বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা অনেক সময় ‘ট্রায়াল বাই মিডিয়া′কে প্রলুব্ধ করে | আলাপ | DW | 24.07.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা অনেক সময় ‘ট্রায়াল বাই মিডিয়া'কে প্রলুব্ধ করে

সাংবাদিকতা ও বন্তুনিষ্ঠতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কিন্তু মহামারী এই সময়ে কিছু গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠতার বাইরে গিয়ে একটি তথ্যকে কতটা চাঞ্চল্যকরভাবে উপস্থাপন করা যায় সেদিকে বেশি দৃষ্টি দিচ্ছে।

সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা এবং সত্যনিষ্ঠতার বাইরে কোনো কিছু চিন্তা করা যায় না। এবং এর কোনো বিকল্প নেই। গল্প-উপন্যাস বা অন্যান্য বিনোদনধর্মী লেখার মধ্যে কাল্পনিক কিছু যুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতা হলো সঠিক তথ্য সরবরাহ করা। সাংবাদিকতায় সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের বাইরে কোনো কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। একই সাথে তথ্যভ্রান্তির কথা আমরা বলি। একজন সাংবাদিক যখন কোনো ইনফরমেশন পান, সেটা প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে বিভিন্ন ধরনের প্রেশারের মধ্যে কাজ করতে হয়। যথার্থ উৎস সময়মতো না পাওয়া, ডেটলাইনের চাপ, বিভিন্ন তথ্য বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা ধরনের জটিলতা বা সীমাবদ্ধতাও থাকে।

এই কারণে আমরা বলি, পূর্ণাঙ্গভাবে তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে কোনো কোনো জায়গায় কিছুটা ভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। এটাকে আমরা ‘মিস ইনফরমেশন' বলি। পরবর্তী মুহূর্তেই সাংবাদিকরা বা সংবাদমাধ্যম সেটি উপলব্ধি করে যে, কিছুটা ভুল হয়ে গেছে, কিন্তু ওই ভুলটি কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত নয়, কাজের ধরনের কারণে হয়ত এই ভুলটি হয়েছে। দৈনন্দিন ঘটনার যিনি রিপোর্ট করেন, তাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রিপোর্টটি প্রচার বা প্রকাশ করতে হয়। এ কারণে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কাজ করতে গেলে মানুষের ভুল হয়। যখনই ভুলগুলো ধরা পড়ে, তখনই সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু যেটি দেখা যাচ্ছে, অনেক সময় কোনো কোনো গণমাধ্যম, যদিও আমরা এগুলোকে গণমাধ্যম বলতে চাইবো না। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ইনফরমেশন এবং ইনফরমেশনের বাইরে গিয়ে অপতথ্য বা ডিজইনফরমেশন প্রচারের একটা অপচেষ্টা চালায়। এই অবস্থাটা হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য বা কোনো জনগোষ্ঠীকে উত্তেজিত করার জন্য বা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য। সংকীর্ণ রাজনৈতিক বা অন্য কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে এই ধরনের কার্যকলাপ তারা করে। এরা কিন্তু কোনোভাবেই গণমাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা না। গণমাধ্যমের যে নিয়ম-নীতিমালা আছে, সেটা রক্ষা করে হয়ত তারা লাইসেন্স কিংবা অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু তারা সেটি ভঙ্গ করে নিয়মিত অপকর্ম করে যাচ্ছে। তারা বেশিরভাগ সময়ই সঠিক তথ্য পরিবেশন করে না। এমনকি আমরা দেখেছি, কোনো কোনো পত্রিকা পুরাতন অন্য কোনো স্থানের ছবি সাম্প্রতিক ছবি হিসেবে বাংলাদেশের কোনো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে ছাপিয়েছে। স্বাধীনতার পরে গায়ে জাল জড়ানো বাসন্তির ছবির কথাও আমাদের স্মরণে আছে। কখনো কোনো মহলের প্রয়োজনে বা কোনো ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে বা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা কাটতি বাড়ানোর জন্য তারা এ ধরনের অপতথ্য ছড়ানোর আশ্রয় নেয়। 

গণমাধ্যমের মালিক/কর্তৃপক্ষ ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থেই গণমাধ্যমের ভেতর থেকেই এ ধরনের অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। আমরা চাই না, গণমাধ্যমের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে গণমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হোক। গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সংস্থা, যেমন প্রেস কাউন্সিল সম্মিলিতভাবে এসব বিষয়ে নজরদারি করতে পারে। উন্নত বিশ্বে আমরা দেখি যে, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিজস্ব পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোই সাংবাদিকতার মান বজায় রাখার স্বার্থে নিবিড় নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।

আজকাল আরো একটি জিনিস আমরা লক্ষ্য করছি, একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। সেই অভিযুক্ত ব্যক্তির বিভিন্ন ঘটনা বা অপকর্ম জানার একটা আগ্রহ আছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। মানুষ তার দুর্নীতির স্বরূপ জানতে চায়। অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই বিষয়গুলো প্রকাশ করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। গণমাধ্যম সেই দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু একজন ব্যক্তি আদালতে অভিযুক্ত প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অভিযুক্ত হিসেবে প্রচার এবং প্রকাশ করা অবাঞ্ছনীয়। এখানেই বস্তুনিষ্ঠতার কথাটা আসে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে হয়ত অপকর্মের অভিযোগের পাহাড় আছে। গনমাধ্যমের কাছে হয়ত সেটার প্রমাণও আছে। গণমাধ্যম সত্যনিষ্ঠভাবে সেটা প্রচার করবে এটাই জনগণ প্রত্যাশা করে। গণমাধ্যমের কাজ কিন্তু বিচার করে ফেলা নয়। সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে এমনভাবে সেটি করা উচিত নয়, যেন মনে হয় সংবাদমাধ্যম তার বিচার করছে।

Bangladesch Arefin Siddique

আআমস আরেফিন সিদ্দিক, অধ্যাপক

কোনো একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির নানা বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু তার পারিবারিক বা তার সাথে সম্পৃক্ত অন্য কোনো নির্দোষ ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করাটা গণমাধ্যমের কাজ নয়।

একটি গণমাধ্যমে সম্পাদক বা প্রকাশক যারা থাকেন, তাদের কিন্তু অনেক বেশি বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হয়। ছবি প্রকাশের সাথে সাথে একজন মানুষ বিতর্কের মুখোমুখি হচ্ছেন কি-না, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এই বিষয়গুলো কিন্তু বস্তুনিষ্ঠতার জন্য খুবই প্রয়োজন। বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করা খুবই কঠিন কাজ। তথ্য প্রযুক্তির বিস্ফোরণের এ যুগে আমরা সেটা খুবই উপলব্ধি করি।

অনেক সময় আমরা দেখি একজন সংবাদকর্মী ৪০ বছর ধরে কাজ করছেন, তিনি প্রতিটি রিপোর্ট বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে উপস্থাপন করছেন। কিন্তু ৪১তম বছরে গিয়ে তিনি এমন একটি প্রতিবেদন করলেন যেটাতে বস্তুনিষ্ঠতার ঘাটতি আছে। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, একজন সম্পাদক বা একজন সাংবাদিককে প্রতিদিনই বস্তুনিষ্ঠতার পরীক্ষা দিতে হয়। এ জন্য প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে এডিটোরিয়াল ডেস্ক আছে। একজন রিপোর্টার যত দক্ষতার সঙ্গেই কাজ করুক না কেন তার রিপোর্টিও সম্পাদনা ডেস্কের মাধ্যমেই অগ্রসর হবে। সম্পাদনার টেবিলে যারা আছেন, তাদের কিন্তু অনেক কিছু দেখার দায়িত্ব। কোনো বিষয়ে তাদের সন্দেহ হলে তারা সম্পাদকের কাছে পাঠাতে পারেন। এই কথাগুলো বলা এই কারণে যে, কখনোই যত বড় অভিযুক্তই হোক, যত বড় প্রতারকই হোক, যত বড় দূর্বৃত্তই হোক, যত বড় খুনিই হোক- সব সময় গণমাধ্যমকে স্মরণে রাখতে হবে যাতে একজন নির্দোষ মানুষও যেন কোনোভাবেই সমাজে হেয় প্রতিপন্ন না হন।

এই কারণে গণমাধ্যমকেসমাজের দর্পণ বলা হয়।

অপরিহার্য না হলে. শুধুমাত্র মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য বা পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য অযথা কারও পারিবারিক, সামাজিক কিংবা রোমান্টিক ছবি দেওয়াটা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

সাংবাদিকতার রক্ষাকবচ সত্য প্রকাশ। প্রয়াত মার্কিন সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যানের মতে, সাংবাদিকতায় সত্য প্রকাশের চেয়ে উচ্চতর কোনো আইন নেই। বস্তুনিষ্ঠতা সঠিকভাবে পালন হচ্ছে কিনা সেটার রক্ষাকবচ হলো যেটা সত্য, সেটা প্রকাশ করা। সেখানে বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলাতে না পারলেও যদি তথ্যটি সঠিক হয়, তাহলে সেই জায়গায় আমি বলবো সাংবাদিক সঠিকভাবেই দায়িত্ব পালন করেছেন। ধরে নিতে পারি, এমন ঘটনায় কেউ যদি আদালতেও যান, সত্যনিষ্ঠার কারণে সেটা যেন প্রমাণ করতে পারি। আরেকটি বিষয় বলবো, বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা অনেক সময় ট্রায়াল বাই মিডিয়াকেপ্রলুব্ধ করে। সেক্ষেত্রে তড়িৎ বিচারব্যবস্থা এই ধরনের প্রবণতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, আমরা জানি যে, বিলম্বিত বিচার আসলে বিচার না পাওয়ারই নামান্তর।

অনুলিখন : সমীর কুমার দে

সংশ্লিষ্ট বিষয়