ব্লাসফেমি আইন ও মানবাধিকার | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 27.02.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সমাজ সংস্কৃতি

ব্লাসফেমি আইন ও মানবাধিকার

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক দেশেই ‘ব্লাসফেমি', ‘ধর্মীয় অবমাননা' এবং ‘ধর্মত্যাগ' শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ বাস্তবে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্রুতা, জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রেও হাতিয়ার করা হয় এসব আইনকে৷

ক্যানাডাতেও নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কায় পাকিস্তানের আসিয়া বিবি

ক্যানাডাতেও নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কায় পাকিস্তানের আসিয়া বিবি

প্রায় ১০ বছর ধরে গৃহবন্দী ছিলেন আসিয়া বিবি৷ শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে অব্যাহতি দেয়৷ আসিয়া বিবির এ ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷

কিন্তু ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তাকে কী পরিমাণ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে, তা জানেন না বিশ্ববাসী৷ ২০১৯ সালের মে মাসে পাকিস্তান ছেড়ে ক্যানাডায় চলে যান আসিয়া বিবি৷ সেখানেও তাকে দুঃস্বপ্ন তাড়া করে বেড়ায়৷ আসিয়াকে হত্যা করার আহ্বান জানিয়ে এক ভিডিও পোস্ট করে এক ধর্মীয় উগ্রপন্থি৷ এখনও নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কায় আসিয়া৷

কী অভিযোগ ছিল আসিয়া বিবির বিরুদ্ধে? মনগড়া কিছু বাজে কথা, যা নিয়ে মন্তব্য করারও প্রয়োজন পড়ে না৷ কিন্তু পাকিস্তানে এসব অভিযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবেই নেয়া হয়৷ এমনকি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও তা গা সওয়া হয়ে গিয়েছে৷ আসিয়া বিবির ঘটনা ছিল ব্যতিক্রম৷ কিন্তু সে ক্ষেত্রেও তার ১০ বছরের নরকবাসের একটা অংশই কেবল গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে, বাকিটা রয়ে গেছে আড়ালেই৷

পাকিস্তানের ‘কালো আইন'

আসিয়া বিবির মতো ঘটনা ব্লাসফেমি নিয়ে চলমান নৈরাজ্যের বিষয়টি তুলে ধরেছে৷ তার এই ঘটনা নিয়ে খুন হতে হয়েছে দুজনকে৷

২০০৯ সালে পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসিয়া বিবিকে দেখতে যান৷ কারাকক্ষ থেকে বের হয়ে পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইনকে ‘কালো আইন' বলে আখ্যা দেন৷ ২০১১ সালে এই বক্তব্যের জন্যই তাকে প্রাণ দিতে হয়৷ একই কারণে প্রাণ হারান সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টিও৷ ব্লাসফেমি আইনের সমালোচনা করে আসিয়া বিবির পক্ষে কথা বলার সাহস দেখিয়েছিলেন তারা৷

গভর্নরের হত্যাকারী ছিল তারই দেহরক্ষী৷ সুষ্ঠু বিচার শেষে মুমতাজ কাদরিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়৷ লক্ষ লক্ষ ফেসবুক ব্যবহারকারী এবং নিরক্ষর সহানুভূতিপ্রবণ জনতা এই ঘাতককে সমর্থন করেছিলেন৷ তাকে শহিদের মর্যাদাও দিয়ে ‘জান্নাতের দরজা প্রশস্ত' বলেও মন্তব্য করেন অনেকে৷

২০১৫ সালে যখন হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়, পুরো পাকিস্তানে ছিল শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা৷ প্রেসিডেন্ট মামনুন হোসাইন কি তাকে ক্ষমা করে দিবেন? ব্লাসফেমির কারণে হত্যা করেও ক্ষমা পাওয়ার দৃষ্টান্ত কিস্থাপন হবে? ফলে ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি যখন হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড সত্যিই কার্যকর হলো, জনগণ বেশ অবাকই হয়েছিলেন৷ তারপর এক সপ্তাহ ধরে উগ্রবাদীরা রাজধানী ও অন্যান্য নগর স্তব্ধ করে দিয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছে৷

রাশিয়া (স্থগিত) এবং বেলারুশ (চালু) ছাড়া ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা হয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেটের ১৩টিতে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছে, ২১টিতে বিলোপ করা হয়েছে৷ পাকিস্তানসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে এখনও মৃত্যুদণ্ড চালু রয়েছে৷

এই প্রেক্ষাপটে গভর্নরের হত্যাকারীকে ক্ষমা করতে প্রেসিডেন্টের অস্বীকৃতি দারুণ একটি বিষয়৷ মুসলিম বিশ্বের অনেক অংশে প্রথাগত আইনের দৃঢ় প্রত্যাখ্যান এটি৷

একবিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ‘ব্লাসফেমি', ‘ধর্মের অবমাননা' এবং ‘ধর্মত্যাগের' বিরুদ্ধে আইন করেছে৷ পাকিস্তান, অরান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, নাইজেরিয়া এবং সোমালিয়াতে ব্লাসফেমি এবং ধর্মত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড৷ মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইয়েমেন, সুদান এবং মৌরিতানিয়াতেও ধর্মত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড৷ অন্য অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নানা মোড়কে ব্লাসফেমি আইন চালু রয়েছে৷ ১৯৮৪ সালের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন অগ্রাহ্য করে অনেক জায়গাতেই প্রকাশ্যে দোররা মারার মতো নিষ্ঠুর শাস্তিও দেয়া হচ্ছে৷

উদাহরণ ইন্দোনেশিয়াতেও

কোরআনের একটি আয়াত নিয়ে কথা বলায় ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জাকার্তার সাবেক গভর্নর বাসুকি চাহাইয়া পুর্নামাকে দুই বছর কারাগারে কাটাতে হয়৷ পুর্নামা নৃতাত্ত্বিকভাবে একজন চীনা খ্রিস্টান ছিলেন৷

২০১৮ সালে আরেক নৃতাত্ত্বিক চীনা বৌদ্ধ মেইলিয়ানাকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়৷ তার অপরাধ কী ছিল? তার আবাসস্থলের তারপাশে মসজিদের মিনার থেকে আযানের উচ্চ ধ্বনি নিয়ে তিনি অভিযোগ করেছিলেন৷ তার এই অভিযোগকে ‘ইসলামকে অপমান' করার ব্যাখ্যা দেয়া হয়৷

মানবাধিকারের লংঘন

এই ঘটনাগুলো মৌলিক মানবাধিকারের সঙ্গে চূড়ান্তভাবে সাংঘর্ষিক৷ ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের গ্রহণ করা মূলনীতিকেও অগ্রাহ্য করে এসব নীতি৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যা ও বীভৎস যুদ্ধাপরাধের বিপরীতে গিয়ে ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস গ্রহণ করা হয়৷ তা সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন নৃশংসতা এখনও ঘটে, এবং মানবাধিকারই সবার আগে ভূলুণ্ঠিত হয়৷

‘ব্লাসফেমি', ‘ধর্মের অবমাননা' এবং ‘ধর্মত্যাগ' নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, উগ্রবাদ ও সহিংসতাকেই উসকে দেয়৷ কারো ধর্ম পরিবর্তন করাটাকেও সহিষ্ণুতার সঙ্গে দেখা হবে, সেদিন বেশ দূরে বলেই মনে হচ্ছে৷

থমাস ক্রাপ্ফ/এডিকে/কেএম

© D+C | Development & Cooperation 2020

বিজ্ঞাপন