রী হিসেবে হলেও তার বীজ রয়ে গেছে আইন কলেজের ছাত্র আন্দোলনে৷ ফলে অদ্যাবধি ভারতের মূলস্রোতের রাজনীতিতে ছাত্র আন্দোলন যে বিপুল প্রভাব ফেলেছে, এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই৷ প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতেও থাকবে কি?

প্রশ্ন কঠিন এবং একাধারে জটিল৷ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে গেছে, এ কথা বলা যায় না৷ সাম্প্রতিক উদাহরণগুলি সে কারণেই একেবারে গোড়ায় লিখে রেখেছি৷ মূলস্রোতের রাজনীতিতে এখনো তেমন কিছু করে উঠতে না পারলেও জেএনইউয়ের ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমারকে নিয়ে এখন মূলস্রোতে যথেষ্ট আলোচনা হয়৷ বাম সংগঠনে যখন ছিলেন তখন হতো, কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পরেও হয়৷ পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপি তরুণ বাম মুখদের যতই তাচ্ছিল্যের চোখে দেখুক, তারা যে জমি কামড়ে পড়ে আছেন, রাজ্যের গ্রাম মফঃস্বলে গেলে তার আভাস পাওয়া যায়৷ ফলে ছাত্র রাজনীতির ধার কমে গেছে, এ কথা বলা যায় না৷ ছাত্র রাজনীতি মূলস্রোতে ঢুকতে পারে না-- এমন মন্তব্যও করা যায় না৷

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

তবে এ-ও ঠিক যে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তো বটেই, এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও ছাত্ররাজনীতির টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা চলছে৷ কলেজে কলেজে ভোট বন্ধ রেখে সেই প্রক্রিয়াকে আরো গতি দেওয়া হয়েছে৷ বাম আমলেও সে চেষ্টা হয়েছিল৷ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটের নামে প্রহসন তখনো হয়েছে৷ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শয়ে শয়ে কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন তৈরি করেছে বাম ছাত্র সংগঠন৷ কিন্তু তাই বলে কি বিরোধী কণ্ঠ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল? সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন প্রমাণ করে দেয় কণ্ঠ বন্ধ তো হয়ইনি বরং আরো জোরদার হয়েছিল৷ প্রাথমিকভাবে দুইটি আন্দোলনেরই নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিল একাধিক অতি বামপন্থি সংগঠনের ছাত্ররা৷ পরে সেখানে তৃণমূল সংগঠন নিয়ে ঢুকে পড়ে৷ বস্তুত, সে সময় বাম শাসকদের ছত্রছায়ায় থাকা ছাত্র সংগঠনগুলির নেতৃত্বে যারা ছিল, মূলস্রোতের রাজনীতিতে তারা দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সেভাবে উঠে আসতে পারেনি৷

বর্তমান পরিস্থিতিতে কলেজগুলি যখন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের দখলে, ভোট কার্যত বন্ধ, তখনও একই ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে৷ মূলস্রোতের রাজনীতিতে শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের নেতা সেভাবে উঠে আসছে না৷ দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে৷ কিন্তু উঠে আসছে বিরোধী বামেদের ছাত্রমুখ৷ কারণ, তারা এখন মার খাচ্ছে৷

এটাই বোধহয় ইতিহাসের নিয়ম৷ ভারতের প্রেক্ষিতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তো বটেই৷ ফলে আপাত চোখে ছাত্র আন্দোলনের আগুন কিছুটা স্তিমিত হয়ে গেছে মনে হলেও ছাইয়ের নীচে আগুন এখনো জ্বলছে৷ সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন এবং সিএএ বিরোধী আন্দোলন তা প্রমাণ করে দিয়েছে৷ বাকি কথা ভবিষ্যৎ বলবে৷