বিজ্ঞাপন এখন ধ্রুপদী ধারণা থেকে অনেক দূরে | বিশ্ব | DW | 26.02.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

বিজ্ঞাপন এখন ধ্রুপদী ধারণা থেকে অনেক দূরে

মার্কিন মিডিয়া অ্যানালিটিক্স কোম্পানি ‘কমস্কোর'এর হিসেবে, ২০১২ সালে অনলাইনে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন বিজ্ঞাপন ইমপ্রেশন তৈরি হয়েছিল৷ সেই প্রাচীন মিশরীয়দের ইস্পাতে করে বার্তা দেয়া থেকে আজ এমন বিবর্তন! ভাবা যায়?

এতগুলো বছরে বিজ্ঞাপন বদলেছে মাধ্যম৷ যুগে যুগে হয়েছে আরো বেশি প্রযুক্তি নির্ভর৷ শিল্প হয়ে গড়ে উঠেছে৷ সমাজে এসেছে পরিবর্তন৷ তাই বদলেছে বিজ্ঞাপনের বার্তাও, আর উপস্থাপনের ঢং৷ সমসাময়িক সময়ে দেখা যাচ্ছে, পণ্যের উপস্থিতিই হ্রাস পাচ্ছে বিজ্ঞাপনে৷ বরং বড় করে তুলে ধরা হচ্ছে প্রয়োজনকে, কিংবা ভিন্ন কোনো বার্তা অথবা লাইফস্টাইলকে৷

কথা হচ্ছিল বিজ্ঞাপন মাধ্যম বদলেছে যুগে যুগে৷ যেমন ১৪৪০-এর দশকে যখন প্রিন্টিং প্রেস এলো, এরপর রেডিও অথবা আরো পরে যখন টেলিভিশন এলো, তখন কী প্রচণ্ডভাবে বদলে গেল এই শিল্প! তবে গত ২ হাজার বছরে যতটা বদলেছে, বলা হয়, গত ২০ বছরে তার চেয়েও বেশি পালটে গেছে এই শিল্প৷ এর কারণ, আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকা এক জাল, যার নাম ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব৷

এই অনলাইন বিজ্ঞাপনের বাজার কত বড় জানেন? ২০১৩ সালের হিসেবে, প্রতিদিন একশ' বিলিয়ন ইমপ্রেশন (একটি ইমপ্রেশন হলো, একটি অনলাইন বিজ্ঞাপনের একবার উপস্থিতি) তৈরি হয়৷ ভাবা যায়? শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২০১৮ সালে কোম্পানিগুলো গুগলে বিজ্ঞাপন দিয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি৷ তারা এ বছর মার্কিন মুল্লুকের ডিজিটাল মার্কেট থেকে আরো ৫ বিলিয়ন বেশি কামাই করবে৷ আর এ বছর গুগল, আলীবাবা ও ফেসবুক- এই তিন জায়ান্টই খেয়ে নেবে সমস্ত বিজ্ঞাপনের ৬০ ভাগ রেভিনিউ৷ তাই বাজার কীভাবে বড় হচ্ছে তা-ও আঁচ করা যায়, সেই সঙ্গে বোঝা যায় বাজার কারা নিয়ন্ত্রণ করছে৷

পরিসংখ্যান বিষয়ক অনলাইন প্লাটফর্ম স্ট্যাটিস্টা'র প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সারাবিশ্বে ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোতে বিজ্ঞাপনের জন্য বিনিয়োগ হবে ৫৬৩ বিলিয়ন ডলার (ইন্টারনেট, টিভি, রেডিও ইত্যাদিসহ), যা বাংলাদেশের গেল বছরের জাতীয় বাজেটের চেয়েও প্রায় সত্তর হাজার কোটি টাকা বেশি৷

চলুন ঘুরে আসি, এই তো আড়াই-তিন দশক আগের প্রাক-ইন্টারনেট যুগ থেকে৷ বেশিদিন আগের কথা নয়৷ পত্রিকা, বিলবোর্ড, রেডিও, টিভি- এসবে বিজ্ঞাপন প্রচার হত৷ তখন বিজ্ঞাপন ছিল মূলত ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক৷ অর্থাৎ ভোক্তারা সরাসরি বিজ্ঞাপন বা বিজ্ঞাপন দাতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না৷

১৯৪১ সালে প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টিভিগুলোতে বিজ্ঞাপন ভেসে ওঠে৷ বুলোভা ঘড়ির বিজ্ঞাপন৷ কে জানত পরের ৭০ বছর বিজ্ঞাপন এভাবেই সবার অন্দরমহলে ঢুকে যাবে৷

বিজ্ঞাপনজুড়ে প্রথম দিকে শুধু পণ্যের আধিক্য থাকলেও পরে বিজ্ঞাপনের চরিত্রগুলো দিয়ে দর্শকের সঙ্গে এক ধরনের যোগাযোগ তৈরির চেষ্টা হলো৷ যদিও বাজার জরিপের বিষয়টি আরো পরে এসেছে৷ জনপ্রিয় মুখগুলোকে বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবে তুলে আনা হতো৷ সে সময় কিছু ধ্রুপদী বিজ্ঞাপন তৈরি হয়, যা আজও সমাদৃত৷ যেমন, ‘মার্লবোরো ম্যান' বিজ্ঞাপনটি৷ ফিল্টার্ড সিগারেট পুরুষালি ব্যাপার- এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে কাউবয় পোশাকে এক মডেল উপস্থাপন করা হলো৷ ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত একটি জনপ্রিয় চরিত্র হয়ে ওঠে মার্লবোরো ম্যান৷ বিষয়টি ‘সেক্সিস্ট' হলেও সফলতার দিক থেকে একটি ধ্রুপদী উদাহরণ৷

সে যাই হোক, পরবর্তীতে ধারণা আরো পালটেছে৷ যেমন, জার্মান ফটোগ্রাফার এলেন ফন উনব্যর্থের একটি ছবিতে দেখা যায়, পণ্যের চেয়ে লাইফস্টাইলকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ সেই বিজ্ঞাপনটির পণ্য আসলে ভদকা, যা ছবিতে অতটা প্রাধান্য পায়নি৷ আর নারীকে ‘অবজেক্টিফাই' করে বিজ্ঞাপনের রীতি নিয়ে বিতর্ক অনেকদিনের৷

Bdnews-Deutsche Welle Talkshow

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

বাংলাদেশেও বিজ্ঞাপনের বিবর্তন অনেকটা একই ধরনের৷ তবে নব্বইয়ের দশকে টিভি বিজ্ঞাপনগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় হয়৷ এমনকি বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিয়েও তারকা হয়েছেন অনেকে৷ শুধু তাই নয়, বিজ্ঞাপনের মিউজিক করে রিপন খান বা রেশাদদের মতো সংগীত পরিচালকরাও নিজেদের আলাদাভাবে চিনিয়েছেন৷ কারণ, তখন মানুষ আগ্রহভরে বিজ্ঞাপন দেখত৷

মাছের রাজা ইলিশ আর বাতির রাজা ফিলিপ্স- সে তো খুব সাধারণ আপ্তবাক্যই হয়ে গেল মানুষের মাঝে৷ এছাড়া অলিম্পিক ব্যাটারির বিজ্ঞাপনটিও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে৷ নানান সুগন্ধি তেলের বিজ্ঞাপন, শাড়ির বিজ্ঞাপন- সবগুলোই মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ফিরত৷ বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনের ঢঙেও একই বিবর্তন এসেছে৷

কিন্তু এখন আর কোনো বিজ্ঞাপনই মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ফেরে না৷ এর কারণ এই নয় যে, ভালো বিজ্ঞাপন তৈরি হচ্ছে না৷ এর কারণ, ভোক্তার ধরন পালটেছে৷ গবেষণা বলছে, এ যুগের ভোক্তারা বিজ্ঞাপন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেন৷ চ্যানেল বদলে ফেলেন৷ কিংবা ভিডিও পুরোপুরি দেখেন না৷ তারা বিজ্ঞাপনহীন কন্টেন্ট চান৷ আর তাই নেটফ্লিক্সের মতো প্লাটফর্ম পয়সা খরচ করে দেখেন তাঁরা৷

আরো আছে, বিজ্ঞাপনে আর ভরসা পান না ভোক্তারা৷ তাঁরা কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনী রিভিউ থেকে একশ' হাত দূরে থাকেন৷ কিন্তু অন্য ভোক্তাদের বিজ্ঞাপনবিহীন রিভিউ দেখতে চান এবং সেসব বিশ্বাস করেন৷ তাই এখন বিজ্ঞাপনের ধরনও পালটে যাচ্ছে৷ এখন অনেক পণ্য প্রস্তুতকারী ইউজার জেনারেটেড কন্টেন্ট দিয়ে বিজ্ঞাপন করেন৷ যেমন, পোলারয়েড বলছে, ‘আমাদের নতুন টেলর সুইফট অ্যালবামে ছবি আপলোড করুন এবং জিতে নিন পোলারয়েড ২২৩০০ ক্যামরা৷' কন্টেন্ট মার্কেটিংয়েও প্রচুর পয়সা ঢালছে কোম্পানিগুলো৷ অনেক ইউটিউবার তাদের পেজে ফলোয়ার কম থাকলেও দেখা যাচ্ছে প্রচুর আয় করছেন কন্টেন্টের কারণে৷

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিজ্ঞাপনের যে ধ্রুপদী ধারণা, বিবর্তন তাকে ঠেলে নিয়ে গেছে তা থেকে অনেক দূরে৷ অনেক গভীরে৷

বিজ্ঞাপন কি আসলেই বদলে যাচ্ছে? লিখুন মন্তব্যের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন