বিদেশি মরীচিকার টানে | আলাপ | DW | 05.02.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

বিদেশি মরীচিকার টানে

ভারত থেকে বৈধপথে ইউরোপ, অ্যামেরিকায় যাওয়া মানুষের সংখ্যা কম নয়৷ কিন্তু বেআইনি পথেও যাচ্ছেন হাজারো মানুষ৷ চরম কষ্টের মধ্যে পড়ছেন তারা৷

আইফেল টাওয়ার

আইফেল টাওয়ারের কাছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্মারক বিক্রি করেন কাগজপত্রহীন অনেক ভারতীয়

সুষমা স্বরাজের কথা শুনে আমার বেশ কয়েক বছর আগে প্যারিসে দেখা দৃশ্যের কথা মনে পড়ছিল৷ নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে প্রথম এনডিএ সরকারের আমলে সুষমা তখন ভারতের বিদেশমন্ত্রী৷ ভারত থেকে, আরো নির্দিষ্ট করে বললে পাঞ্জাব থেকে বেআইনিভাবে বিদেশে, বিশেষ করে ইউরোপ ও অ্যামেরিকায় যাওয়ার একের পর এক ঘটনা নিয়ে তখন সুষমা বিচলিত৷ সেই কথাই বলছিলেন তিনি৷ সুষমা এখন প্রয়াত৷ কিন্তু ভারত থেকে, বিশেষ করে পাঞ্জাব থেকে দালাল ধরে বেআইনিভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বিন্দুমাত্র কমেনি৷

সুষমার অভিজ্ঞতার কথা পরে বলা যাবে৷ আগে প্যারিসের ঘটনার কথা বলি৷ আইফেল টাওয়ারের একটু দূরের রাস্তায় হাঁটছি৷ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফ্রান্সের কিছু স্মারক বিক্রি করছেন বেশ কয়েকজন যুবক৷ আইফেল টাওয়ারের মিনি সংস্করণ থেকে শুরু করে নানা ধরনের ফ্রিজ ম্যাগনেট ও অন্য জিনিস৷ চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, উপমহাদেশের মানুষ৷ তার হাতের জিনিসগুলির দিকে তাকিয়ে আছি দেখে বিক্রেতার প্রশ্ন, ইন্ডিয়ান? হ্যাঁ, বলতেই হিন্দিতে বললেন, কী নেবেন বলুন৷ দাম কম করে দেবো৷ দেশের লোক বলে কথা! জিজ্ঞাসা করলাম, বাড়ি কোথায়? জবাব এলো, হরিয়ানা৷ প্রশ্ন, বৈধ কাগজপত্র আছে? জবাব, পাগল নাকি! তাহলে? মাঝে মধ্যেই পুলিশ তাড়া করে৷ পালাই৷ ধরা পড়ে গেলে, আদালতে চুপ করে বসে থাকি৷ দেশ কোথায় জানতে চাইলেও জবাব দিই না৷ এখানকার পুলিশ ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার লোকের মধ্যে ফারাক করতে পারে না৷ ফলে এখানে আমি দেশহীন৷ তারপর এদিক ওদিক তাকিয়েই ছুট লাগালেন তিনি৷ বুঝলাম, পুলিশ দেখতে পেয়েছেন৷ এভাবেই থাকবেন তিনি৷ বিদেশি মরীচিকা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে৷

২০০৯ সালে ইউএনওডিসি-র হিসাব ছিল, প্রতি বছর ২০ হাজারের বেশি মানুষ শুধু পাঞ্জাব থেকে বেআইনিভাবে বিদেশ যান৷ তাদের সব চেয়ে পছন্দের জায়গা যুক্তরাজ্য, অ্যামেরিকা এবং ক্যানাডা৷ আর ইউরোপের মধ্যে যুক্তরাজ্যের পর রয়েছে ইটালি ও জার্মানি৷

সুষমার কথায় ফিরি৷ প্রয়াত ও সাবেক বিদেশমন্ত্রী সুষমা এই বেআইনি বিদেশযাত্রা বন্ধ করা নিয়ে বহু ভাবনাচিন্তা করেছিলেন৷ তিনি তখন বলেছিলেন, বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য নথিভুক্ত সংস্থা আছে৷ এই দালালরা একটি সংস্থা খোলে, তারপর বেআইনি পথে একটি গ্রুপকে পাচার করে দিয়েই তা বন্ধ করে দেয়৷ তারপর নতুন সংস্থা খোলে৷ এভাবে বিদেশ পাচার করতে ২৫ থেকে ৩৫ লাখ টাকা নেয় দালালরা৷ কখনো তারও বেশি৷ জমি-জমা, ঘটি-বাটি বন্ধক রেখে বা বিক্রি করে সেই অর্থ জোগাড় করে আগ্রহীরা৷ তারপর দীর্ঘ সমস্যা সঙ্কুল বিপজ্জনক যাত্রা৷ শেষ পর্যন্ত বিদেশে পৌঁছতে পারবেন কিনা, তা জানা নেই৷ হয়ত সর্বস্বান্ত হবেন, জেলে যাবেন, নৌকাডুবি হয়ে মারাও যেতে পারেন৷ তা সত্ত্বেও বিদেশের মায়াকাজল যাদের চোখে লেগে যায়, সে এই সব বাধাকে উপেক্ষা করে৷ পাগলের মতো বিদেশ যেতে চায় বেআইনিপথে৷ আর তারপর বিপদে পড়লে তখন পরিবার এসে ধরে মন্ত্রীকে৷

অথচ, সোজা পথেই তো যাওয়া যায়৷ যাচ্ছেনও হাজার হাজার মানুষ৷ কেউ লেখাপড়ার জন্য, কেউ চাকরি করতে৷ দিল্লির একটি এডুকেশন কনসালটেন্ট কোম্পানির হিসাব, এই বছর তাদের কাছে হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী এসেছে, বিদেশে পড়তে যাওয়ার জন্য৷ করোনার মধ্যে বিদেশে পড়তে যাওয়ার হিড়িক বিন্দুমাত্র কমেনি৷ ওই সংস্থায় যারা আসেন, তাদের প্রায় সকলেই সুযোগ পেয়েছেন বা পেয়ে যাবেন৷ এটাই তাঁদের রেকর্ড৷ দিল্লিতে এই ধরনের প্রচুর কনসালটেন্ট কোম্পানি আছে৷ ফলে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী বিদেশমুখি৷ সেখানে পড়ার পরেই বা পড়তে পড়তেই চাকরির হাতছানি৷ ওই কোম্পানির তথ্য বলছে, পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রে অ্যামেরিকা ও যুক্তরাজ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি৷ ক্যানাডা ও অস্ট্রেলিয়াতেও ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীরা পড়তে যান৷ তবে অ্যামেরিকা, যুক্তরাজ্যের তুলনায় কম৷ বিদেশি ডিগ্রি, চাকরির সুযোগের লোভ তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ৷ আর বিদেশে যে শুধুই খুব মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা যায় এমন নয়, সব মেধার ছাত্রছাত্রীই যায়৷ সকলে তো আর হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজে পড়বে না৷ মাঝারি বা সাধারণ মানের কলেজও আছে৷ সেগুলিও আমাদের দেশের কলেজের তুলনায় ভালো বলে তাদের দাবি৷ পড়তে যাওয়ার জন্য এডুকেশন লোনও আছে৷ তাই ক্রমশ খুবই জনপ্রিয় হচ্ছে বিদেশে পড়তে যাওয়া৷

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে, নতুন দিল্লি

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে, নতুন দিল্লি

আমার এক বন্ধুই তার দুই মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে পড়তে৷ একজন ক্যানাডায়, অন্যজন যুক্তরাাজ্যে৷ এডুকেশন লোন নিয়ে পড়তে গেছে তারা৷ চাকরি নিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়৷ ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত এই দশ বছরে ভারত থেকে শুধু অ্যামেরিকা ও যুক্তরাজ্যে গেছেন এক লাখ ৩১ হাজার মানুষ৷ ইউরোপের অন্য দেশ মেলালে সংখ্যাটা অনেকটাই বেশি৷ কেরল সহ দক্ষিণের রাজ্যগুলি থেকে আবার মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার প্রবণতা খুব বেশি৷ তাই বেআইনিপথে যত মানুষ বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন, বৈধভাবে যাওয়া মানুষের সংখ্যা তার থেকে খুব একটা কম নয়৷

তা হলে বেআইনিপথে যাওয়ার চেষ্টা করেন কেন এত মানুষ? কারণ, বেআইনিভাবে তারাই যান, যারা পেশাদার নন, পড়তে যাওয়ার মতো মেধার অধিকারী নন৷ তাদের হাতে কিছুটা পয়সা আছে৷ আর খেটে খেতে পরেন৷ বিদেশের মায়াকাজল তাদের পাগল করে দেয়৷ তাদের মনে হয়, বিদেশে একবার পৌঁছতে পারলেই হলো৷ তারপর আর পিছনে তাকাতে হবে না৷ ভবিষ্যতের চিন্তা করতে হবে না৷ এক অলৌকিক স্বপ্নের পিছনে দৌড়ান তারা৷ বোধবুদ্ধি চলে যায়৷ বুঝতে পারেন না, বেআইনি পথে বিদেশ যাওয়ার থেকে স্বভূমিতে থেকে যাওয়া অনেক মর্যাদার, অনেক বেশি শ্রেয় এবং উচিত কাজ৷ বিদেশের মরীচিকা একবার হাতছানি দিলে খুবই মুশকিল৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়