ভারতে কমছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা | আলাপ | DW | 12.02.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

ভারতে কমছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা

তাহেলকা প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল৷ নারদ তৃণমূল নেতাদের প্রোমোশন আটকাতে পারেনি৷ এটাই ছিল ম্যথুর আক্ষেপ৷

'গলি গলি মে শোর হ্যায়, জর্জ ফার্নান্ডেজ চোর হ্যায়’৷ দেশের অলি-গলি ছেয়ে গিয়েছিল এই স্লোগানে৷ টেলিভিশনের পর্দায় তখনো প্রতিদিন সান্ধ্য বিচারসভা বসার চল শুরু হয়নি৷ কিন্তু আপাত মেদুর টিভি শো তখন রীতিমতো ফুটন্ত৷ দেশের সামরিক কর্তারা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা এবং নেতা-মন্ত্রীরা কি সবাই চোর?

ঘটনার সূত্রপাত সদ্য তৈরি হওয়া একটি পত্রিকার গোপন স্টিং অপারেশন নিয়ে৷ যেখানে গোপন ক্যামেরার সামনে ঘুস নিতে দেখা গিয়েছিল একাধিক নেতা এবং কর্মকর্তাকে৷ রিপোর্টাররা ভূয়া কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে সামরিক অফিসার এবং নেতা-মন্ত্রীদের কাছে গিয়েছিলেন৷ সেনা বাহিনীর জন্য থারমাল ক্যামেরা বিক্রি করতে চেয়েছিলেন তারা৷ আর তাতেই দেখা যায়, নেতা-মন্ত্রী এবং কর্মকর্তারা কীভাবে তাদের কাছে ঘুস চাইছেন৷ ওই ঘটনার প্রায় এক দশক পরে তৎকালীন বিজেপি সভাপতি বঙ্গারু লক্ষ্মণকে অভিযুক্ত ঘোষণা করেছিল আদালত৷ তার জেলও হয়েছিল৷ কিন্তু শারীরিক কারণে পরে তিনি জামিন পান৷ কিছুদিনের মধ্যে তার মৃত্যুও হয়৷

তাহেলকা ওই স্টিং অপারেশনের নাম দিয়েছিল 'অপারেশন ওয়েস্ট এন্ড'৷ গোটা দেশকে ওই স্টিং অপারেশন কার্যত নাড়িয়ে দিয়েছিল৷ বিরোধীদের চাপে, সরকারের চাপে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজ৷ পরে অবশ্য তিনি ওই ঘটনায় গঠিত বিশেষ কমিশনের কাছে ক্লিন চিট পেয়েছিলেন৷ তবে তার সেই ক্লিন চিট পাওয়া নিয়েও প্রচুর জলঘোলা হয়েছিল৷ ফার্নান্ডেজের রাজনৈতিক কেরিয়ার কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল ওই ঘটনায়৷

তাহেলকার আগেও ভারতে স্টিং অপারেশন হয়েছে৷ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়েছে অনেক৷ তবে একুশ শতকে অপারেশন ওয়েস্ট এন্ডই সম্ভবত সব চেয়ে বড় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদাহরণ৷ গোটা দেশে যা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল৷

লম্বা লাফে বেশ কয়েক বছর এগিয়ে যাওয়া যাক৷ ২০১৪ সাল৷ আবার সেই তাহেলকা৷ ততদিনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য রীতিমতো প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছে তাহেলকা৷ তার ম্যানজিং এডিটর বা সম্পাদক তখন ম্যাথু স্যামুয়েল৷ বছর দুয়েকের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন৷ ম্যাথু আবার একটি ভূয়া সংস্থা তৈরি করে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক রাজনীতিবিদের সঙ্গে দেখা করতে শুরু করেন৷ শাসক দলের সেই রাজনীতিবিদদের সঙ্গে দেখা করে ঘুস দিয়ে কোম্পানিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করেন তিনি৷ সবটাই হয় গোপন ক্যামেরার সামনে৷ তৃণমূলের নেতাদের ক্যামেরার সামনে টাকা নিতে দেখা যায়৷

সারদা কাণ্ড নিয়ে ততদিনে এমনিই উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি৷ ম্যাথুর ওই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির হাওয়া গরম করে দেয়৷ বিজেপি কলকাতার সদর দপ্তরে স্ক্রিন টাঙিয়ে ওই স্টিং অপারেশন দেখায়৷ পরে অবশ্য ওই স্টিং অপারেশনে টাকা নিতে দেখা বেশ কিছু তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যোগ দেন৷ বিজেপিও নারদ নিয়ে রাজনৈতিক হইচই অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে৷ ম্যাথুর বিরুদ্ধে মামলা করেছে রাজ্য সরকার৷ কোথা থেকে তিনি টাকা জোগার করেছিলেন, মূলত সেই বিষয়ে মামলা৷

মনে আছে, সে সময় অধম পশ্চিমবঙ্গের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের রিপোর্টার৷ একটি বারে আচমকাই দেখা ম্যাথুর সঙ্গে৷ এক কোণে বসে রাম পান করছেন৷ সাংবাদিকের সঙ্গে সেদিন বহু গল্প করেছিলেন ম্যাথু৷ একটি স্টিং অপারেশনের জন্য কতদিন ধরে পরিকল্পনা করতে হয়, তা বুঝিয়েছিলেন৷ কীভাবে পরিকল্পনার সময় আইনজ্ঞদের সাহায্য নিয়েছেন তিনি, তা-ও জানিয়েছিলেন তিনি৷ সংবাদপত্রে ম্যাথুর সঙ্গে সেই মোলাকাতের কিছু কিছু ঘটনা ছাপাও হয়েছিল৷

একটি কথা সেদিন বলেছিলেন ম্যাথু৷ ২০০১ সালে স্টিং অপারেশনের যে ইমপ্যাক্ট পড়েছিল ভারতে, ২০১৪ সালের ইমপ্যাক্ট তার চেয়ে খানিকটা হলেও কম৷ যত দিন যাবে, ইমপ্যাক্ট আরো কমবে৷ কারণ, এই ধরনের বিষয়ের সঙ্গেও রাজনীতিবিদেরা এবং সমাজ নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে৷ যাকে বলে সিজনড হয়ে নেওয়া৷ ২০০১ সালের ঘটনায় লজ্জায় জর্জ ফার্নান্ডেজ পদত্যাগ করেছিলেন৷ যদিও পরে তিনি ক্লিন চিট পান৷ আর ২০১৪ সালের ঘটনায় ক্যামেরার সামনে যাঁদের দেখা গেল, রাজনীতি ছাড়া তো দূরের কথা, বরং রাজনীতিতে প্রোমোশন হয়েছে তাঁদের৷ দল বদল করার সময়েও তাদের সেই ছবি কোনোরকম সমস্যা তৈরি করেনি৷ সমাজে মাথা তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা৷ সমাজও কিছুদিনের মধ্যেই কার্যত তাঁদের ক্ষমা করে দিয়েছে৷ তদন্তেও বিশেষ হাওয়া আছে বলে মনে হচ্ছে না৷

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

এখানেই সমস্যা৷ এক সময় ভারতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে রীতিমতো চর্চা হতো৷ যত দিন যাচ্ছে, তার পরিমাণ কমছে৷ কারণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সেই ধরনের ইমপ্যাক্ট বা প্রভাব তৈরি করতে পারছে না৷ দ্রুত তৈরি হয়ে যাচ্ছে কাউন্টার ন্যারেটিভ৷ অন্য দিকে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে৷ তাঁদের বিরুদ্ধে এমনকি, মিথ্যা মামলাও হচ্ছে৷ ফলে সময় খরচ করে, সাহস সঞ্চয় করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দিকে খুব বেশি ঝুঁকছেন না পেশাদার সাংবাদিকরা৷ একেবারেই কি হচ্ছে না কিছু? অবশ্যই হচ্ছে৷ কোনো কোনো ইনডিপেন্ডেন্ট সাংবাদিক এখনো এ ধরনের কাজ করছেন৷ অজানা তথ্য সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন৷ তবে সংখ্যায় তা নেহাতই কম৷

তবে একই সঙ্গে আরো একটি কথা বলা দরকার৷ এ ধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যে সব সময় সত্য সামনে আনতে পারে, তা কিন্তু নয়৷ বোফর্স কেলেঙ্কারি সম্ভবত তার সব চেয়ে বড় উদাহরণ৷ আশির দশকের সেই মামলায় সংবাদপত্র রাজবী গান্ধীকে কার্যত চোর প্রমাণিত করে দিয়েছিল৷ সে সময় দিকে দিকে দেওয়াললিখন হয়েছিল-- গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়৷ পরে আদালতে প্রমাণিত হয়, বোফর্স নিয়ে কোনো কেলেঙ্কারি হয়নি৷ রাজীব গান্ধী ক্লিনচিট পেয়েছিলেন৷