বিবর্তন গ্রহণযোগ্য, বিকৃতি নয় | বিশ্ব | DW | 12.02.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

বিবর্তন গ্রহণযোগ্য, বিকৃতি নয়

‘‘আকন ত সমই, বালবাসসার, আই দুতি রেদয়, কাচে আশার, তমে জা আকা, আমেও জা আকা'' এই লাইন পড়ে কী বুঝতে পারছেন এখানে কী লেখা হয়েছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ভাষার এমন ব্যবহার৷ এটিকে কি বিকৃতি  বলা যায়?

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সবচেয়ে বেশি বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে৷ অভ্র ফোনেটিকসের কল্যাণে বাংলা অক্ষর মুদ্রণ ইংরেজির মতো  সহজ হয়ে যাওয়ায় বাংলায় লিখতে কোনো সমস্যা নেই৷ আর সেই বাংলা লিখতে গিয়ে উপরে উল্লেখিত বাক্যের মতো বাংলা লিখছি৷ উপরের বাক্যটি পড়ে বুঝতে পারেননি নিশ্চয়? এটি একটি জনপ্রিয় গান৷ ‘এখন তো সময় ভালোবাসার, এ দুটি হৃদয় কাছে আসার'৷ এবার নিশ্চয়ই পাঠক ভাষার বিকৃতি নিয়ে চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়া দশা৷ তাহলে আপনার জন্য আরো কয়েকছত্র বাংলা বাক্য ‘‘আর মদ্দা সেরা স্যুপ টেস্ট টা সাই চিলোও৷ আমরাআ ৩ জন গিহাচিলাম.. ডুকার সাতাই সালাম৷ ওয়াইটের আসলোও বসিহা দিলোও... আকটুও পর জিজ্ঞাসা করলোও কি লাগবা মেম.. অডার নাওয়ার ১৫ মিনিট আর মদ্দা স্যুপ চলা আহলো৷ কাওয়ার মাজকানা বললো আর কিচু লাগবা কি মেম.. কুব সুন্দর ব্যবহার চিলো সাই ওয়াইটার আর... জাই হউক ফুড কিন্তুউ অনেক মজার ছিল৷''- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন একটি রেস্তোরাঁ রিভিউ লিখেছেন, এটি সেটি৷ ভাষা উদ্ধারের চেষ্টায় যাওয়ার দরকার নেই৷ এরা আসলে বাংলা ভাষার মুদ্রণ ও বানান নিয়ে সতর্ক নন বলেই এমনটা লিখে সচেতন পাঠকদের হাসির খোরাক হচ্ছেন৷

তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনভাবে এমন বাংলা লিখে নজরে আসার হারটা কিন্তু কম নয়৷ কর্তার্লামনা, খাইতার্লামনা, আপ্পে, আপো– এই ধরনের শব্দের সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই আপনি পরিচিত৷ এর চর্চা করে যাচ্ছে মিডিয়া ব্যবহারকারী তরুণরা, যা ভীষণ আতঙ্কের৷ অ্যাডাইলাম, মিছাইলাম, ইটাইলাম জাতীয় শব্দের ব্যবহারের আধিক্যও পরিলক্ষিত হচ্ছে৷ অ্যাড করলাম বা মিস করলাম অথবা খেলাম এই জাতীয় শব্দকে এভাবেই বলার চল প্রচলিত হয়েছে৷

এদিকে নাটক বা টেলিভিশনে যে ঢালাওভাবে ভাষার বিকৃতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়  বা হয়ে আসছে, সেটি নিয়ে আলাপ করার সময় এখনই৷ প্রথমত, বাংলাদেশের নাট্যকারদের প্রতি আমার একটি কৃতজ্ঞতা রয়েছে৷ তারা তাদের নাটকে দেশের যত আঞ্চলিক ভাষা আছে তার প্রায় সবই ব্যবহার করছেন৷ এটি নিঃসন্দেহে উল্লেখ করার মতো একটি কাজ৷ একই নাটকে পাশাপাশি অনেকগুলো আাঞ্চলিক ভাষার উপস্থিতি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়৷ 

এবার আসা যায় বিকৃতি প্রসঙ্গে৷ নাটকে যে ভাষার উপস্থিতিকে আমরা বিকৃতি বলে দাবি করি, সেটি কি আদৌ বিকৃতি? মোস্তফা সরয়ার ফারুকী প্রথম যখন তাঁর নাটকে খেয়েছি, গিয়েছি থেকে খাইছি, গেছি, আইছি টাইপ শব্দ ব্যবহার শুরু করলেন, তখনই আমাদের জাত ‘গেল, জাত গেল' রবটা উঠেছিল৷ অথচ নাটকে ব্যবহৃত এই ভাষাটিকে আমরা বিবর্তিত বাংলা কি বলতে পারি না? কারণ, সারা দেশের ভিন্ন ভিন্ন ডায়ালেক্টের মানুষ যখন রাজধানীতে পেশাগত কারণে বসতি গড়েছে, তখন কিন্তু বলার জন্য একটি মধ্যম ভাষার প্রয়োজন হয়েছে৷ চট্টগ্রামের লোকেরা নিজেদের ভাষার বাইরে যখন আরেকজনের সঙ্গে নিজস্ব বাংলায় কথা না বলে পাঠ্য বাংলায় যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি পরিবর্তন দেখা যায়৷

ফাতেমা আবেদীন নাজলা

ফাতেমা আবেদীন নাজলা, ডয়চে ভেলে

উদাহরণ-স্বরূপ বলা যায়, ‘‘তুমি কী করছো?'' এমন একটি বাক্য চটগ্রামের একজনের কাছে ‘‘তুমি কি করতেছো যে'' হয়ে যাবে৷ এমনটি হবার কারণ হচ্ছে, ভাষারও একটি খুঁটি বা স্তম্ভ প্রয়োজন বলে মনে করেন ভাষা বিশেষজ্ঞরা৷ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ভীষণ বলিষ্ঠ, সেখান থেকে কথ্যবাংলায় ফিরতে কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক৷ এমনটা সিলেটি, নোয়াখালী, পাবনাসহ সব আাঞ্চলিকতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য৷ এবং কমন ভাষার ব্যবহারটি নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই বলেই আমার ব্যক্তিগত অভিমত৷ 

আরো একটি কথা উল্লেখ করতে চাই৷ বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের প্রতিযোগিতার কিছু নেই৷ এই ভাষায় কথা বলার জনসংখ্যার বিশালতার কারণে আমরা চতুর্থ অবস্থানে রয়েছি৷ অথচ শুধু চীন ছাড়া আর কোথাও চাইনিজ ভাষায় কথা বলার মানুষ নেই৷ কিন্তু সেই ভাষায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোক কথা বলে৷ তাই ভাষাটিকে একটি কাঠামোবদ্ধ করে রাখার চিন্তাটাকেই প্রাচীন বলবো৷ জনসংখ্যা বাড়ছে, ভাষার ব্যবহার বাড়ছে৷ বরং ভাষা কোথায় বিকৃত হচ্ছে সে বিষয়ে শঙ্কিত না হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সর্বস্তরে বাংলা চাই' দাবিটিই উঠতে পারে৷  

একইসঙ্গে আরেকটি দাবি করতেই পারি যে, শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে বছর জুড়ে বাংলার চর্চা চলুক৷ একই সঙ্গে অনুরোধ গুগল ট্রান্সলেশনের বাংলা নিয়ে হাসাহাসি না করে সেটিকে শোধরানোর কাজে নামতেই পারি অনলাইনে ব্যয় করা সময়ের কিছুটা ব্যয় করে৷ পাশাপাশি যাঁরা মুদ্রণজনিত ভুলের কারণে বিকৃত বাংলায় কথা বলেন, তাঁদেরকেও শুধরে দেওয়ার কাজটা ব্যক্তি উদ্যোগেই করতে পারি৷ 

ভাষার বিকৃতি, বিবর্তন এসব প্রসঙ্গে  নানা আলাপ প্রকাশের পাশাপাশি এ-ও উল্লেখ করতে চাই, ব্যক্তি মানুষ হিসেবে আমি কোনো ভাষাবিদ নই, বাংলাভাষার বহুলচর্চা ও প্রসারে নিজের ভাষায় কথা বলা ছাড়া আমার কোনো অবদান নেই৷ বরং আমি নিজেকে একজন দাবিদার হিসেবে চিহ্নিত করতে চাই৷ বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ চাই সর্বত্র৷ সেটি আঞ্চলিক হলে আপত্তি নেই, তবে বিকৃত হলে প্রতিবাদ করতে চাই৷ বিবর্তন গ্রহণযোগ্য, বিকৃতি নয়৷

 

লেখকের সঙ্গে একমত কি? লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন