বিকাশমান এয়ারলাইন শিল্পের উন্নয়নে যা যা প্রয়োজন | আলাপ | DW | 03.04.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

বিকাশমান এয়ারলাইন শিল্পের উন্নয়নে যা যা প্রয়োজন

শুরুতে কোনো বিমানই ছিল না বাংলাদেশ বিমানের৷ সেই অবস্থা থেকেই বাংলাদেশের বিমান খাত এগিয়েছে৷ অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনায় দেশের এভিয়েশন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পসমূহের অগ্রাধিকার দেয়া অত্যাবশক৷

বাংলাদেশই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যার জাতীয় বিমান চলাচল সংস্থার যাত্রা শুরু হয়েছে কোনো উড়োজাহাজ ছাড়াই৷ কিন্তু তখন এর জনবল ছিল প্রায় ২,৫০০৷ যার মধ্যে ১৭ জন ছিলেন বৈমানিক৷ সবাই পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেও তাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশের জাতীয় বিমান চলাচল সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন৷ ১৯৭২ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত এক আদেশ বলে বাংলাদেশ বিমান অর্ডিন্যান্স পাস হয় এবং এর অধীনেই ‘এয়ার বাংলাদেশ' নামে জাতীয় বিমান চলাচল সংস্থা আত্মপ্রকাশ করে৷ প্রতিষ্ঠার এক মাস পর, অর্থাৎ ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ১৯৭২, ভারত থেকে প্রাপ্ত একটি ডিসি-৩ উড়োজাহাজের সাহায্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, যশোর ও সিলেটে বিমান চলাচল শুরু করে৷ দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি টেস্ট ফ্লাইট পরিচালনার সময় উড়োজাহাজটি ঢাকায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর ভারত থেকে দু'টি ফকার ফ্রেন্ডশিপ এফ-২৭ উড়োজাহাজ সংগ্রহ করে আবারো ফ্লাইট পরিচালনা কার্যক্রম শুরু করা হয়৷ এয়ার বাংলাদেশ নামে কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় বাংলাদেশ বিমান৷ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত একমাত্র বাংলাদেশি এয়ারলাইন হিসেবে বাংলাদেশ বিমান ব্যবসা পরিচালনা করে এবং এ সময়ে তার কার্যক্রম পূর্বে টোকিও ও পশ্চিমে নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত মোট ২৯টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে বিস্তৃতি লাভ করে৷ সঙ্গে ছিল অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গন্তব্য৷

১৯৯৬ সালে সরকার জাতীয় বিমান চলাচল সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বিমান চলাচল সেবা পরিচালনার অনুমতি প্রদান করেন৷ এরই ফলশ্রুতিতে ওই সময় তিনটি বেসরকারি বিমান চলাচল সংস্থা আত্মপ্রকাশ করে, তারা হচ্ছে ‘অ্যারো বেঙ্গল, এয়ার পারাবত ও জি.এম.জি৷ অ্যারো বেঙ্গল ও এয়ার পারাবত বেশি দিন তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হলেও জি.এম.জি দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর মোটামুটি সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে৷ ২০১২ সালে জি.এম.জি-ও তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে৷ ইতোমধ্যে কিছু দিনের ব্যবধানে ইউনাইটেড এয়ার ওয়েজ ও বেস্ট এয়ার ২০০৭ সালে, এবং অল্প সময় পর রয়েল বেঙ্গল এয়ারওয়েজ বাংলাদেশের আকাশে তাদের ডানা মেলে৷ রয়েল বেঙ্গল ও বেস্ট এয়ার তাদের কার্যক্রম শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেলেও ইউনাইটেড অনেকটা সফলতার সঙ্গে প্রায় ৮ বছর দেশের সবক'টি ও বিদেশের প্রায় ৭-৮টি গন্তব্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হয়৷ ইউনাইটেড এয়ারওয়েজই দেশের একমাত্র এয়ারলাইন, যারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং শেয়ার বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ পরবর্তী সময়ে ক্রমবর্ধমান দেনার দায় এবং চলতি মূলধন সংকটের কারণে ২০১৬ সালে তাদের ফ্লাইট কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়৷

বর্তমানে যে তিনটি বাংলাদেশি প্রাইভেট এয়ারলাইন সফলভাবে তাদের ফ্লাইট কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রিজেন্ট এয়ারওয়েজই সব থেকে পুরনো৷ রিজেন্ট ২০১০ সালের ১০ই নভেম্বর যাত্রা শুরু করে৷ এরপর ২০১৩ সালে আবির্ভূত হয় নভোএয়ার ও পরবর্তী বছর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স৷

এক সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আন্তর্জাতিক গন্তব্য ছিল মোট ২৯টি, অথচ ২২ বছর পর এখন এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫টিতে৷ অপরদিকে বাংলাদেশের আকাশ থেকে ঝরে যাওয়া বেসরকারি এয়ারলাইনের সংখ্যা, বর্তমানে চালু এয়ারলাইনের সংখ্যা থেকে বেশি৷ বিভিন্ন সময়ে মোট ৯টি এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের আকাশে যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র তিনটি, যা খুবই হতাশাজনক৷ বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর এরূপ পরিণতির কারণ বিশ্লেষণ করার জন্য অদ্যাবধি কোনো সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি৷ বিদ্যমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে এয়ারলাইনগুলোর ঝরে পড়ার সম্ভাব্য কারণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব৷ প্রতিকূল অবস্থার অন্যতম কারণ সরকারি সহযোগিতার অভাব৷ বেসরকারি এয়ারলাইন পরিচালনার অনুমতি প্রদানের সময় থেকেই এই অভাব অনুভূত হতে থাকে৷

বেসরকারি এয়ারলাইন জন্ম লাভের অনুমতি দিয়েই সরকার তার দায়িত্ব সম্পন্ন করেছে৷ সদ্যজাত এয়ারলাইনগুলো যাতে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে, সে ব্যাপারে তেমন কোনো সরকারি উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি৷

এছাড়াও শর্তাধীন সরকারি অনুমতি, সদ্যোজাত বেসরকারি এয়ারলাইনগুলোকে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই ঠেলে দেয়৷ ইতিপূর্বে আমি উল্লেখ করেছি যে, ১৯৯৬ সালে অভ্যন্তরীণ আকাশপথে বেসরকারি বিমান চলাচল সংস্থাগুলোকে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়৷ কিন্তু এই অনুমতি শুধুমাত্র সেই সব রুটের জন্য প্রযোজ্য ছিল, যেগুলোতে সরকারি এয়ারলাইন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চলাচল করত না৷ অন্যভাবে বলতে গেলে এই অনুমতি শুধুমাত্র সেই রুটগুলোর জন্য, যেগুলোতে যাত্রী চাহিদা কম এবং ব্যবসায়িকভাবে অলাভজনক৷ এ ধরনের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ কোনো সুস্থ নীতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না৷

বেসরকারি এয়ারলাইনগুলো জন্মলাভ করে কাঠামোগত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে৷ এই প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে রয়েছে তাদের অনভিজ্ঞতা, পরিচালনা ক্ষেত্রে দুর্বলতা, সঠিক পরিকল্পনার অনুপস্থিতি৷ উপরন্তু অযৌক্তিক করকাঠামো ও এভিয়েশন খাতে বিভিন্ন সরকারি চার্জ ইত্যাদি এ খাতটিকে বেড়ে উঠতে আদৌ সহায়তা করেনি৷ আরেকটি প্রতিকূলতা, যা আগেও ছিল এবং এখনও আছে; তা হলো মূলধন সংগ্রহের উৎসের অভাব৷ এয়ারলাইনের মতো পুঁজিঘন খাতে, পুঁজি জোগান দেয়ার ইচ্ছা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দেখা যায়নি৷ প্রথম দিকে জন্ম নেয়া কয়েকটি এয়ারলাইন্সের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার কারণ ছিল প্রতিকূল পরিস্থিতি৷

তুলনামূলকভাবে বর্তমান অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো৷ অভ্যন্তরীণ আকাশপথে চলাচলের ওপর এখন আর নিষেধাজ্ঞা নেই৷ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আকাশপথেও চলাচলের অনুমতি দেয়া হচ্ছে৷ বড় পরিবর্তন এসেছে বেসরকারি উড়োজাহাজ খাতের পরিকল্পনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে৷ আর্থিকভাবে সমর্থ একাধিক শিল্পগোষ্ঠী দেশের এয়ারলাইন শিল্পে বিনিয়োগ করার ফলে এ খাতে পুঁজির স্বল্পতা এখন অনেকাংশে কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়েছে৷ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও এখন পুঁজি জোগানের ক্ষেত্রে এয়ারলাইনগুলোর প্রতি সহযোগিতার মনোভাব দেখাচ্ছে৷

কিন্তু বেসরকারি খাতের এয়ারলাইনের জন্য সরকারি বিধিমালা, উন্নতির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে৷ সরকার ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা ক্যাব এখনও পর্যন্ত সময়োপযোগী বিধি-বিধান প্রণয়ন করতে পারেনি৷ এছাড়া লোকবলও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নও তেমন একটা ঘটেনি৷ দেশে যখন একমাত্র বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চলাচল করত, তখন ক্যাবে যে জনবল ছিল, তা প্রায় তেমনি রয়েছে৷ অথচ কাজের পরিমাণ বেড়েছে কয়েক গুণ৷ কাজের ধরনেও উল্লেখ্যযোগ্য পরিবর্তন এসেছে৷

Kazi Wahidul Alam, Herausgaber The Bangladesh Monitor (Kazi Wahidul Alam)

কাজী ওয়াহিদুল আলম, সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ বিমান

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যাত্রী সংখ্যা বেড়েছে ২২ দশমিক ১০ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ যাত্রী সংখ্যা বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ৷ আন্তর্জাতিক যাত্রী সংখ্যা ২০১৩ সালে ছিল ৫,২৩১,৫৮০ জন, যা ২০১৭ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬,৩৮৮,০৫০৷

অপরদিকে অভ্যন্তরীণ যাত্রী সংখ্যা ২০১৩ সালে ছিল ৬৪৮,০১৯ জন, যা ২০১৭ সালের শেষে এসে দাঁড়িয়েছে ১,০৬৭,৫৩৭, অর্থাৎ যাত্রী বৃদ্ধির সংখ্যা ৪১৯,৫১৮৷

যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বেসরকারি খাতের তিনটি এয়ারলাইন্সের সফলভাবে ফ্লাইট পরিচালনা এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিদেশিএয়ারলাইনগুলোরফ্লাইট সংখ্যা ও পরিবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের আন্তর্জাতিক ক্রমবর্ধমান সম্প্রসারণ৷ এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩৫ সালে আইএটিএ-এর হিসাব মতে বাংলাদেশের আকাশযাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২১ মিলিয়নে৷ উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে এখন থেকেই সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনায় দেশের এভিয়েশন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পসমূহকে অগ্রাধিকার প্রদান অত্যাবশক৷

বন্ধু, লেখাটি কেমন লাগলো? জানান নীচে, মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন