বিহারে পাত্র অপহরণ করে বিয়ে দেওয়া বাড়ছে | বিশ্ব | DW | 06.03.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

বিহারে পাত্র অপহরণ করে বিয়ে দেওয়া বাড়ছে

বিহারে গরিব পরিবারের মেয়েদের অর্থাভাবে পাত্রস্থ করতে না পারায় কোনো যুবককে লোক দিয়ে জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়৷ এই ধরনের বিয়ে কমছে তো না-ই, বরং বাড়ছে৷ স্থানীয় ভাষায় এই ধরনের বিয়েকে বলা হয় পাকড়ুয়া বিয়া বা শাদি৷

পাত্রকে অপহরণ করে বিয়ে দেওয়ার এই প্রাচীন প্রথা নিয়ে ভারতের বিহার রাজ্য রীতিমতো সরগরম৷ সোনু নামে এক যুবক অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন৷ রেল স্টেশনে যাবার পথে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মুখোশপরা কিছু লোক তাঁকে জোর করে গাড়িতে তুলে সোজা নিয়ে যায় বিয়ের মন্ডপে৷ হতবাক সোনু কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাত্রীর সঙ্গে বিয়ের মালাবদল, মন্ত্রপাঠ সবকিছু হয়ে যায়৷ অপহরণকারীরা সাধারণত মুক্তিপণ দাবি করে৷ এক্ষেত্রে তা হলো না৷ মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে শুধু আদেশ – বধূ বেশে বসে থাকা ঐ মেয়েটিকে বিয়ে করতে হবে. নাহলে মুক্তি নেই৷ আরেকবার বিয়ে হয়ে গেলে সামাজিক দায়-দায়িত্ব এড়াবার আর কোনো পথ নেই৷ এই ঘটনা বিহারের সহর্ষা গ্রামের৷

রাজ্য পুলিশের রিপোর্ট বলছে, গত বছর দৈনিক গড়ে ৯ জন পাত্রকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে অপরিচিত পাত্রীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ বিহারের মাধেপুরা জেলার পুলিশ প্রধান আনন্দ কুমার সিং স্বীকার করেন, উপযুক্ত পাত্রকে অপহরণ করার ঘটনা কখনো কখনো ঘটে থাকে৷ এই ধরনের পাকড়ুয়া শাদি সাধারণত বেশি হয়ে থাকে ভূমিহার ও যাদব সম্প্রদায়ে৷

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, খুব বেশি দিনের কথা নয়. এক সময় বিহার ছিল পিছিয়ে পড়া রাজ্য৷ দারিদ্র্য, অশিক্ষা, বেকারত্ব, দুর্নীতি, পরিকাঠামোর অভাবে জর্জরিত৷ এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও গরিবিয়ানা পিছু ছাড়েনি৷ তার ওপরে আছে জাতিভেদপ্রথা এবং পণপ্রথা৷ অন্যান্য রাজ্যগুলির তুলনায় বিহারে পণপ্রথা মারাত্মক৷ পাত্রীর অভিভাবকদের ক্ষমতা থাকুক না থাকুক, মেয়ের জন্য পাত্রপক্ষকে দিতে হয় মোটা টাকা পণ, গয়নাগাটি এবং আনুষঙ্গিক উপহার৷ সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না বলে এই অপহরণ বিয়ে বা পাকড়ুয়া বিয়ের পথ বেছে নিয়েছে বিহারি মেয়েদের অভিভাবকরা৷

জনৈক পুলিশকর্তার মতে,পণ দেওয়া-নেওয়ানিয়ে দর কষাকষির জেরে অনেক সময় পাত্রপক্ষ বিয়ে ভেঙে দিতে চায়৷ সেক্ষেত্রে অপহরণ বিয়ে হয়৷ বিয়ের পর অবশ্য আলোচনা করে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করা হয়৷ দ্বিতীয়ত বিহারে পুত্র ও কন্যা সন্তানের অনুপাতে যথেষ্ট ফারাক৷ ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে প্রতি হাজার ছেলেপিছু ৭৫১ জন মেয়ে৷ এর বড় কারণ কন্যাভ্রুণ হত্যা৷

জোরজুলুমের বিয়েতে স্বভাবতই আশংকা থাকে যে, বলা নেই, কওয়া নেই এই ধরনের গায়ের জোরে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে যেখানে প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত আছে, সেই বিয়ে শেষ পর্যন্ত কি টেঁকে? টিকলে কতদিন? টিকিয়ে রাখার জন্য পাত্রকে এই বলে শাসানো হয়, ‘‘যদি বৌ-কে ছেড়ে যাও বা নির্যাতন করো, তাহলে তোমাকে এবং তোমার পরিবারকে খুন করা হবে৷''

এজন্য পেশাদার গুন্ডাদেরও কাজে লাগানো হয়৷  তা সত্ত্বেও দু-এক বছরের বেশি অধিকাংশ বিয়ে টেকে না৷ অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে৷ কোনো কোনো পাকড়ুয়া বিয়ের দম্পতি সারা জীবন সুখে ঘরকন্না করছে৷ বিহারের সমাজতত্ববিদরা মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অপহরণ বিয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং যাবে৷ কারণ, সামাজিক স্বীকৃতি আর আগের মতো নেই৷ তবে সংখ্যাগত দিক থেকে বিশেষ তারতম্য হয়নি৷

পাকড়ুয়া বিয়ে সম্পর্কে বিহারে জন্ম নেয়া সমাজকর্মী অমূল্য গাঙ্গুলির অভিমত জানতে চাইলে ডয়চে ভেলেকে তিনি বললেন, ‘‘প্রাচীনকালে ভারতে আট-নয় রকম বিয়ে প্রচলিত ছিল৷ তারমধ্যে একটা হলো রাক্ষস বিবাহ, যার মধ্যে অপহরণ ব্যাপারটা ছিল৷ আজকের অপহরণ বিয়েতে আছে ঐ পণপ্রথার অভিশাপ৷ মেয়েকে বিনা পণে মাথা থেকে নামাতে বিবাহিত বা অসম বয়সি পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিতেও ইতস্তত করতো না মেয়ের পরিবার৷ তবে তার মানে এই নয় যে, এটা মেনে নিতে হবে৷ যেখানে জোর জুলুম আছে, সেটাই গর্হিত৷ তবে একথা অস্বীকার করা যায় না যে, বিহারে এক সময়ে অপহরণ ব্যাপক মাত্রায় হতো এবং সেটা হতো রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু যাদবের রাজত্বে৷ তবে অপহরণ করা হতো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের টাকার জন্য৷''

অমূল্য গাঙ্গুলি আরও বলেন, ‘‘এটা অবশ্যই একটা সামাজিক সমস্যা৷ শুধু আইন দিয়ে এর সমাধান হবে না৷ পুরানো প্রথা বলে পুলিশ চোখ বুঁজে থাকতে পারে না৷ পণপ্রথাবিরোধী আইনগুলি প্রয়োগ করতে হবে৷ পণপ্রথা সামাজিক দুঃখ এবং লজ্জার কারণ৷ সত্যি বলতে কি, বিহার এখনও এক অনগ্রসর রাজ্যের মধ্যে পড়ে৷ এই অপহরণ বিয়ে সেই অনগ্রসরতাই প্রমাণ করে৷''  

প্রতিবেদনটি নিয়ে আপনার মন্তব্য লিখুন, নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন