বোনের স্মরণে হাসপাতাল গড়ছেন ট্যাক্সিচালক সহিদুল | বিশ্ব | DW | 14.12.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

বোনের স্মরণে হাসপাতাল গড়ছেন ট্যাক্সিচালক সহিদুল

হাসপাতাল তৈরির মতো বিপুল কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়েছেন ট্যাক্সিচালক মহম্মদ সহিদুল লস্কর৷ স্বপ্নের হাসপাতাল তৈরির জন্য দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও ছুটে গিয়েছিলেন তিনি৷

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের প্রান্তিক পুঁড়ি গ্রামের মধ্যে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই৷ নেই কোনো সরকারি ডিসপেনসারি৷ হাসপাতাল বলতে সবচেয়ে কাছে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতাল, তা-ও ১১ কিলোমিটার দূরে৷ গ্রামে নেই আপৎকালীন অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা৷ ৪৫ কিলোমিটার দূরে কলকাতায় গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে যাওয়ার ঝামেলা কতটা, সেটা জানেন ভুক্তভোগীরাই৷ সহিদুল লস্কর নিজেও জানেন৷

২০০৪ সালে সহিদুলের বোন আঠারো বছরের মারুফা বিনা চিকিৎসাতেই মারা গিয়েছিলেন৷ বোনের এই অকাল মৃত্যুই সহিদুলকে হাসপাতাল তৈরির দিকে এগিয়ে দিয়েছিল৷ সহিদুল বলেন, ‘‘বোনের মতো আর কাউকে যাতে এভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে না হয়, সে ব্যবস্থা করতে গ্রামে হাসপাতাল গড়ে তোলাটা দরকার৷ এটা মনে হয়েছিল৷ যেখানে বিনামূল্যে মিলবে স্বাস্থ্য পরিষেবা৷''

অডিও শুনুন 06:13

‘আর কাউকে যেন বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে না হয়’

তাই ব্যক্তিগত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে নিজের তিনটে ট্যাক্সি, কিছু জমি, স্ত্রীর গয়না বেচে এ কাজে নেমেছেন সহিদুল৷ এখন একটি ট্যাক্সি ভাড়ায় নিয়ে নিজেই চালান৷ কিন্তু কলকাতা শহরে শুধু ট্যাক্সি চালিয়ে হাসপাতাল তৈরি করবেন কীভাবে? সহিদুল ডয়চে ভেলেকে জানান, এ কাজে তিনি একা নন৷ যাত্রীরা তাঁর সহায়৷ তিনি বলেন, ‘‘ট্যাক্সি যাত্রীদের বলতাম আমার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে৷ প্রথমদিকে হয়তো তেমন সাড়া না পেলেও পরে আমি যখন একটু একটু করে এগোতে থাকি, হেলথ্ ক্যাম্পের আয়োজন করতে থাকি৷ যাত্রীদের সেসব ছবি দেখাতাম৷ তাঁরা বিশ্বাস করে যে যেমন পারতেন, আমাকে সাহায্য করতেন৷''

বলাই বাহুল্য, এ কাজে অনেক প্রতিবন্ধকতা এসেছে৷ পরের দিকে অনেকের সাহায্যও এসেছে৷ তিনি হয়ে উঠেছেন দৃষ্টান্ত৷ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘মন কি বাত'  অনুষ্ঠানে প্রশংসা করেছেন সহিদুলের৷ তিনি বলেছেন, ‘‘সহিদুল কলকাতার কাছে পুঁড়ি গ্রামে একটি হাসপাতাল তৈরি করেছেন৷ এটাই নতুন ভারতের শক্তি৷''

২০০৮ সালে সহিদুল তৈরি করেছেন মারুফা স্মৃতি ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন৷ তখন থেকেই সহিদুলের বার্তা যে মানু্ষের হৃদয়কে ধীরে ধীরে স্পর্শ করছে, তার উদাহরণ সৃষ্টি ঘোষের মতো কিছু সহৃদয় মানুষ৷ ‘ওয়ান-ম্যান আর্মি' সহিদুলের কর্মকাণ্ড শুনে এবং চাক্ষুষ দেখে তিনি সহিদুলকে নিজের প্রথম চাকরির প্রথম মাসের বেতন ২৫ হাজার টাকাই দিয়ে দিয়েছিলেন৷

অডিও শুনুন 07:25

‘ক্ষুদ্র সামর্থের মধ্যে কিছু করতে পেরে ভালো লাগছে’

ডয়চে ভেলেকে সৃষ্টি বললেন, ‘‘একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার হয়ে উনি যদি এই সাহস দেখাতে পারেন, তাই আমার মনে হয়েছিল, সমাজের এমন কাজে আমারও এগিয়ে আসা উচিত৷'' সহিদুল সৃষ্টির কথা ভোলেননি৷ মারুফা মেমোরিয়ালের উদ্বোধন তিনি সৃষ্টির হাতেই করিয়েছেন৷ 

সহিদুলের পাশে প্রথম থেকেই দাঁড়িয়েছেন তাঁর স্ত্রী শামিমা লস্কর৷ তিনি স্বামীর এমন কাজে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত৷ দশ বছর আগে স্বামী যখন এমন বিপুল কর্মকাণ্ডের কথা তাঁকে বলেছিলেন, তিনি অবাক হয়েছিলেন৷ তবে অসম্মত হননি৷ স্বচ্ছলতার চিন্তা না করে নিজের গয়না দিয়ে দিয়েছিলেন এই মহৎ কাজে৷ তবে যখন একমাত্র শিশুপুত্রের নামে জীবনবিমার টাকাও ভেঙে ফেলেছিলেন স্বামী, তখন একমুহূর্তের জন্য তাঁর মাতৃহৃদয় সন্তানের সুরক্ষার কথা ভেবে কেঁপে উঠেছিল৷ সহিদুল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমি স্ত্রী-কে বলি, যতদিন আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে, ততদিন অন্তত দু'বেলা খাবারের অভাব হবে না৷ এই ভরসাতেই আমার স্ত্রী এগিয়ে এসেছিলেন৷'' 

শামিমা বলেন, ‘‘আজ আমার অলংকারের শখ নেই৷ বরং আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থের মধ্যে মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে ভালো লাগছে৷ আমার রোগীদের আমি নিজের হাতে সেবা করতে চাই৷ এখন অনেক মানুষ সাহায্য করেন৷ তাতে আরো অনুপ্রাণিত হচ্ছি৷''

হাসপাতালে বয়স্কদের জন্য বিশেষ পরিষেবা রাখতে চান সহিদুল৷ অ্যাম্বুলেন্সও বড় দরকার৷ এসবের মধ্যেই ধীরে ধীরে ৫০ শয্যার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন হয়েছে৷ অনেকের সহায়তায় গড়ে ওঠার পথে ‘মারুফা মেমোরিয়াল হাসপাতাল অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট'৷

অডিও শুনুন 02:08

‘এখনো অনেক ফান্ডিং লাগবে’

এখন মূলত আউটডোর ট্রিটমেন্ট পরিষেবাই চলে সহিদুলের হেলথ ক্যাম্পে৷ শহরের ডাক্তাররা সেখানে উপস্থিত হন৷ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর চিকিৎসক শুভ্রজ্যোতি ভৌমিক সহিদুলের ডাকে সাধ্যমতো সহায়তা করেন হেলথ ক্যাম্পে৷ তিনি বললেন, ‘‘আজকের দিনে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার বিপুল খরচ৷ সেসব মাথায় রেখে সহিদুলদা যেভাবে এ কাজে এগিয়ে এসেছেন, তাতে আমরা আশাবাদী৷ তবে এখনো অনেক ফান্ডিং লাগবে৷ কারণ, ডাক্তার, নার্সসহ স্পেশালিস্টও লাগবে এখন হাসপাতালে৷ অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা তো দরকারই৷ প্রত্যন্ত গ্রামে গুরুতর রোগীদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুব দরকার৷''

সহিদুল জানেন, তাঁর এখনো অনেক কাজই বাকি৷ তাই হাসপাতালের ১২ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন দিল্লি৷ এটা অনেকটা রূপকথার মতোই ঘটেছে তাঁর জীবনে৷ দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তাঁর প্রশংসা করেছেন রেডিওর অনুষ্ঠানে৷ সেই আমন্ত্রণে দিল্লিতে ‘মন কি বাত' অনুষ্ঠানে ট্যাক্সিচালক সহিদুল লস্কর পৌঁছে গিয়েছিলেন এই হাসপাতালের জন্য নতুন স্বপ্ন নিয়ে৷ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দেখা না হলেও দুরদর্শনের কেন্দ্রীয় অধিকর্তার হাতে তিনি তুলে দিয়েছেন ১২ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব৷ এখন প্রতীক্ষা রয়েছে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদানের৷

এই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতেই ‘পদ্মশ্রী' সুবাসিনী মিস্ত্রি গড়ে তুলেছেন নিজের হাসপাতাল৷ কোনো সরকারি সাহায্য নয়, নিজের সবজি বিক্রির টাকা জমিয়ে তাঁর হাসপাতাল তৈরির কাহিনি ডয়চে ভেলে এর আগেই প্রকাশ করেছে৷ তরুণ সহিদুলকেও পথ দেখাচ্ছেন প্রবীণা সুহাসিনী৷ তাঁর সাফল্য অনুপ্রাণিত করেছে এক ট্যাক্সি চালককেও৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন