ভারতে অসহায়ের রক্ষাকর্তা পুলিশ কর্মকর্তার রেহাই নেই!‌‌  | বিশ্ব | DW | 01.06.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

ভারতে অসহায়ের রক্ষাকর্তা পুলিশ কর্মকর্তার রেহাই নেই!‌‌ 

জনতার রোষের হাত থেকে এক মুসলিম যুবককে উদ্ধার করে ‘‌‌নায়ক'‌‌‌ হয়ে ওঠেন উত্তরাখণ্ডের পুলিশ কর্মকর্তা গগনদীপ সিং৷ চারিদিকে প্রশংসা৷ কিন্তু তারপরই শুরু সমালোচনা৷ আসে প্রাণনাশের হুমকি৷ আমজনতার প্রশ্ন, কোন দিকে যাচ্ছে ভারত?‌

উত্তর ভারত গো-‌বলয়ে হিন্দুত্বের প্রচার নতুন নয়৷ হিন্দুত্বের নামে ভিন ধর্মের মানুষকে পিটিয়ে মারার ঘটনাও নতুন নয়৷ তবে নতুন মনে হয়েছে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা৷ আর তা হলো, হিন্দু মেয়ের মুসলিম প্রেমিক হওয়ার ‘‌অপরাধে'‌ এক যুবককে প্রায় পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা রুখে দিয়েছেন তরতাজা এক পুলিশকর্মী৷ রক্ষাকর্তা সেই পুলিশকর্মী আবার শিখ ধর্মাবলম্বী৷ সপ্তাহব্যাপী গোটা ভারত জুড়ে এই ঘটনা নিয়ে বেশ চাপানউতোর চলছে৷

মারমুখী জনতার রোষ থেকে ছেলেটিকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে এসেছিলেন ওই শিখ পুলিশকর্মী৷ ভিড়ের মধ্যে পুলিশের ঘাড়ে জনতার মার পড়ে৷ কিন্তু হাল ছাড়েননি গগনদীপ৷ নিজে হেনস্থার সিকার হয়েও ‘ঢাল' হয়ে রক্ষা করেন অসহায় যুবককে৷ ক্ষিপ্ত জনতার নিন্দা অথবা গণপিটুনিতে অংশ নেওয়া লোকজনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার পরিবর্তে ওই প্রেমিক যুবককে গণপিটুনির হাত থেকে রক্ষাকারী সেই পুলিশ আধিকারিকের ভূমিকার সমালোচনা শোনা যাচ্ছে অনেকের মুখে৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় গগনদীপকে ‘‌দেখে নেওয়া-'‌র হুমকি ধেয়ে আসছে৷ কেন্দ্রের শাসকদলের একাধিক নেতা গগনদীপের সমালোচনা করেছেন৷ যেমন উত্তরাখন্ডের স্থানীয় বিজেপি নেতা রাকেশ নাইনালের বক্তব্য, ‘‌‘‌এটা খুবই অন্যায়৷ ওরা(‌মুসলিম)‌ পরিকল্পনা করেই হিন্দু মেয়েদের ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে৷ এই ঘটনায় মেয়েটিকে মন্দিরের মতো পবিত্র জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল৷ এত সাহস এল কোথা থেকে?‌'‌'‌

আর এক বিজেপি বিধায়ক রাজকুমার ঠাকরালের কথায়, ‘‌‘‌আমরা হিন্দুরা তো মসজিদে গিয়ে অশান্তি করি না৷ তাহলে ছেলেটি কেন এসেছিল?‌'‌'

ঘটনা হলো, নিজের হিন্দু বান্ধবীকে নিয়ে মন্দিরে গিয়েছিলেন ওই মুসলিম যুবক৷ ঘটনাস্থল উত্তরাখণ্ডের রামনগর৷

কানপুর রেলস্টেশনে মেয়েটির সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল মুসলিম ছেলেটির৷ সেখান থেকেই তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে কিছু লোক৷ এরপর স্টেশন চত্ত্বরে তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হয় তাঁকে৷ এরপর শুরু হয় গণধোলাই৷ সেখানে মেয়েটিকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চলছে, এই অভিযোগে যুবককে মারধর করতে শুরু করে জনতা৷ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান পুলিশ কর্মকর্তা গগনদীপ সিং৷ তিনি উন্মত্ত জনতার হাত থেকে প্রেমিক-‌প্রেমিকাকে উদ্ধার করেন৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে সেই ভিডিও৷ ভিডিওটি তুলেছে নির্যাতনকারী দলের কোনো এক সদস্যই৷ সেখানে দেখা গেছে, ক্রমাগত মার খাচ্ছেন ওই মুসলিম যুবক৷ যে মারছে তার মুখে অশ্রাব্য গালিগালাজ, সঙ্গে প্রাণ নাশের হুমকি৷ কতদিন মেয়েটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে, সেকথাও জানতে চাওয়া হয়েছে৷ দু'‌মিনিটের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই হইচই শুরু হয়৷ ওই ভিডিওতেই কেউ কেউ বলছেন, ‘‘যদি তোর জীবন বরবাদ না করে দিতে পারি, তা হলে আমাদের নামই বদলে দেবো!''

অডিও শুনুন 03:27
এখন লাইভ
03:27 মিনিট

‘ভারতের মতো সার্বভৌম ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশের চরিত্রটাই বদলে যেতে বসেছে’

ডয়চে ভেলেকে সমাজতত্ত্ববিদ প্রাণেশ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ‘‌‘‌এই ধরনের উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের ঘটনা গত তিন-‌চার বছর ধরে ক্রমশ বেড়ে চলেছে৷ আজ ভারতের মতো সার্বভৌম ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশের চরিত্রটাই বদলে যেতে বসেছে৷ বিভিন্নতার মধ্যে ঐক্যের ছবি বদলে গিয়ে মুসলিম বিদ্বেষ বেড়ে চলেছে৷ এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য৷''

ভারতের মতো দেশে আরও অনেক গগনদীপের প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্রাণেশ৷ তাঁর কথায়, ‘‌‘‘ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নীতি-‌পুলিশের বাড়াবাড়ি দেখা যাচ্ছে৷ গগনদীপের কথা ভাবলে বিষয়টা আশাব্যঞ্জক৷ তিনি নিজের কর্তব্য পালন করেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে৷ উগ্র হিন্দুত্ববাদের পরিস্ফুটন রুখে দিতে গগনদীপ একজন ব্যতিক্রম চরিত্র৷ আমাদের দেশে আরও অনেক গগনদীপের প্রয়োজন৷ গগনদীপরা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন৷'‌'

এদিকে, উত্তরাখন্ডের যে জেলায় এই ঘটনা ঘটেছে, সেই রামনগরের বাসিন্দা কইসর রাণার কথায়, ‘‘‌একজন ছেলে ও মেয়ে যদি তাদের নিজেদের ইচ্ছেয় কোনো জায়গায় যায় তবে সমস্যা কোথায়?‌ উগ্র দক্ষিণপন্থি কিছু লোক আচমকা ওদের ওপর চড়াও হয়েছিল৷ স্থানীয় মানুষের এতে কোনো সমর্থন নেই৷'‌'‌

এদিকে, যখন প্রথমবার ইন্টারনেটে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে অনেকেই গগনদীপকে ‘‌হিরো'‌ সম্বোধন করতে শুরু করেন৷ ভারতের প্রথম সারির দৈনিক সংবাদপত্রগুলি গগনদীপের খবর প্রকাশ করে৷ লেখক চেতন ভগত, লেখিকা তসলিমা নাসরিন, এমনকি বলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাতা ফারহান আখতাররা ওই শিখ পুলিশকর্মী গগনদীপের ভূয়সী প্রশংসা করে টুইট করেছেন৷ তবে যাঁকে নিয়ে এত কাণ্ড, সেই গগনদীপ নিজে অবশ্য বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন, ‘‌‘আমি তো আমার কর্তব্য পালন করেছি মাত্র৷ এমনকি পুলিশের ইউনিফর্মে না থাকলেও একই কাজ করতাম৷ আমার মনে হয়, আমার জায়গায় যে কোনো ভারতীয় থাকলে তাঁরও একই কাজ করা উচিত হতো৷'‌'

কিন্তু হায়!‌ দুর্ভাগা ভারতে এই প্রশংসার ঝড় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি৷ এরপরই শুরু হয়ে যায় গগনদীপের সমালোচনা, তাঁর ভূমিকার নিন্দা৷ কেউ কেউ তো তাঁকে হুমকিও দিতে দ্বিধা করেননি৷ রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ তো ভিড়ের (‌জনতা) পক্ষ নিয়ে ওই মুসলিম যুবককে গণপিটুনির পক্ষেও কথা বলেছেন৷ স্বভাবতই যুবকটিকে রক্ষা করার জন্য গগনদীপের ওপর রোষ জন্মেছে অনেকের৷ তাঁর প্রাণনাশের হুমকিও এসেছে৷ গগনদীপ নিজে জানিয়েছেন, ঘটনার দিন তাঁর ‘‌উগ্র'‌ ভূমিকার তীব্র নিন্দা করে বহু মেসেজ পেয়েছেন তিনি৷ ঘৃণা এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, গগনদীপকে ছুটিতে পাঠিয়েছে পুলিশ দপ্তর৷ তাঁকে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে হচ্ছে৷ তবে চিকিৎসকের কাছে ঠিক কী ধরনের পরামর্শ নিতে হচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়