ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট: বিস্তৃতি যখন বাজার থেকে সংসদে বা সরকারে | আলাপ | DW | 21.05.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট: বিস্তৃতি যখন বাজার থেকে সংসদে বা সরকারে

দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যবসা-বাণিজ্যে সিন্ডিকেট নেতিবাচক আর আতঙ্কের এক শব্দ৷ এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ শুধু বাজারে পণ্যের দামের কারসাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়৷ এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে সরকারও৷

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মিলে কোনো একটি র্নিদিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল করা, ইংরেজি ‘সিন্ডিকেট' শব্দটির মানে অনেকটা এমনই৷

অর্থনীতি আর ব্যবসা-বাণিজ্যে সিন্ডিকেটের আলাদা একটি গুরুত্ব আছে৷ একটি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে যখন কোনো উদ্যোগ, বিনিয়োগ বা লেনদেন সম্ভব হয় না, তখন অনেকে মিলে সেটি করলে তাকে সিন্ডিকেট হিসেবে অভিহিত করা হয়৷ আর্থিক খাতে বিশেষ করে ব্যাংকিংয়েও সিন্ডিকেট গুরুত্বপূর্ণ৷ বড় আকারের কোনো ঋণের ক্ষেত্রে কয়েকটি ব্যাংক মিলে যখন তার জোগান দেয়, তখন সেটি ‘সিন্ডিকেটেড লোন' হিসেবে বিবেচিত হয়৷ কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যে সিন্ডিকেট এখন দেশের সাধারণ মানুষের কাছে নেতিবাচক আর আতঙ্কের এক শব্দে পরিণত হয়েছে, যা দিয়ে তারা ব্যবসায়ীদের এক ধরনের মেকানিজমকে বোঝেন, যার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে ভোক্তাদের ঠকানোর যাবতীয় আয়োজন করা হয়৷

প্রতি বছর রোজা এলেই এই মেকানিজমটি টের পাওয়া যায়৷ ব্যবসায়ী নেতারা রোজো শুরুর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠক করেন৷ ঘোষণা দেন, চাহিদার অতিরিক্ত পণ্যের মজুদ থাকায় কোনো পণ্যেরই দাম বাড়বে না৷ বিগলিত হয়ে বাণিজ্য মন্ত্রীও তখন মানুষকে আশ্বাসের বাণী শোনান৷ তারপর বাজারে গিয়ে ভোক্তারা বোকা হতে শুরু করেন৷ একই চিত্রনাট্যের মঞ্চায়ন চলছে বছরের পর বছর৷ সাধারণ মানুষের কাছেও বিষয়টি নিয়তির মতো হয়ে গেছে৷ এক বন্ধু ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘ঠিক কী মেকানিজমের কারনে রমজানে কিছু জরুরি খাদ্যপন্যের দাম বেড়ে যায় আমার জানা নেই৷ …….এই মাসটা এলে খুব অসহায় লাগে৷ একদম প্রথম দিন থেকে ঈদে বাড়ি যাওয়া এবং আসা পর্যন্ত প্রত্যেকটা ব্যপারে অতিরিক্ত খরচ করতে হয়৷ রাস্তা-ঘাটে, দোকানে, বাসে, লঞ্চে মানুষ টাকা উপার্জনের জন্য জানোয়ারের মতো আচরণ করে৷ এ যেন এক অত্যাচারের মহোৎসব৷'' 

এই অত্যাচারের মহোৎসব থেকে নাগরিকদের মুক্ত করতে সরকার যে কোনো তৎপরতা দেখায় না, তা নয়৷ এই যেমন ধরুন ঢাকার ২০০টির বেশি বাজারের জন্য আটটি দল সর্বসাকুল্যে বাজার মনিটরিং করছে রোজার মাসে৷ একজন কর্মকর্তা দিয়ে জেলা পর্যায়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার নজরদারি করছে৷ জেলা প্রশাসন থেকেও মাঝে মাঝে কিছু তৎপরতা দেখানো হচ্ছে৷ কী করছেন তারা? খুচরা আর বড়জোর পাইকারি বাজারে হানা দিচ্ছেন৷ অতিরিক্ত মুনাফার জন্য ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিচ্ছেন৷ কিন্তু দাম বাড়ানোর জন্য খুচরা-পাইকারি ব্যবসায়ীরাই কি শুধু দায়ী? বড় আমদানিকারক, শিল্প গ্রুপ, যারা তেল, চিনির মতো খাদ্য পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযানের খবর কি শোনা গেছে কখনো? কত টাকায় আমদানি করে কত টাকায় তারা পণ্য বাজারে ছাড়ছে, কীভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সেসব বিষয় খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করছে না সরকার, কেননা ব্যবসায়ীদের এই উঁচু পর্যায়ের সিন্ডিকেটের অর্থের জোর বেশি, ক্ষমতাও বেশি৷ 

প্রতি বছর বাজেটের আগে ব্যবসায়ীরা কর-সুবিধা নেয়ার জন্য তদবির শুরু করেন৷ এখানেও কে কতটা সুবিধা পাবেন তা নির্ভর করে কার সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী তার উপরে৷ রপ্তানি আয়ের আশিভাগের বেশি উৎস তৈরি পোশাক খাতই সবচেয়ে বেশি প্রণোদনা ভোগ করে৷ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধ্যাদেশ অনুযায়ী রপ্তানির বিপরীতে ১ শতাংশ উৎসে কর দিতে হয়৷ কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই খাতের জন্য  বিশেষ সুবিধায় সেটি দশমিক ৭ শতাংশে রাখা হয়েছে৷ ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির আগে এই কর কমিয়ে দশমিক দুই পাঁচ শতাংশ করে নেন তারা৷

তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সিন্ডিকেট এতটা শক্তিশালী যে, তাজরীন ফ্যাশনসে শতাধিক শ্রমিক আগুনে পুড়ে কিংবা রানা প্লাজা ধ্বসে হাজারো শ্রমিকের মৃত্যুতেও কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না৷ অথচ শ্রমিক দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করলে গুলি করা হয়, অজ্ঞাত মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার আর হয়রানি চলে৷ সরকার আর কারখানা মালিকদের সিন্ডিকেট যেন সেখানে একাকার হয়ে যায়৷

 

জনগণের কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেছে ব্যাংক থেকে৷ সেই টাকা উদ্ধার করতে পারছে না সরকার৷ এই ঋণখেলাপিদের সিন্ডিকেটটি এতটাই শক্তিশালী যে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তো দূরে থাক উল্টো অর্থ ফেরত দিতে নানা ছাড় দিতে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে৷ তা-ও টাকা উদ্ধার করা যাচ্ছে না তাদের কাছ থেকে্ খেলাপি ঋণের টাকা আদায় করা যায় না, অথচ বছর বছর বাজেট থেকে জনগণের করের টাকায় ব্যাংকের তারল্য সংকট মেটানো হয়৷ 

গত বছর সুদের হার কমানোর জন্য ব্যাংক মালিকদের নিয়ে বৈঠক করেছিল সরকার৷ মালিকদের সিন্ডিকেট ঋণের সুদ হার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে কর্পোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমার হার ১ শতাংশ হ্রাস করে নেন৷ তাদের কথামতো আমানত বাড়াতে বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি অর্থ জমা রাখার সীমাও ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়৷ আর টানা ৯ বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকা ও এক পরিবারের ৪ জনকে ব্যাংকের পর্ষদে থাকার সুযোগ করে দেয় সরকার৷ এতসব সুবিধা নিয়েও সুদের হার দশ শতাংশের নীচে নামিয়ে আনার কথা রাখেননি মালিকরা৷

ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কাছে হার মানতে হয় সরকারকে বারবারই৷ ২০১০ সালের নিমতলী ট্র্যাজেডির পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেয়ার তৎপরতা শুরু করে সিটি কর্পোরেশন৷ কিন্তু ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ও রাসায়নিক পদার্থের ব্যবসায়ীদের চাপে তা সম্ভব হয়নি৷ চলতি বছর চকবাজার ট্র্যাজেডির পর আবারও বিষয়টি সামনে আসে৷ প্রধানমন্ত্রীও সেখান থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর ঘোষণা দেন৷ এবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল৷ কিছুদিন লোক দেখানো তৎপরতার পর অভিযান থেকে সরে আসা হলো৷ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসায়ীদের মুনাফাকেই প্রশ্রয় দিলো সরকার৷

DW-Mitarbeiter Porträt Faisal Ahmed (Masum Billah)

ফয়সাল শোভন, ডয়চে ভেলে

প্রশ্ন হলো, কেন সরকার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে এতটা নতজানু? রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবসায়ীদের টাকা কিংবা পৃষ্ঠপোষকতায় চলে, সেটি নতুন নয়৷ কিন্তু ব্যবসায়ীরা এখন শুধু আড়ালে থাকছেন না, সরাসরি রাজনীতির মাঠেই নেমে পড়েছেন৷ তারাই আইন প্রণয়ন করছেন, রাষ্ট্রীয় নীতি ঠিক করছেন, সরকার চালাচ্ছেন৷

স্বাধীনতার পর জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সাড়ে ১৭ ভাগ ছিলেন ব্যবসায়ী৷ ১৯৯১ সালে যা বেড়ে ৩৮ ভাগে দাড়ায়৷ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যদের ১৮২ জনই পেশায় ব্যবসায়ী৷ মোট সংসদ সদস্যের যা ৬২ ভাগ৷ বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে আছেন ব্যবসায়ীরা৷ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের কাছে ব্যবসা আর মুনাফাই প্রাধাণ্য পাবে সেটি বলা বাহুল্য৷ আর এজন্যই হয়ত রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও বলেছেন, ‘‘রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে৷ এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয়৷''

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন